২ এপ্রি, ২০১৪

শম্পা বসু

1 কমেন্টস্
দূরে কোথায় দূরে দূরে
শম্পা বসু



মনটা ভারাক্রান্ত হয়েছিল প্রথম থেকেই। বাঙ্গালীর শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গা পুজোর উচ্ছ্বাসে গা ভাসাতে পারবো না এবার ! বাড়ির কর্তামশাইটি দেখে শুনে দেবীপক্ষের তৃতীয়ার দিনের টিকিট এনে হাজির। জায়গাটি লোভনীয়। ভূস্বর্গ কাশ্মীর; কিন্তু ওই পুজোর কটা দিনের জন্যেই যে সারা বছর আকুল হয়ে অপেক্ষা করা! তবু ছেলে মেয়ের উজ্জ্বল চোখের আনন্দের কাছে নিজের বাসনাকে বিসর্জন দেওয়াতেই তো সুখ। ওদের আনন্দেই তো মা বাবার জীবনের পূর্ণতা। সঙ্গে যাবেন আরও চার পাঁচজন আত্মীয় পরিজন। বিমান - টিকিট হাতে পাওয়ার পর থেকেই দেখি আমারও যেন শৈশব সুলভ চাপল্য ফিরে এসেছে, ঘিরে ধরেছে আমাকে। এতদিন শুধু ভূগোলেই পড়েছি ডাল লেকের সৌন্দর্যের কথা , কাশ্মীর নাকি ভূস্বর্গ। এবার ইন্টারনেট খুলে দেখতে লাগলাম দ্রষ্টব্য স্থানগুলো। শুধু কি তাই ? ভ্রমণ রসিক স্বামীটিও ছেলে মেয়ের জন্যে খুঁজে খুঁজে ওই পুজোর বাজারের ভিড়ের মধ্যে থেকে কিনে আনতে লাগলেন শীতের পোশাক । মানে প্রস্তুতির শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছনোর প্রচেষ্টা ।

যথারীতি এসে পড়ল সেই কাঙ্ক্ষিত ক্ষণ । চারিদিকে মণ্ডপসজ্জা শেষের মুখে ; আলোকসজ্জাও প্রায় সুসম্পন্ন ; এরই মধ্যে কলকাতাকে বিদায় জানিয়ে তৃতীয়ার দিন ভোরে পৌঁছলাম দমদম বিমানবন্দরে । প্রথমে দিল্লির উড়ান , তারপর সেখান থেকে শ্রীনগর । দিল্লী থেকে শ্রীনগরের ওই যাত্রাপথটুকু খুব বেশীক্ষণের নয় , কিন্তু জানলার ধারে বসে ওই উচ্চতা থেকে শ্রীনগর শহরটাকে দেখা যে কত রমণীয় হতে পারে , তা অবর্ণনীয় । মেঘের মধ্যে দিয়ে ভেসে যাওয়া , আর নীচে পাহাড় চূড়ার দিকে তাকিয়ে তুষারধবল শিখর দেখে শিহরিত হয়ে ওঠা - আমার কিশোরী মেয়ে আর ছোট ছেলের বিস্ময় - কৌতূহল আমাদের মনকেও ভরিয়ে তুলছিল আনন্দে ।

ভূস্বর্গ কাশ্মীরকে তুলনা করা হয় সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে ।কিন্তু হিমালয় যে আল্পসের চেয়ে কিছু কম নয় ,বেশিই বরং-- এই ভাবতে ভাবতে কখন যে পৌঁছে গেছি শ্রীনগর বিমানবন্দরে , তা খেয়াল করিনি । বাইরে দশজনের সেই দলকে অভ্যর্থনা জানাবার জন্যে অপেক্ষায় ছিলেন সদ্য পরিচিত হামিদ ভাই , কিন্তু তাঁর আন্তরিকতায় আমরা তখন মুগ্ধ । ভাবা যায়! হৃদ রোগী আমার ননদ ওই উচ্চতায় উঠে যদি কোন শ্বাসকষ্ট জনিত অসুবিধায় ভোগেন , তাই তিনি ছটি অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে উপস্থিত । টাটা উইংগারে চলেছি দশজন । ঝাউগাছ আর লতানে গুল্মের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে দলের দুই কচি কাঁচা গেয়ে উঠছিল "চেন্নাই এক্সপ্রেস" এর সদ্য জনপ্রিয় বহুল প্রচারিত গানটি ..."কাশ্মীর হ্যায় ", তালে তাল মেলাচ্ছিলাম না কি আমরাও ? চারিদিকে স্লোপিং রুফের বাড়ি, মনে পড়ছিল খবরের কাগজের ছবিতে দেখা তুষারপাতের কথা । পথে চাপদাড়ি যুবক , বোরখা ঢাকা যুবতী আর মোড়ে মোড়ে সি আর পি এর জওয়ানদের ভ্যান গাড়ি দেখে অনুভব করলাম কাশ্মীরের প্রতিকূলতা । পথে পড়ল রাজবারগ পার্ক । ঝিলামকে দেখলাম একঝলক । সেই ঝিলাম , রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন , "সন্ধ্যারাগে ঝিলিমিলি ঝিলামের স্রোতখানি বাঁকা " ...সেই বাঁকা স্রোত দেখিনি তখন , কারণ মধ্যাহ্ন ভোজের তাড়া । পথের ধারেই ধাবাখানা । আমাদের দলের দেড় বছরের বিতান আবার 'চলন্ত" । একটু থামলেই মুশকিল । তাই তাড়াতাড়ি খাওয়াদাওয়া সেরে এলাম ডাল লেকে । সেই স্বপ্নের লেক । বহু প্রতীক্ষিত । এ যে সমুদ্রের চেয়েও বিস্তীর্ণ । আর লেকটির চারিদিকে বিস্তীর্ণ পাহাড় । সে কী বিচিত্র বরণ পর্বতের । কোথাও ধূসর , কোথাও হালকা কৃষ্ণবর্ণ আর তারই কোল ঘেঁষে অসংখ্য হাউসবোট । সেই হাউসবোটে নিয়ে যাবার জন্যে কূলের কাছে দাঁড়িয়ে আছে অজস্র শিকারা । তিনটি শিকারা নিয়ে ভাসমান হলাম আমরা । একটাতে শুধু লটবহর , আর দুটিতে আমরা সবাই । হামিদ ভাই হাউসবোটে থাকার ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন । বাচ্চারা দাপাদাপি করতেই বোট যেন দুলে উঠলো খানিক । মুগ্ধ হয়ে গেলাম তার অন্দরসজ্জায় । আখরোট কাঠ দিয়ে তৈরি অপরূপ আসবাবপত্র। হাত মুখ ধুয়ে শিকারায় চড়ে ডাল লেক ভ্রমণের পালা এবার । শিকারায় উঠে চালক একটু মজা করে নৌকো হেলাতেই আমার পুত্রের মুখে জল টলমল । পাশে এসে গেল আরও দুটি শিকারা । ফটো তোলা ওদের পেশা । ওই শিকারাতেই ওদের সাজসজ্জার উপকরণ । ছেলে মেয়ে তো কাশ্মীরি সাজলোই , দেখতেও লাগছিলো অপূর্ব আর আমরাই বা বাদ যাই কেন ? ঝুপ করে এর মধ্যে নেমে এল অন্ধকার ।

শীতের আমেজ , সেখানে লেকের ওপরেই ভাসমান পোস্ট অফিস , ওষুধের দোকান , আর শাল – ফিরান – কোটের দোকান । পর্যটকরাই ওদের প্রধান ভরসা । তাই সাদর আমন্ত্রণের অভাব নেই । কিন্তু তখন আমরা ক্লান্ত । তাই লেকের কিছুটা ঘুরে আমরা এলাম হাউসবোটে , রাতের বেলা যেন পরী সেজে দাঁড়িয়ে রয়েছে রঙিন আলোর হাউসবোটের পসরা নিয়ে সেই একই ডাল লেক সুন্দরী । মাত্র একদিনের রাত্রিযাপন এখানে , তাই বারান্দায় বসে উপভোগ করছিলাম সেই নিশীথিনীর সৌন্দর্য । কিন্তু ক্লান্তিজনিত ঘুম ডেকে নিল বিছানায় , আর সকালে ঘুম ভাঙ্গল ঝিরিঝিরি বৃষ্টির শব্দে । ভূস্বর্গ বৃষ্টিস্বর্গে পৌঁছে গেল নাকি ? মেঘের সঙ্গে রোদের লুকোচুরি খেলায় সঙ্গী হয়ে আমরা প্রাতরাশ সেরে রওনা দিলাম পহেলগামের উদ্দেশে । হাল্কা ঠাণ্ডা তখন চিনার বনের মধ্যে । ঝিলামের ধারে ধারে চিনারের এই অভিভাবকত্ব মুঘল আমল থেকে । আর এই চিনারকে নিয়ে কাশ্মীরিদের খুব গর্ব । সবুজতায় আর রাজকীয়তায় পূর্ণ । পরে মনে পড়লো কাশ্মীরি শালে এই চিনার পাতার প্রতিচ্ছায়াই তো লক্ষণীয় ।

যাত্রাপথটিও তো ভারি মনোরম । চারিদিকে সবুজ উপত্যকার মাঝে মেঘ , তারই মধ্যে “আমরা এমনি এসে ভেসে যাই” । টোল বুথে পয়সা ফেলে বেলাবেলি পহেলগামের হোটেল ‘হিভানের’ সামনে যখন গাড়ি এসে থামল তখন মনে হল “এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি” । সামনে বইছে খরস্রোতা লিডার নদী । নুড়ি পাথর , পার্বত্য উপত্যকা , সবুজ বনানী তারই সঙ্গে মাঠে চরে বেড়ানো ভেড়ার পাল ---আমার কিশোরী কন্যা তো ভাইকে জড়িয়ে ধরে ঘুরে নিল একপাক । বিকেলবেলা বাকি আমরা কফির আমেজে ডুবে গিয়ে পাহাড়ের কোণে কোণে বরফ খোঁজার একটা বৃথা চেষ্টা করতে লাগলাম। এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এত ভাল লাগছিল যে , মনে হল দু’দিন না থেকে আরও কিছুদিন থাকার পরিকল্পনা করলে ভাল হত । ধীরে ধীরে শীতল আবহ নেমে এল চারিদিকে । রাতের প্রকৃতি এখানে গম্ভীর , স্তব্ধ । আর নদীর জলের মৃদু কলধ্বনি সেই স্তব্ধতাকে করে তুলছে আরও গহন, গভীর । কাশ্মীরি ডিনারে সুস্বাদু কাশ্মীরি খানা । গরগরে , মশলাদার মাটন গুস্তাবা আর রিস্তা । সাথে গরম রুটি । কিন্তু মনটা ভারাক্রান্ত হল যখন শুনলাম গুলমার্গ –এ গিয়েও বরফের দেখা মিলবে না ।

কিন্তু পথ যে বড় সুন্দর , যাবার পথে পড়ল আপেল বাগান । যে কাশ্মীরি আপেল কেনার জন্যে মানুষ অপেক্ষা করে থাকে , তা পাইকারি দরে বিক্রি হচ্ছে ওখানে । গাছ থেকে ফল পেড়ে খাচ্ছে প্রায় সকল পর্যটক ই ।

এরপর এল পৃথিবীর সবথেকে উঁচু গলফ কোর্স । আমাদের গাড়ি সেই পথ পেরিয়ে আরও আরও পাইন আর দেওদারের মধ্যে দিয়ে এসে পৌঁছল মস আর ফার্ন ঘেরা কাঠের হোটেল এর সামনে । কিন্তু গিয়ে শুনলাম সন্ধ্যের আগে সেখানে প্রবেশ করা যাবে না , সেদিনের জন্যে ওখানকার সরকার কিছু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল । কিন্তু আতিথেয়তার কোন ত্রুটি রাখেন নি তারা । একটা ছোট্ট কটেজে কিছুক্ষণের জন্যে থাকতে দিল তারা আমাদের । সঙ্গে গরম চিকেন পকোড়া । চারিদিকে শুধু নির্জনতা আর ধূম অন্ধকার । তারপর সন্ধে নামতে হোটেলের দিকে যাত্রা । উঁচুতে উঠতে আমার ননদ কিছুটা অসুস্থ বোধ করায় হামিদ ভাইয়ের জোগাড় করা অক্সিজেন কাজে লাগলো এবার । পরের দিন গন্ডোলা যাত্রা । লাইন দিয়ে টিকিট কাটা হল । দুটি টাওয়ার আছে সেই পাহাড়ে । পাহাড়ের নির্জনতা , স্তব্ধতা , গাম্ভীর্য সবই যেন বিস্বাদ হয়ে যাচ্ছে ভ্রমণার্থীদের ফেলে যাওয়া বিস্কুটের প্যাকেট, চিপস এর প্যাকেট, কোল্ড ড্রিঙ্কসের স্ট্র-এর আবর্জনায় । দ্বিতীয় টাওয়ারের একেবারে উঁচুতে গ্লেসিয়ারে কিছু বরফের সন্ধান পাওয়া গেল ; কিন্তু তুষারাবৃত পাহাড়কে দেখতে না পাওয়ার দুঃখ মনকে আচ্ছন্ন করে রাখলো। শতবার বলে এলাম তুমি আবার ডাকবে তো? এরপর শ্রীনগর ফেরা । কিছু কেনাকাটা । কবে ভূস্বর্গ তার তুষার ধবল সৌন্দর্য নিয়ে আবার ডাকবে আমায় কে জানে ।

যে জম্মু ও কাশ্মীর মাঝে মাঝেই হয়ে ওঠে অশান্তির বার্তা বাহী, সেই ভূস্বর্গেই এত আন্তরিকতার স্বাদ পেয়েছি সাধারণ মানুষের কাছে, তা না বললে কাশ্মীর ভ্রমণ অসম্পূর্ণ থেকে যায় । বৃষ্টি ভেজা শহরে মীর ও হামিদ ভাই যেভাবে আমাদের উষ্ণ আতিথেয়তায় শহর ঘুরিয়েছে, মেয়ের আবদারে দেখিয়েছে কাশ্মীর ইউনিভার্সিটি, সাদরে নিয়ে গেছে আখরোট কাঠের কারখানায়- কাঠের শিল্পকর্ম সেখানে দেখার মত । গয়নার বাক্স, বালা , চাবির রিং , ট্রে--- কী অপূর্ব শিল্পকর্ম সে সবের ।

“যাবার সময় হল বিহঙ্গের”-যাত্রা শেষের বেলায় আর একবার ডাল লেকের সামনে এসে দাঁড়ালাম। কোন সীমা যেন নেই তার । “ধ্যানগম্ভীর ভূধর” আর সুবিস্তৃত জলরাশির সামনে দাঁড়িয়ে কল্পনা করছিলাম শীতকালীন সেই স্থানটির , যখন সাধারণ জনজীবন থেকে তারা হয়ে যায় বিচ্ছিন্ন । কিন্তু সেই সৌন্দর্য? তা কি শুধু ছবিতেই থাকবে ধরা ? মনে মনে উচ্চারণ করলাম ‘ভূস্বর্গ , তুমি বিচ্ছিন্ন হোয়ো না সুবিশাল ভারতবর্ষের বুক থেকে’। ফের যেন ডাক পাই তোমার।

মৌ দাশগুপ্তা

3 কমেন্টস্
নেপথ্য শিকার
মূল কাহিনী : মিকাঈল নাঈমী
অনুবাদ: মৌ দাশগুপ্তা


(মিকাঈল নাঈমী (১৮৮৯-১৯৮৮) : জন্ম মাউন্ট লেবাননের বাসকিনতা শহরে। পশ্চিম ও আরবে তিনি পরিচিত একজন আধ্যাত্মিক দার্শনিক লেখক হিসেবে। তার বিখ্যাত ছোটগল্প ‘দ্য কুকু ক্লক’ এর মধ্য দিয়ে তার সাহিত্যকর্মে তিনি আধ্যাত্মিক দার্শনিকতা প্রয়োগ করেন এবং পরবর্তীকালে প্রায় প্রতিটি লেখায় অব্যাহত রাখেন।)

- তুই ঠিকই বলেছিলি, জীবনটা খুব সুন্দর।
- শুধু সুন্দরই নয় আবু, জীবনটা খুব মায়াময়।
- এতদিনে বুঝেছি জীবনটা বাঁচার জন্য। একটাই তো জীবন, প্রাণভরে উপভোগ করাতেই আনন্দ।
- আবু, তোর মুখে এই কথা? তুই তো শখের শিকারী, কতবার বারণ করেছি তোকে ঐ নিরীহ পশুগুলোকে অত নির্মম ভাবে মারিস না। একবারও শুনেছিস আমার কথা? ওদের জীবনটাও তো বাঁচার জন্যই, না কি?
- ‘তোর মনে আছে, কতবার তুই আমাকে শিকার করতে নিষেধ করেছিস?
- মনে নেই আবার? খুব মনে আছে, কিন্তু কি লাভ মনে রেখে বল?

আমার ছোটবেলার বন্ধু আবু মারওয়ান শখের শিকারী হলেও শিকরের ব্যাপারে বেশ নামডাক আছে। বছর চল্লিশেক বয়স,প্রাণোজ্জ্বল হাসিখুশি চেহারা।সবচেয়ে সুন্দর ওর তন্দ্রালু দুটি সবুজ চোখ আর দরাজদিল হাসি। একজন সৎ, উদার, রসিক অথচ মৃদুভাষী ও দয়াশীল ব্যক্তি হিসেবে ওর যথেষ্ট কদর আছে। শিকার নেশা হলে কি হবে জন্তু জনোয়ার পোষা ওর ছোটবেলার শখ ।এখনও ঘরে তিনটে বেড়াল, দুটো কুকুর, পাঁচটা গিনিপিগ,গোটা দশেক মোরগ মুরগী আর গুচ্ছের কিচিরমিচির করা মুনিয়া পাখী আছে। সবার হ্যাপা ও একাই সামলায়। পোষ্যদের ব্যাপারে ওর আচরণকে রীতিমত ছেলেমানুষিই বলা যায়। বেড়ালের পা ভাঙলে তাকে কোল থেকে নামায় না,পোষা মুরগী কক্ষনো জবাই করেও না বা অন্য কাউকে ওর পোষা মুরগীর গায়ে হাতও দিতে দেয়না। কিন্তু কোন মুরগী মরে গেলে তাকে যথাযথ সম্মান ও ভাবগাম্ভীর্যের সাথে গোর দিয়ে এসে এমন কান্নাকাটি করে যে বাড়ীর লোক তিতিবিরক্ত হয়ে যায়।

আমার সবচেয়ে অবাক লাগে যখন দেখি আবু খাওয়ার পাতে একটুকরোও আমিষ খায় না। শুদ্ধ শাকাহারী। বাড়ীর সবাই খেলেও কিন্তু অনেক জোরাজুরি করেও ওকে একটুকরো মাংস খাওয়ানো যায়না, সে ওর শিকার করা হোক বা না হোক। জিজ্ঞেস করলে নিরীহমুখে বলে,

- ‘আল্লাহ্ কসম! যাকে খুন করার জন্য আমার হাত নিশপিশ করে, আমার অন্তরাত্মা তার মাংস খেতে অস্বীকার করে।’

ছোটবেলার বন্ধু হওয়াতে আবু মারওয়ানের স্বভাব-চরিত্র আমার বেশ ভালই জানা আছে। তাই ওর শিকারের চমকপ্রদ কাহিনী আর এমন অদ্ভুত স্ববিরোধী চরিত্র আমাকে খুব অবাক করে।

আবু একদিকে যেমন পোষা মুরগী ও খোঁড়া বিড়ালের জন্য ব্যথায় কাতর হয় আবার অন্য দিকে তিতির, খরগোশ কিংবা হরিণ শিকার করে প্রচন্ড আনন্দ পায়। বার বার আমি ওকে শিকার থেকে নিবৃত্ত করতে সাধ্যমত চেষ্টা করেছি। ওকে সতর্ক করে বলেছি,

- জীবন ব্যথার বদলে ব্যথা ও আনন্দের বদলে আনন্দ ফিরিয়ে দেয়। সেই পুরনো প্রবাদটা মনে আছে তো? ‘চোখের বদলে চোখ আর দাঁতের বদলে দাঁত।’

ও নির্বিকার হাসিমুখে মাথা নেড়ে বলত,

- ‘শিকার করা হালাল। তাছাড়া সত্যি বলতে কি জানিস দোস্ত, অন্য কোন খেলায় আমি এত আনন্দ পাইনা।’

আমি অনেকবার জানতে চেয়েছি,

- শিকারে কি এত আনন্দ পাস রে আবু?

- শিকার কি তোর কাছে কোন শত্রুকে খুঁজে বার করে সম্মুখযুদ্ধে তাকে পরাভূত করার আনন্দ, নাকি এটা এক ধরনের শরীর চর্চা? নাকি এটা দূর্বলের ওপর সবলের পীড়নজনিত আত্মসুখ?

ও আমাকে আশ্বস্ত করে বলেছিল,

- না রে দোস্ত, জীবনের দুঃশ্চিন্তা থেকে পরিত্রাণ, প্রকৃতির মাঝে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া আর মাটি, পাথর, মেঘ ও বাতাসের ঘ্রাণ নেওয়ার মত অসংখ্য অনুভূতি শিকারের মধ্যে কাজ করে। একজন শিকারির কাছে শিকার হল ভোর ও সন্ধ্যার সুর-সুধা পান, নিজের ঘামে স্নান-সুখ লাভ আর শিকারের পেছনে ছুটতে ছুটতে নিজের হৃদ-স্পন্দন উপভোগ করা। আহা! শিকারিই কেবল শিকারের আনন্দ বোঝে। ও তুই বুঝবি না।


দীর্ঘদিন পর ‘জীবন বড় সুন্দর, জীবনটা বাঁচার জন্য’ এই সব কথা শুনতে শুনতে আমার পুরনো দিনের আলাপচারিতাগুলো যেন আমার স্মৃতির দুয়ারে কড়া নেড়ে গেল। ওর মধ্যে আমি কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম। ওকে বললাম,

- ‘আবু মারওয়ান, তোর চোখ কিছু বলতে চাইছে। কি হয়ছে রে? আমি তোর ছোটবেলার বন্ধু, আমাকেও বলবি না?’

থুতনিতে হাত রেখে ও বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর আমার হাত ধরে প্রায় জোর করেই পাশে বসিয়ে গলা পরিস্কার করে বলল,
- ‘শোন। গতকাল আমি একটি দুঃস্বপ্ন দেখেছি। দেখলাম, একটা তিতির পাখিকে আমি গুলি করেছি। কিন্তু ওটার কাছে গিয়ে দেখি মরেনি, যন্ত্রণায় ছটফট করছে। আমি ছুরি দিয়ে ওটাকে আড়াই পোঁচে জবাই করলাম। কিন্তু হঠাৎ করেই তিতিরটা একটা গলাকাটা শিশু হয়ে গেল, আর সেটা কে জানিস? আমার ফুয়াদ। তুইতো ওকে দেখেছিস, ওকে ভালও বাসিস। আর এও নিশ্চই বুঝিস, ও আমার কাছে আমার নিজের জীবনের থেকেও দামী। ঈশ্বরের পর ওই আমার একমাত্র আরাধ্য। এই স্বপ্ন দেখার পর সকালে আর শিকারে যেতে পারিনি। অবশ্য এমন মেয়েলীপনার জন্যে আমি নিজের কাছেই খুব লজ্জা পাচ্ছিলাম। তাই দুপুরের খাওয়া সেরেই মনে জোর এনে শিকারের উদ্দেশ্যে বের হয়ে পড়লাম। দরজার কাছে বসে আমার ফুয়াদ খেলছিল আর আমার নানার কাছে দুঃখী শাহজাদী ও চালাক তিতিরের সেই পুরানো রূপকথাটা শুনছিল। আমায় দেখেই ছোট্ট ছোট্ট হাত বাড়িয়ে কোলে উঠে এল।
আমি ওকে কোলে নিয়ে আদর করলাম; ওর চোখ, ওর কপাল আর থুতনিতে চুমু খেলাম। ওকে বললাম, ফিরার সময় তোমার জন্য কী নিয়ে আসবো বাবা! ও দুই হাত দিয়ে গলা জড়িয়ে বলল, ‘এত্ত বড় একটা তিতির পাখি, সত্যিকারের তিতির পাখি।’ বললে কি তুই বিশ্বাস করবি দোস্ত, সারাটাদিন আমি অতবড় পাহাড়ী অরণ্যের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটাছুটি করেছি কিন্তু একটাও তিতির পাখি মারতে পারিনি। এমন না যে কোন তিতির দেখিনি, আল্লাহ কসম, অনেক তিতির আমার চোখে পরেছে, অন্তত দশটাকে লক্ষ্য করে গুলিও করেছি, কিন্তু বশ্বাস কর, একটাও মরেনি। তুই জানিস, শিকারে আমি কতটা দক্ষ। জানিনা কেন এমন হল, তবে বুঝতে পারছিলাম ঐ স্বপ্নই আমার চিন্তা আর অনুভূতিকে নিষ্ঠুরভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে, ‘সূর্যের আলো যখন নিবুনিবু তখনও আমার ঝোলায় কোন পাখি ভরতে পারিনি। শেষ পর্যন্ত সব আশা-ভরসা ছেড়ে দিয়ে আমি বাড়ির দিকে রওনা হলাম। জানিনা কেন, তবে আমি নিশ্চিত ছিলাম ঐ স্বপ্নই আমার ব্যর্থতার কারণ। এই সব ভাবতে ভাবতে আমি যখন তাড়াহুড়া করে বাড়ির দিকে হেঁটে যাচ্ছি ঠিক তখনই রাস্তার পাশের ঝোপ থেকে একটা শিয়াল তীরবেগে আমার সামনে দিয়ে দৌঁড়ে চলে গেল। আমি সাথে সাথেই ওটাকে গুলি করে মেরে ফেললাম। না শিকরের জন্য নয়, মারলাম নিজর ওপর অন্ধরাগে আর ব্যর্থতায়। মরা শিয়ালটার পাশ কাটিয়ে চলেই আসছিলাম, কিন্তু মুহূর্তেই আমার ঐ রাগ বিরক্তি আর হতাশা পুরোপুরি উবে গিয়ে চরম বিস্ময় ও আনন্দের রূপ নিল, যখন দেখলাম মৃত শিয়ালটির মুখে আধমরা একটি তিতির পাখি ছটফট করছে।’
‘ঐ মুহূর্তের অনুভূতি তুই কল্পনাও করতে পারবি না।’
‘হতেপারে, ঐ শিয়ালটিও হয়ত বাবা…সেও হয়তো তার শয়াল শিশুদের জন্য শিকারে বেরিয়েছিল বা খাদ্য অণ্বেষণে, আমার মত সেও হয়ত আজসারাদিন ঘুরে কোন তিতির পাখি পায়নি। আর যখন পেল তখন আমিও গিয়ে হাজির হলাম তার জীবনটা কেড়ে নেবার জন্য। এক শিয়াল ও তার সন্তানদের মুখের গ্রাস লুট করে নিজের সন্তানকে উপহার দেব বলেই হয়তো এমন নিয়তি!
যাই হোক, মাংস হালাল করার জন্যে আমি যখন তিতিরটার গলায় ছুরি চালালাম তখন ঐ স্বপ্নটা যেন বার চোখের সামনে ফুটে উঠলো। চোখের পলকেই গলাকাটা তিতির আমার ছোট ছেলে ফুয়াদে পরিণত হল। আমার মনে হল আমি জ্ঞান হারাতে যাচ্ছি। যদিও কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আমি স্বাভাবিক হয়ে গেলাম। তিতিরটা ঝোলায় পুরে বাড়ী ফেরত এলাম।

- তারপর?

- তারপর, রাতে তিতিরটাকে রোস্ট করে আমার স্ত্রী নরম কিছু মাংস ফুয়াদকে দিয়েছিল। খাবার টেবিলে খেতে খেতে হঠাৎ করেই ফুয়াদ চিৎকার শুরু করলো। প্রচন্ড কাশি ও সেই সাথে ওর শ্বাস কষ্ট শুরু হল। সৌভাগ্যক্রমে আমাদের একজন প্রতিবেশি ছিলেন ডাক্তার। তার আপ্রাণ চেষ্টাতেই সে রাতে ওর গলায় বিঁধে থাকা রানের একটা ভাঙা হাড়ের টুকরো মাইনর অপারেশন করে বার করে ফুয়াদকে বাঁচানো সম্ভব হয়েছিল। এখনো ঐ দৃশ্যের কথা মনে পরলে আমার বুক কেঁপে উঠে, আমি অসুস্থ হয়ে যাই।’

এরপর বেশ কিছুক্ষণ আবু মারওয়ান চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে দাঁড়িয়ে আমার কাঁধে হাত রেখে বলল, এই জন্যই বললাম দোস্ত , যে তুই-ই ঠিক বলতি, জীবনটা খুব সুন্দর।

কেমন যেন সন্দেহ হলো, কি বলব ভেবে না পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম,

- ‘ তুই শিকার করা ছেড়ে দিয়েছিস কিনা বল তো?’

আবু মারওয়ান মাটির দিকে তাকিয়ে কেমন এক অদ্ভুত গলায় বিরক্তি নিয়ে উত্তর দিল,

- ‘এত কিছু বলবার পরও তুই এমন প্রশ্ন করিস কিভাবে?’