গল্প-স্বল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
গল্প-স্বল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

২ এপ্রি, ২০১৪

সীমা ব্যানার্জ্জী রায়

3 কমেন্টস্
(গল্প)

ঘরের মধ্যে ঘর
সীমা ব্যানার্জ্জী রায়



গাড়ি থেকে নেমেই ঝড়ের বেগে কল্পতরু ওরফে তুষার বাড়িতে ঢুকল। ব্রীফকেস সোফাসেটে রেখেই …

- মাম্পি ইই...মাম্পি! মা -কে দেখেছি না যে। মা কোথাও গেছেন? কিছু বলে গেছেন তোমাকে?

- -জানি না, কি যে করেন! কোথায় যাবেন, কদিন থাকবেন। কিছুই বলার প্রয়োজন বোধ করেন না । যবে থেকে বিয়ে হয়েছে তবে থেকেই তো দেখে আসছি একই রকম ব্যবহার। “ মাম্পি, আমি বেরোচ্ছি। কদিন পর ফিরবো, বুম্বাকে বলে দিও”- কোথায় যাচ্ছেন? জিগেস করার সাথে সাথেই গটগট করে বেরিয়ে গেলেন। শাশুড়িমা তো কখনোই কিছু বলেন না। না, বলার প্রয়োজন বোধ করেন না। নিজের জেদেই তো থাকেন সর্বদা দেখি। শুনেছিলাম, বাড়ির কর্তারাই এইরকম ব্যবহার করেন? কিন্তু শাশুড়িমা তো একজন আমার মতোই গৃহবধূ-ই ছিলেন একদিন।

এ বাড়িতে মাম্পির আসার কথা নয়। অনেক টালবাহানা , অনেক অশান্তির পর একমাত্র পুত্র কল্পতরুর দুর্দান্ত ভালবাসার কাছে দোর্দন্ড প্রতাপশালী মাকে শেষপর্যন্ত হার মানতে হয়েছিল। সেই সঙ্গে আমেরিকাবাসী মেয়ের ফোনাঘাত, পত্রাঘাত তো ছিলই। আর ছিল মাম্পির রূপ আর শিক্ষার জৌলুস। এখন সংসার যাত্রার অন্তরালে চলেছে দুই নারীর ব্যক্তিত্বের ঠান্ডা লড়াই। এ লড়াইয়ে তুষার কোনোমতেই সামিল হতে রাজি নয়।

মেয়ে তো আগেই মনের মতো সঙ্গী জুটিয়ে আমেরিকায় পাড়ি দিয়েছে, স্বামী তারও আগে জীবন থেকে পালিয়ে বেঁচেছেন স্ত্রীকে পেনসন বরাদ্দ করে। শাশুড়ি মন্দিরা দেবী রাতদিন নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। ছেলে বৌ কি করছে না করছে দেখার তার সময় নেই। বাড়িটা ওঁর নামে, মোটা পেনসন পান, একটা নিজের নামে গাড়ি আছে। হাতে একটা বাহারি বড় ব্যাগ, একটা ভ্যানিটি ব্যাগ তো থাকেই যেখানেই যান না কেন। চুলে কলপ, বাঁধানো ঝকঝকে দাঁত, এই বয়সে বহু আয়াসে ধরে রাখা টানতান ত্বক , ঈর্ষণীয় ৫৩ কেজি ফিগার, সুন্দর সাজপোশাক, মুখে মানানসই মেক আপ- একটা আলগা ব্যক্তিত্ব আছে মানতেই হবে। তবু কি যেন একটা নেই। বয়স ষাটের দিকে, তবু কচি খুকি সেজে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা। সে থাকুন না, খারাপ নয়। কিন্তু ঔদ্ধত্য-টাকে সহ্য করা যায় না। সেখানে তার মা -বড়লোক হওয়া সত্বেও নিজের ব্যাপারে কত উদাসীন। মনে মনে পাশাপাশি দাঁড় করায় দুজনকে। মায়ের প্রসাধণ বলতে শীতে একটু অলিভ ওয়েল আর বোরোলীন। বাবা মারা যাবার আগে, দাদা একটু বড় হতেই রঙীন শাড়ি ছেড়েছেন। বাবা বলতেন, “যৌবনে যোগিনী, যত সব সেকেলেপনা।” কেউ কেউ বলতেন, “সুন্দরীরা যা পড়ে, তাই মানিয়ে যায়।” মা শরৎ চাট্টুজ্জ্যের বিন্দুর কায়দায় বলতেন, “ছিঃ! ছেলে মেয়ে বড় হলে মায়ের সাজের দিকে হাঁ করে চেয়ে থাকবে। ছিঃ কি লজ্জা।”

আগে তুষারদের অবস্থা নাকি মধ্যবিত্ত-দের চেয়েও খারাপ ছিল। তবে এ সংসারের বৃদ্ধির মূলে নাকি শাশুড়িমার বুদ্ধি আর অসাধারণ চালিকা শক্তি। দুই যমজ ছেলেমেয়েকে নিয়ে বড্ড বেকায়দায় পড়ে যায় মাঝে মাঝে। আর দুজনে হয়েছেও তেমনি দুরন্ত। সবে ওদের অন্নপ্রাশন হয়েছে। শাশুড়িমা থাকলে তাও মাঝে মাঝে ওনার কাছে রেখে আসত মাম্পি। উনি আগেই বলে দিয়েছিলেন যেঃ -বাচ্চা হলে সামলাবে তুমি আর তুষার মিলে। আমি আর এই বয়সে ঝুট ঝামেলা নিতে পারব না মনে থাকে যেন। তখন আবার এইসব নিয়ে কোন রকম অশান্তির সৃষ্টি না হয় , তার জন্য আমি সব আগে থেকেই বলে রাখলাম। -তাও ওনার কাছে দিয়ে আসলে কিছুক্ষণ-এর জন্য তো রেহাই পাওয়া যায়। হাজার হোক নিজের রক্তের সম্পর্ক আর কচি খুদেদের ভালবাসার টান। আঁতুরে থাকতে ভেবেছিল মায়ের কাছে গিয়ে থাকবে আর বাচ্চাদের ৬ মাস করে তবে আসবে। সে গুড়ে বালি-এক মাস যেতে না যেতেই চলে আসতে হল। বাচ্চাদের দেখাশোনার জন্য একটা আয়া রাখা হল। সেটাও ওনার পছন্দ নয়, বলেন আমার নাতিরা কেন আয়ার কাছে থাকবে? কি সাঙ্ঘাতিক যুক্তি। ওনার হুকুমেই তো সব কিছু চলে। ছেলেকে বোঝালেন যে, বাড়িতে সব কিছুর কাজের লোক আছে, বাচ্চাদের একটু দেখবে তাও পারবে না? তাহলে মা হলো কেন? তুষার মায়ের মুখের ওপর কথা বলে না। জানে, জবাব দিয়ে লাভ নেই, উপরি পাওনা কিছুই হবে না। তার বদলে মায়ের কাছে বোবার মতন গুচ্ছের কথা শোনা ঢের ভালো। ভেবেছিল মা -কে এনে রাখবে, কিন্তু মা সেই আগেকার দিনের পন্থা মেনে চলে, বলেঃ -ছিঃ! জামাইবাড়ি থাকতে নেই।

তুষার-কে বললে বলে,

- -দিভাইকে দেখো, একলা সব কেমন সামলাচ্ছে। যাকে বলে জুতো সেলাই থেকে চন্ডীপাঠ। কি করে সামলাচ্ছে? আর তুমি ঘরে বসে এটুকু করতে পারছো না?

মাম্পি চুপ হয়ে যায় আজকাল। শুধু মনে মনে বলে

- “ জোর করে তো বিয়ে করলে । আমার কত শখ ছিল পি এইচ ডি করতে বাইরে চলে যাব।

জি আর ই তে খুব ভাল নম্বরও পেয়েছিল। বাবারও তাই ইচ্ছে ছিল। কিন্তু তুষার তখন বলেছিল যে, সে এখানেই পি এইচ ডি -টা করে ফেলতে পারবে। তার কোন আপত্তি নেই। আর কেউ আপত্তিও করবে না।” অথচ বৌ্দির কি মজা! ওকে দেখে রীতিমত হিংসে হয়। বৌ্দি কি সুন্দর ঝাড়া হাত-পা হয়ে আছে। মা আর ঠাকুমা মিলে কি সুন্দর ভাবে মানুষ করছে পিকাই কে।

- -“হ্যাঁ! আমাদের লেখক শংকর অনেক আগেই ওঁদের 'দশভুজা' সার্টিফিকেট দিয়েছেন। কিন্তু স্বামী্রা ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর হয়ে ওঁদের সাহায্য না করলে আমাদের মতো দ্বি্ভুজা হয়ে হাত কামড়াতে হত।”

খালি কথায় তো আর সমস্যা মেটে না। একদিন কথা বলতে বলতে দুঃখ করে মাম্পি তুষারকে বললঃ

-তোমার যদি সেই অবিবাহিতা পিসীমা বেঁচে থাকতেন য়াজ, তাহলে আর আমাদের এত চিন্তা করতে হত না। উনি তো তোমাকেও মানুষ করেছিলেন। মা বাবা মরা ভাইকে নিজে মানুষ করে বিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে চেয়েছিলেন। আহা! সারাজীবন তোমাদের দেখা শুনা করেই নিজের জীবন কাটিয়ে দিলেন। নিজের বলতে তো তোমরাই ছিলে। বড্ড মনে পড়ে তোমার সেই পাম্মা-র কথা। আগের দিনের মানুষেরা অনেক কিছু মানিয়ে নিতে পারেন। আমার ঠাকুমা তো বিরাশী বছর বয়স। আর কিছু না পারুন, আমার বৌ্দির ছেলেকে কাছ ছাড়া করেন না। -আবার ভেবে বোসো না যেন, যে নিজের সুবিধার জন্য পাম্মা -পাম্মা করছি। এই স্ংসারের রিমোট কন্ট্রোল তোমার মায়ের হাতে। আজ নিজে সব সুখ সুবিধা উপড়ে নিয়েছিলেন পাম্মা-র কাছ থেকে । আর আমার বেলায় উনি ফালতু ঝক্কি সামলাতে পারবেন না, স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন। ইশ! আজ যদি তোমার পাম্মা থাকতেন।

মাম্পির কথা শেষ হতে না হতেই তুষার বলে ফেলল,
-আমার পাম্মা তো বেঁচে আছেন, উনি আছেন কাশীতে। বাবা বেঁচে থাকতে কতদিন মাকে লুকিয়ে আমি আর বাবা পোস্টঅফিসে মানি অর্ডার পাঠিয়েছি পাম্মাকে কাশীতে। তারপর এখন আর তোমাদের নিয়ে এতো ঝামেলায় জড়িয়ে পরেছি যে, পাম্মার কথা ভাববার সময় পাই কই? শেষে পাম্মা এলেও এই ঝামেলার মধ্যে পড়ে যাবেন এই বয়সে? -'

- কি বল্লে, পাম্মা বেঁচে আছেন? অথচ এবাড়িতে তাঁর নামও শুনি না! ছিঃ ছিঃ ছিঃ, ধিক্কার তোমাদের মানসিকতা-কে। তুমি ভেবো না আজ আমার দরকারের জন্য পাম্মাকে আমি দয়া দাক্ষিণ্য দেখাচ্ছি। একদম না। সবার ধারণা! নারী দুঃখ বহন করে পুরুষদের অত্যাচারে কিন্তু নারী-ই যে নারীর পরম শত্রু তাও জানা হয়ে গেল আমার আজ। -অন্ততঃ তুমি তো আমাকে বিয়ের পর বলতে পারতে। দুজনে হানিমুন থেকে গিয়ে ওনার আশীর্বাদ নিতে- দেখা করতে পারতাম? তোমার মা কি জানতে পারতেন? না, মা-এর মনে দুঃখ হবে ভেবেছিলে? সত্যি ধিক তোমরা। তোমরা আবার সব শিক্ষিত , আপার স্ট্যাটাস এর লোক বলে বড়াই করে বেড়াও। -কাশী বৃন্দাবনে দুঃখী দের কথা খবরের খুব ঘটা করে বেরোচ্ছে। দীপা মেহেতার 'ওয়াটার' তোমাদের গর্বের সমুদ্রকে ঘোলা করে ছেড়েছে। কয়েকদিন আগে টি ভি তে 'জননী দেবী' সিনেমা দেখে লজ্জায় বাঁচি না। তোমরাও ওই কুকর্ম করেছো! ছোটবেলায় 'পথের পাঁচালী' পড়তে গিয়ে ইন্দির ঠাকরুণকে তাড়ানো মেনে নিতে পারি নি। ওদের সংসারে তবু সর্বগ্রাসী অভাব ছিল। আর তিনিও ছিলেন বিধবা, কিন্তু অবিবাহিতা পাম্মা তো সর্বত্যাগী? নিজের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ করেছিলেন ছোটবেলায় মা হারা ভাইকে মানুষ করবার জন্য। আর আজ তিনি সেই আশ্রয়টুকু থেকেও বঞ্চিত? ছিঃ ছিঃ ছিঃ! -অথচ দিভাই বলেন ওদেশে নাকি সিনিয়ার সিটিজেনকে ওরা সম্মান দিচ্ছে। ঘটা করে আন্তর্জাতিক বৃদ্ধবর্ষ পালন করছে। তোমরা তো সব ওদেশের মতো মেনে চলছো তবে এটার বেলায় নয় কেন? সত্যি আমার ভিষণ ঘেন্না করছে তোমাদের এই ব্যবহারটার জন্য।”

- আচ্ছা বাবাঃ আর শোনাতে হবে না। মা যখন নেই এখানে। চলো না আমরা গিয়ে দেখি কি অবস্থা।

-কি অবস্থা মানে? কিসের কি অবস্থা? সোজা চলো পাম্মাকে নিয়ে আসব। কেন তিনি থাকবেন না এই বাড়ীতে। এবাড়ীতে থাকার সম্পূর্ণ অধিকার আছে পাম্মার।

কয়েকদিনপর মাম্পির শাশুড়ি মন্দিরা ফিরে এলেন। মুখে বিজয়ের হাসি। বোনেরা মিলে শলাপরামর্শ করে সব বাপের বাড়ি গিয়েছিলেন। ভাইদের থেকে বিপুল সম্পত্তির ভাগ বাগিয়ে এনেছেন। কিন্তু বাড়ির ভেতরে ঢুকেই তো চক্ষু চরখগাছ। মুখের হাসি মুখের ভেতরে গিয়ে আশ্রয় নিল- নির্বাসিতা ননদ শেফালিকে দেখে চমকে উঠলেন তিনি। শুধু তাই নয় ওনার কোলে তখন নাতি -নাতনি খেলা করছে। এদিকে তিনি তো ভাই-এর বৌকে দেখে ভয়ে তটস্থ। তাও মুখে একটু ম্লান হাসি এনে বললেনঃ –

- “জানো মন্দিরা! বিশ্বাস করো, আমি আসতে চাই নি, কিন্তু এরা হঠাত আমাকে গিয়ে নিয়ে এসেছে, সাথে আমার আদরের দাদাভাইরা,, মুখগুলো ঠিক আমার সোনা ভাইটার মতন , তাই আর ওদের কথা উপেক্ষা করতে পারলাম না। -আমার ভাই বলো, সন্তান বলো সব ছিল আমার ভাইটু। তাকে শেষ দেখা ও দেখতে পেলাম না, তাই মনে হল ওই যেন আবার এসেছে ছোট্ট নাতি-নাতনিদের মধ্যে, আর আমার দিকে কেমন খালি তাকিয়ে আছে দেখছো?

মন্দিরা দেবী তো মনে মনে অসম্ভব গালাগালি দিচ্ছিলেন ননদকে। কিন্তু মুখে এনে বল্লেন, -

- না না ঠিক আছে , ভালোই তো কদিন থাকুন না আমাদের কাছে , সবার -ই ভালো লাগবে।

মুখে একটু ফোকলা দাঁতে করূন হাসি এনে ননদ বল্লেনঃ –

- মন্দিরা! আমাকে আর ফিরে যেতে বোলো না ওখানে, কদিন আর বাঁচবো? আমার বড্ড কষ্ট সেখানে। এখানে এক কোণে থাকবো । তোমাদের কাউকে আমি কোন অসুবিধা হতে দেবো না। সব সময় কি আর হরিনামে পেট ভরে, বলো? তখন বয়স কম ছিল, ভালো লাগতো। পাপ্পু একটু বড় হবার পরই তো তোমরা রেখে এসেছিলে। কিন্তু একবার যখন তোমাদের পেয়েছি আর হারাতে চাই না, আর কটা দিনই বা বাঁচব!

খয়াটে হয়ে যাওয়া দু চোখ দিয়ে ননদের চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। মাম্পি আর তুষার তাড়াতাড়ি পাম্মার চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে গলা জড়িয়ে বল্লঃ

- -পাম্মা! তোমাকে একদিন মা তা-র সংসা্রের কর্তৃ থাকাকালিন গিয়ে রেখে এসেছিল, আজ আমরা তোমাকে ফিরিয়ে এনেছি, যেখানে আমরা থাকবো তুমিও সেখানে থাকবে আর আত্মমর্যাদায় থাকবে বাকি জীবন। মা-এর আপত্তি থাকলে মা একা থাকবে এ বাড়িতে। মা জানবে কি ভয়ংকর জীবন এই একা জীবন।

মন্দিরা -র আর মুখে কথা নেই, আস্তে আস্তে নিজের ঘরের দিকে পা চালালেন। ভাইদের কাছ থেকে যোগ্য পাওনা যে আনন্দ দিতে পারে নি, আজ তার ছেলে -পুত্রবধূ চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যোগ্য পাওনা কাকে বলে? মেনে নিলেন তিনি নিজের অক্ষমতার বিচার। বুঝলেন, টাকাটাই সব নয় জীবনে। বুঝিয়ে দিল তারই গর্ভের সন্তান আর তার পুত্রবধূ।

লাভলী ভট্টাচার্য্য

0 কমেন্টস্
(গল্প)

প্রতিবিম্ব ...
লাভলী ভট্টাচার্য্য



মাঝেই রিয়ার মনে হয়...সেই একলা বারান্দায় যখন বসে , সব কাজের শেষে , রাই তখন ঘুমে আচ্ছন্ন ,তার সাত বছরের মেয়ে । এই সময় টুকু শুধু রিয়ার নিজস্ব , একদম একা ,কিন্তু তবুও বহু চরিত্র তার আসে পাশে । বেশ অনেকটা বছর কেটে গেলো , বিদেশে । এবার আর নয় , ফিরে যাবে সে তার পৈতৃক বাড়ীতে । এখানে আর কিছু নেই ।
...... কলেজে বরাবরই খুব ভালো নম্বর নিয়ে পাশ করতো রিয়া ।আর মা বাবার একমাত্র মেয়ে , রূপে গুণে অনন্যা ,বাবার টাকা পয়সার অভাব ছিলনা ,তাই সবাই একটু অন্য নজরে দেখত তাকে , বন্ধুত্ত্ব করতে এগিয়ে আসা বন্ধুও কম ছিলনা ।কিন্তু রিয়া এড়িয়ে চলতো সবাইকে । শুধু ভালো লাগতো তার অনু কে । খুব সাধারণ পরিবারের মেয়ে হয়েও এতো অসাধারণ কি করে হতে পারে ,অনু, সেটাই ছিল তার কৌতুহল । কলেজে আসার পথে , মাঝরাস্তায় তার নিজস্ব গাড়ি থেকে নেমে পড়তো রিয়া । এগিয়ে আসতো অনুর দিকে , হাঁটাপথে অনেক কথা হোতো দুজনে । কিন্তু রোজ খেয়াল করতো কলেজ ছুটির পর ,অনুর কথায় যেন যাওয়ার এক বিষম তাড়া ।একদিন রিয়া বায়না করে, "অনু, আজ আমাকেও নিয়ে চল "। অনু ...হেসে উত্তর দিতো , "তোর মাথা খারাপ ? মেসোমশাই জানতে পারলে তোর কি হবে ভাবতে পারিস ? তোর গানের ক্লাস আছে , তুই যা "। মন খারাপ করে ফিরে আসতো রিয়া ।
......একদিন রিয়া প্রায় রাগারাগি করেই অনুর সঙ্গ নেয় । অনু সেদিন আর বাধা দেয়নি । যখন ওরা পৌঁছল ,তখন প্রায় সন্ধ্যে । কি অপূর্ব পরিবেশ , কত নিষ্পাপ শিশুর প্রাণখোলা হাসি মুখ । ওদের কেউ নেই...মানসিক আর শারীরিক ভাবে ওরা অসুস্থ । ওদের সাথে কিছুটা সময় কাটিয়ে অনু রিয়াকে নিয়ে গেলো ,সেখানেই এক বিশাল চিত্র প্রদর্শনী দেখতে । রিয়া মুগ্ধ হয়ে দেখেই গেলো , কি অপূর্ব সব ছবি ,সব ছবির নীচে লেখা "সৌম্য" । রিয়া অনেক গুলো ছবি কিনে নিয়ে সেদিন ফিরে এলো । সব কটা ছবিতে কত রূপে সাজানো নারীর মুখ , অসামান্য ...দেখতে দেখতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলো তার ঠিক নেই । সকালে মনে হল একবার সেই চিত্রকর কে তার প্রশংসা জানানো উচিৎ ।কালকের কাগজ টা খুলে ...সৌম্য নামের পাশে তার নম্বর টা চোখে পড়লো , কথা হল ...কি অপূর্ব তার কথা বলার ভঙ্গী ।প্রায় সমবয়সী ওরা ,তাই দুদিনেই আপনি থেকে তুমি হল , কাজের ফাঁকে ,পড়ার ফাঁকে অনেকটা সময় কথা হোতো ।এক অদ্ভুত আকর্ষণ রিয়া অনুভব করলো । রিয়া একদিন বলেই ফেলে ,"আমাকে তো দেখনি, পারবে একদিন দেখা হলে ,সবার মাঝে চিনতে ?" সৌম্য হেসে উত্তর দেয় ..."যে আমার এতোগুলো ছবি একদিনে কিনে নিয়ে যেতে পারে ,তাঁকে দেখার ইচ্ছে আমার হয়েছিল বলেই, সেদিন দূর থেকে তোমাকে আমি দেখেছি "।
...অবশেষে কলেজের সমাপ্তি । রিয়ার ইচ্ছে হয় অনুর সাথে ওখানে যদি সেও পড়াতে পারতো ?? কিন্তু মা বাবা রাজী হবেন না ।সৌম্য কে যদি সারাজীবনের জন্যে সঙ্গি করতে পারতো ??না, তাও মা বাবা দেবেন না। ও তো বড়লোক নয় , ও শুধু আঁকে । মায়ের কাছে আজ সে বলে দেখবে । যদি............

প্রতিবিম্ব ... ২...
কলেজের শেষ দিন ,সবার সাথে আড্ডার পর , রিয়া বাড়ি ফিরল ...আজ সে মায়ের কাছে খাওয়ার টেবিলে কিছু মনের কথা জানাবে । কিছুক্ষণ পর মায়ের সেই ডাক ,মামনি খেতে আয় ।রিয়া বসে, একসাথে ।
মা...রিয়া , আজ একটা দারুণ খবর আছে ,তোর বাবা একটু আগে ফিরেছেন ।আমরা কলকাতা ছেড়ে বাইরে চলে যাচ্ছি ।বাকি জীবন ওখানেই কাটাবো ।
রিয়া...মা ,আমার কিছু বলার ছিল ।আমি এখানেই থাকতে চাই ,নিজে কিছু করতে চাই ।
মা...সে হয়না, তুই আমাদের একমাত্র সন্তান ।তোকে ভালো জায়গায় বিয়ে দিতে পারলেই আমাদের শান্তি ।তখন ওখানে না হয় কিছু করিস নিজের ইচ্ছে মতন ।বাবা কোনও কথা শুনবেন না।আর তোর জন্যে সুপাত্র বাবা ঠিক করে ফেলেছেন।ছেলেও বিদেশে থাকে ।আর কোনও কথা শুনতে চাইনা ।
রিয়া এক বুক ব্যথা নিয়ে ঘরে ফেরে ।না আর নয় ।আজকেই সে সব খুলে বলবে সৌম্য কে ।
রিয়া ...হ্যালো ,সৌম্য , আমি কাল তোমার সাথে দেখা করতে চাই ।এখনও তুমি একদিনও দেখা করনি। আমি তোমাকে ভালবাসি আর কাওকে না জানিয়ে আমি তোমার সাথে চলে যেতে চাই ।বল ,আমার দায়িত্ত্ব নিতে পারবে কিনা ?
সৌম্য ...রিয়া ,পাগল হয়ে গেলে নাকি ? তুমি জানো কি বলছ ? আমার টাকা চাই ,অনেক অনেক , আমার সামনে অনেক কাজ ।আমাকে ভুলে যেও , সুখে থেকো ,অনেক ভালো থেকো ।কোনোদিন সুযোগ হলে আমার সেই স্বপ্নের প্রতিমা তোমাকে নিশ্চয়ই দেখাবো ।
রিয়া বাকরুদ্ধ ।তারপর একটা কথাও বলেনি। শুধু সৌম্যর পেইন্টিং গুলোর দিকে একবুক ঘেন্না নিয়ে তাকিয়ে থাকে ।
অবশেষে নতুন জায়গায় নতুন জীবন । সুমিতের সাথে বিয়ে হয়ে যায় ,রিয়ার । অনেক সম্পতির মালিক সুমিত । কিন্তু সেকি ,তার কল্পনার সংসার বাস্তবে কোথায় ? সুমিত সারাদিন ব্যস্ত , সময় নেই ।রিয়াকেও পার্টি যেতে হয় অনিচ্ছা সত্ত্বে । হারিয়ে গেলো রিয়া ,এক নতুন জগতে । মা বাবার কাছে যাওয়ার ইচ্ছেটাও যেন কোথায় হারিয়ে যায় ।এভাবেই কটা বছর , শুধু নিজেকে হারিয়ে বেঁচে থাকা ।অবশেষে একদিন রিয়ার জীবনে আলো করে এলো আরও একটি জীবন ...রাই ।রিয়ার নতুন করে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা । জন্মের পর অনেকক্ষণ কেটে যাওয়ার পরেও রাই কাঁদেনি ।ডাক্তাররা জানিয়ে দিলেন , রাই আর কথা বলবে না। মেনে নিতে হয় ।ঐটুকু মুখের দিকে তাকিয়ে আনন্দে বুকে জড়িয়ে ধরে রাই কে। আস্তে আস্তে রাই বড় হয় ,কিন্তু নাহ , এখানেও বিধাতা একটু বেশী পরিহাস করে ফেলেছিলেন হয়তো । অন্য বাচ্চাদের মত বোঝার ক্ষমতা হয়না রাই এর ।নিয়তির পরিহাস কষ্ট হলেও মেনে নিতে হয় রিয়াকে । সুমিত এর জন্যে দায়ী করে রিয়া কে ।আর বোধহয় মানসিক জোর ছিলনা রিয়ার । শেষ পর্যন্ত আইন আদালত ।বাবার বাড়ি তে ফিরে আসে রিয়া , মা বাবা দুবছর আগেই চলে গেছেন , রিয়ার ভাগ্য নির্ধারণ করে , পরলোকে ।......বৃষ্টির শব্দে ঘোর কাটে রিয়ার । অনেক রাত হল ।।কাল সকালেই বেরোতে হবে ... কলকাতা ফিরবে । একদিন যেই ইচ্ছে ছিল অনেক বাচ্চার মাঝখানে থেকে ,আজ হয়তো ভগবান তার মেয়ের মধ্যে সেই অসুস্থতা দিয়ে প্রমাণ করতে চাইলেন , দেখতে চাইলেন রিয়ার সয়ে যাওয়ার ক্ষমতা , লড়ে যাওয়ার ক্ষমতা ...

কলকাতা ...অনেক কিছুর সাক্ষী ।বাড়িতে ফেরে রিয়া , সাথে রাই । কি বিশাল বাড়ি , কেউ নেই , কি করে থাকবে রিয়া এতো বড় বাড়িতে একা ... একটা ফোন করলে হয়না অনুকে ? অনু ফোন ধরে , আজ একটু একটু করে সব কথা জানতে পারে অনু রিয়ার কাছ থেকে । ভরসা দেয় ,"তোর রাই কথা বলবেই ,আমি এক জায়গায় নিয়ে যাবো ,যেখানে অনেক বাচ্চা আজ সুস্থ ।আমি শান্তিনিকেতন আছি , এখানেই থাকি, তুই চলে আয় কাল ।"
রিয়া ...কিন্তু আমার যে অনেক টাকার দরকার রাই এর জন্যে । আমাকে একটা ছোট বাড়ি দেখে দে ,এখানে আমি হাফিয়ে উঠেছি একদিনেই ।আমি এই বাড়ি বিক্রি করে দেবো ।
অনু ...তুই এখানে এলে বুঝতে পারবি , রিয়া ,এখানে ওর চিকিৎসা করাতে কোনও খরচা লাগবে না । তুই কাল চলে আয় ।
রিয়া পরদিন শান্তিনিকেতন চলে আসে । অনুর সাথে অনেকদিন পর দেখা ,ওরা দুজনেই শিক্ষকতা করে ।ওদের সুখী পরিবার দেখে রিয়া খুব খুশী হয়।
রিয়া এবার আসল কথায় চলে আসে ..."অনু ,আমার একটা চাকরি খুঁজে দিতে পারিস , এই ধর তোর স্কুলে । আর রাই এর জন্যে একটা ভালো চিকিৎসার ব্যবস্থা ..."
অনু পরদিন রিয়াকে নিয়ে যায় তার সেই প্রতিষ্ঠানে । ঘুরে দেখায় ...অনেকটা জায়গা জুড়ে এই প্রতিষ্ঠান ।অনুর ক্লাস ছিল, তাই রাই এর ফর্ম ফিলআপ করতে রিয়াকে একাই যেতে হয় । রিয়া দরজা খুলে ভেতরে যায় ,সুন্দর সাজানো একটা ঘর । দেওয়ালে কারও মা বাবার ছবি । পাশে দুয়েকটা পেইন্টিং ।একটা নাম ...লেখা সৌম্য সুন্দর রায় । চমকে ওঠে রিয়া । বেরিয়ে আসতে চায় তখনই ...কিন্তু চোখ আটকে যায় ,সামনে রাখা পেইন্টিং এ , সেই লাল শাড়িটা , সেদিন গিয়েছিলো সে , সৌম্যর ছবি কিনতে । দুটো পা রিয়ার কাঁপতে থাকে ।এমন সময় , সৌম্য ,..." বোসো , আমি অনুর কাছে সব শুনেছি, তোমার রাই কথা বলবে , ফিরে পাবে তার স্বাভাবিক জীবন । আমি কথা দিচ্ছি , আর তোমার অনেক প্রশ্ন তাইনা ? এই পেইন্টিং টা সেদিন এঁকে ছিলাম , যেদিন প্রথম তোমায় দেখেছিলাম , এই আমার মানস প্রতিমা । আমার বা দিকের কলম টা একটু এনে দেবে ? কোনোদিনও কাওকে আনতে বলিনি , কারণ আমি স্বয়ং সম্পূর্ণ হতে চেয়েছিলাম , আমার বা হাত টা অচল , আজ বহুদিন , আমি কি করে তোমাকে দুহাত বাড়িয়ে দিতাম বল তো ? আমার টাকার দরকার ছিল, হ্যাঁয় , এই সব বাচ্চাদের জন্যে , যেখানে সবাই নিজের মত , একদম সুস্থ মানুষ হয়ে বেঁচে থাকতে পারে । আমাকে তুমি ক্ষমা কর ।"
রিয়া কিছু বলতে পারেনি , সেই মুহূর্তে ...শুধু নিজের পেইন্টিং টায় হাত বুলিয়ে নিলো কিছুক্ষণ , হয়তো সেই রিয়া কে একবার খুঁজে পেতে । তারপর বলে ফেলে , "সৌম্য , এখানে একটা চাকরি করে দিতে পারো আমার , আমি আমার বাড়ি বিক্রি করে দেবো । একটা থাকার ব্যবস্থা হতে পারে ?? এদের মাঝখানে ?? আমি যে শারীরিক বিকলাঙ্গ নই , মানসিক বিকলাঙ্গ ।" সৌম্য ...মুখে কিছু বলেনি , চোখের ভাষায় জানিয়ে দেয় , তার সম্মতি ।
......অনুর বারান্দায় আজ রিয়া ,আবারও একা । কিন্তু মানসিক কোনও ভার নেই , এক অদ্ভুত সুন্দর পরিবেশ শান্তিনিকেতনের , রবি ঠাকুর তাই এখানে হয়তো এতো কাব্যের সৃষ্টি করেছিলেন। একবার মনেহল , রিয়ার , পুরনো আবৃত্তির সিডি টা , কলেজে পড়া কালীন যেটা করেছিল , একবার শুনলে মন্দ হয়না ।
চলতে শুরু করে , বাইরে আবছা আঁধার , আধখোলা জানালা...।
..."গাড়ির আওয়াজের আড়ালে
বললে মৃদুস্বরে,
"কিছু মনে কোরো না,
সময় কোথা সময় নষ্ট করবার।
আমাকে নামতে হবে পরের স্টেশনেই;
দূরে যাবে তুমি,
দেখা হবে না আর কোনোদিনই।
তাই যে প্রশ্নটার জবাব এতকাল থেমে আছে,
শুনব তোমার মুখে।
সত্য করে বলবে তো?
আমি বললেম, "বলব।"
মাঝপথেই লোডশেডিং , ভালো লাগলো রিয়ার ......বাকীটুকু নিজেই বলে ফেলে আপন মনে ..।।
"আমাদের গেছে যে দিন
একেবারেই কি গেছে,
কিছুই কি নেই বাকি।"
একটুকু রইলেম চুপ করে;
তারপর বললেম,
"রাতের সব তারাই আছে
দিনের আলোর গভীরে।"
খটকা লাগল, কী জানি বানিয়ে বললেম না কি।
ও বললে, "থাক্‌, এখন যাও ও দিকে।"
সবাই নেমে গেল পরের স্টেশন.
আমি চললেম একা"..

...না একা নই ,আমার রাই এর মাঝে জাগিয়ে তুলবো আরেক রিয়া কে ...আমার রাই মানুষ হবে , রিয়ার মত হারিয়ে যাবেনা ...যেতে দেবনা কোনোদিন ... ...আমি নতুন করে বাঁচবো ........

সৌমেন্দ্র লাহিড়ী

0 কমেন্টস্
(ছোটগল্প)

ভিজিটিং কার্ড

সৌমেন্দ্র লাহিড়ী



পাখী আজ একমাস পর বিউটি পার্লারে গিয়েছিল । আসার সময় লিপষ্টিক নেলপালিশ আরো টুকিটাকি কিনে ফিরেছে । যদিও দেখতে সে খুবই সুন্দর তবুও সবসময়েই সেজেগুঁজে থাকতে ভালবাসে । পাড়ার সবাই তাকে ভালবাসে তনুমাসি তো চোখে হারায় । তাছাড়া পাখী মাত্র পনের বছর বয়সে মাকে হারিয়েছে, তাই হয়ত সকলের ভালবাসা একটু বেশীই পায় ।

মা চলে যাবার আট বছর হয়ে গেছে । বেশ ছিল ছোটবেলার দিনগুলো মায়ের হাত ধরে স্কুলে যেত, দুপাশে দুটো ছোট্ট বিনুনি ঝুলিয়ে , সবাই গাল টিপে আদর করত । সারাদিন মায়ের কাছে থাকলেও বিকেলের পর থেকে সে তনুমাসির কাছেই থাকত , তনুমাসিকে পাখীর মাও মাসি ডাকত ।


পাখী ধীরে ধীরে কখন যেবড় হয়ে গেছে বুঝতেও পারে নি । মা - কিএকটা রোগে ভূগে ভূগে চলে গেল । প্রথমে কিছু চিকিৎসা হলেও, পরে বিনা চিকিৎসাতেই মারা গেছে । ক' দিন খুব কেঁদেছিল পাখী - পৃথিবীতে আপন বলে ঐ একজনই ছিল । কিন্তু পেট বড় দায় - শুরু হলো নতুন জীবন । মায়ের জায়গায় নিজেকে মানিয়ে নিতে এতটুকু অসুবিধা হয় নি পাখীর । ছোটবেলা থেকেই তো মাকে দেখে এসেছে । যেটুকু অস্বস্তি ছিল তাও তনুমাসির দৌলতে কেটে গেছে । এখন পাখী এ পাড়ার আকর্ষণ- মধ্যমণি ।

দুপুরে খাওয়ার পর একটু গড়িয়ে নেওয়া অভ্যেস পাখীর - কিন্তু, আজ আর হলো না । কি মনে হলো - মায়ের পুরানো টিনের বাক্সটা খুললো । মায়ের গোলাপী শাড়ীটা এখনও প্রায় নতুন আছে , মাত্র দু একদিন পরেছিল । শাড়ীটা তুলে নিলো , মাকে এই শাড়ীটাতে দারুণ লাগত - আজ এই শাড়ীটাই পরবে । শাড়ীর পাশে সেই পুঁটুলি, যেটা মা যত্ন করে রাখত । খোলার ইচ্ছে হয়নি কোনদিন ,তাছাড়া তেমন প্রয়োজনও হয় নি । পুঁটুলিটা রেখে শাড়ীটা নিয়ে উঠে পড়ল পাখী ।


শাড়ীটা খুব সুন্দর করে পড়ল পাখী । নতুন কেনা গোলাপী নেলপালিশটা যত্ন করে পরল । ফুঁ দিয়ে দিয়ে নেলপালিশটা তাড়াতাড়ি শুকাল পাখী । শুরু করল মেকআপ- ধীরে ধীরে সুন্দর পাখী অপরুপ হয়ে উঠল । আয়নাতে নিজেকে আজ বেশীই ভাল লাগল পাখীর ।

আজ আর বাইরে দাঁড়ানোর দরকার নেই । তনুমাসি সকালেই বলে গেছে । ঘরে বসেই অপেক্ষা করতে লাগল পাখী- কখন দরজায় টোকা পড়ে । বেশীক্ষণ বসতে হলো না - ঠিক সময়েই দরজায় টোকা পড়ল । দরজা খুলে দেখল- তনুমাসি আর এক খদ্দের, বয়স প্রায় ষাটের কাছাকাছি, ধোপদুরস্ত পোশাক - খুশীই হলো পাখী । এদের কাছে একটু বেশীই পাওয়া যায় । তনুমাসি চলে গেল লোকটা ঘরে ঢুকল ।

অল্প সময়েই পাখী বুঝতে পারল লোকটা একদম আনকোড়া নয় । ঘন্টা দুয়েক সময় কেটে গেল । লোকটা উঠে দাঁড়াল । পাখীও নিজেকে সাব্যস্ত করে তুলল ।

লোকটা পকেট থেকে টাকা বের করে পাখীর হাতে দিল - পাখীও অভ্যস্ত হাতে গুনে দেখল - অন্যদিন যা পায় তার থেকে অনেকবেশীই আছে । লোকটা এবার একটা ভিজিটিং কার্ড বের করে বললো -" তুমি আমায় খুশী করে দিয়েছো, যদি কখনও দরকার পড়ে যোগাযোগ করো" । কার্ড হাতে নিয়ে পাখী দাঁড়িয়ে থাকল- লোকটা ধীরে ধীরে বেড়িয়ে গেল ।

মনটা কেমন উদাস হয়ে গেল পাখীর - অন্যদিন তো এমন হয় না, দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়ল । টাকাগুলো বালিশের তলায় রেখে ভিজিটিং কার্ডটা ভাল করে দেখতে লাগল । হঠাৎ দেওয়ালে ঝোলানো মাকালীর ছবি দেওয়া ক্যালেন্ডারের দিকে নজর পড়ল পাখীর - আজ- আজই তো মায়ের মৃত্যুদিন, চোখ থেকে জল চলে এলো । ছুটে গেল পুরানো টিনের বাক্সটার দিকে - মায়ের একটু ছোঁয়া নিতে । বাক্সটা খুলে প্রথমেই নজরে পড়ল পুঁটুলিটার দিকে, তুলে নিয়ে বসল বিছানায় । খুব যত্নে পুঁটুলিটা খুলল - মায়ের একটা পুরানো জরা জীর্ণ ফোটো , একজোড়া রুপোর দূল , একটা ভাঙা নুপুর - ওগুলো বুকের কাছে জড়িয়ে ধরল ।আরে ছবিটার পেছনে আটকে আছে একটা পুরানো পোষ্টকার্ড । পোষ্টকার্ড খুলে নিল ফোটোর থেকে ।


মায়ের লেখা একটা ছোট্ট চিঠি । ঠিকানা ভূল হওয়ায় ফিরে এসেছিল । লেখা মাত্র কয়েকটা শব্দ - "বাবু তোমার মেয়ে হয়েছে , মা হয়ে আমি চাই না ও এখানে থাকুক ,আপনি এই নরক থেকে ওকে নিয়ে যান , আমার প্রণাম নেবেন । ইতি রমলা" । চিঠিটা পড়েই তাড়াতাড়ি উল্টে দেখল ঠিকানাটা ,কিন্তু - ঠিকানাটাই তো ভূল, নামটা পড়ল - আরে ,এই নামটাই তো একটু আগে লোকটার দেওয়া ভিজিটিং কার্ডে ...................

স্তব্ধ হয়েগেল পাখী । নিঃশব্দে চোখের জল গড়িয়ে পড়তে লাগল । নিজের নারীত্বকে খুব ঘৃণা হতে লাগল - খুন করতে ইচ্ছা করল নিজেকে, না পেরে নিজের তলপেটে আপ্রাণ ঘুঁষি মারতে শুরু করল ।

দরজায় আবার টোকা - শব্দটা আরো জোরদার হতে লাগল ।

মনোজিৎ দত্ত

0 কমেন্টস্
(অনুগল্প)

ছেলে
মনোজিৎ দত্ত



এ নিয়ে তিন নম্বর। তিনটাই মেয়ে। প্রতিবারই মায়ের কপালে অশান্তি ... দূর্ভোগ। গালিগালাজ। নবাগতা অযত্নে - অবহেলায় ... মায়ের শুকনো বুকে যতটা দুধ আছে - তা দিয়েই বড় হয়ে উঠা। অপুষ্টি চোখে মুখে। ছেলে ছেলে করে তিন তিনটি মেয়েকে ন্যুনতম সময়ের ফারাকে পেটে ধরে মায়ের অবস্থাও একই রকম। বাবার তবুও নিদেন পক্ষে একটা ছেলে চাই। তৃতীয় বারের পর দুবছরের মাথায় আবার একজন এল পেটে। আসা মাত্রই চেঁচামিচি - হুঙ্কার শুরু। এবার ছেলে না হলে রক্ষে নেই। ডাক্তার বাবু যে বারবারই বুঝিয়ে আসছেন -... ছেলে-মেয়ে সমান... কিংবা লিঙ্গ নির্ধারণে ক্রোমোজোমের খেলায় পুরুষরাই দায়ী ... বাবা তা মানতে রাজী নন। শেষ চেষ্টা ... বাবাকে জিততেই হবে।


অবশেষে এল সেই দিন। অপেক্ষা আর কিছুক্ষণের। মার কাছে প্রসব বেদনার চেয়েও ভারী হয়ে উঠে বাবার ফরমান - এবারে রক্ষে নেই। ছেলেই হল। মার মুখে স্বস্তির নিঃশ্বাস। হাসি উবে গেছে কবে ... তবুও স্বামীর একটু হাসি দেখবেন। যত্নের অভাব হল না - ছেলের। এবারে অ -আ-ক-খ নয় ... এ-বি-সি-ডি ... করে করে .. এম. টেক্ ছেলে এখন আমেরিকায় ... মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে ... স্বপ্ন সফলের দৌড়ে ছক্কা মারছে।


বড় মেয়েটা ভালবাসার টানে ঘর ছেড়ে পালিয়েছে। মা ওপারে গেছেন অনেক আগেই। ছেলে কয়টা টাকা পাঠিয়ে বলেছিল ... টেক ক্যায়ার। মেয়েরা কেঊ কলেজের চৌকাঠ দেখেনি। পেনশনের টাকা বাবার ওষুধের তলেই যায়। চালের জন্য মেয়ে দুটির বাড়ি বাড়ি অ -আ-ক-খ বিক্রী করতে হয়। মাঝে মাঝে ছেলে ক’টা টাকা পাঠিয়ে ম্যাসেজ করে ... টেক ক্যায়ার।।

২৬ ফেব, ২০১৪

সঞ্জয় চ্যাটার্জ্জী

0 কমেন্টস্













সবার উপর মানুষ সত্য

সঞ্জয় চ্যাটার্জ্জী



জানিনা কখন নিদ্রাচ্ছন্ন হয়েছিলাম। অকস্মাৎ এক আবেগ স্পর্শ অনুভূত হল মননে, কোনো এক রমনীয় ছলাকলায় উদ্বেলিত শিরা ধমনীতে পেলাম আকর্ষণ। এ কোন চেতনা ধাবিত হয় আমার অঙ্গে অঙ্গে? ঘুম ভেঙ্গে গেল নিদারুণ উত্তেজনায় !

চোখ মেলে দেখি কোথাও নেই তো কিছুই আমি ছাড়া ! অন্ধকারে একলা ঘরে সেই তো বিছানায় আমি একাই ! তবে কি কেবল স্বপ্ন দোষেই আক্রান্ত ছিলাম নিদ্রায়? হয়তো তাই ! খোলা জানালায় একফালি চাঁদ উঁকি দিয়ে যেন মুচকি হাসে। ঝিরি ঝিরি বাতাস বয়ে আনছে কোনো ফুলের বাস, দূরে কোথাও এফ এম রেডিওতে বাজছে কোনো স্বর্ণ গান, নিস্তব্ধ প্রকৃতি যেন আমায় দেখে খিলখিলায় ! কেন জানিনা এ রাত্রি আমায় সর্পিল এক আবেগ মাখায় ! আবার ঘুম আসে...নিজের মনেই মুচকি হেসে সব ঝুট বলে চোখ বন্ধ করি।

জানিনা কতক্ষণ ঘুমিয়েছি, ঘুম ভেঙ্গে গেল এক নারী কন্ঠে। কে যেন বলছে ডেকে, "কেমন আছ !" চোখ মেলে চাইলাম, আবার সেই শূণ্যতা ~ বিছানা, আমি, অন্ধকার, আর সেই খোলা জানালা। এখন আকাশে চাঁদ নেই, ঢেকে গেছে কোনো বারিদ পিছে; হাওয়াও এখন তাল মিলিয়ে আনছে না বয়ে সুরভি। কেমন যেন গুমোট মার্কা বিশ্রী এক প্রকৃতি ! নিরানন্দ, ঘোর নিরানন্দ ! মন ছেয়ে যায় বিষন্নতায়, কে ডাকলো তবে? উঠে পরলাম বিছানা ছেড়ে, জ্বলন্ত সিগারেট আঙ্গুলে জড়িয়ে জানালা ভরিয়ে দিলাম ধোঁয়ায়। কিন্তু সেটা বাষ্প হয়ে মিলিয়ে যাওয়ার আগেই আবার সেই রমনীয় কন্ঠস্বর ! "কেমন আছ?" সচকিত হয়ে ঘুরে দাঁড়ালাম, অন্ধকার, প্রবল অন্ধকার ! কম্পিত কলেবর হতে ভাঙ্গা ধ্বনি নির্গত হল, "কে? কে ওখানে?" দরজার কাছে অনুভূত হল আবছা কোনো নারী মূর্তি ! হিম হয়ে এলো দেহ, একি ! কে এ !! "ভয় পাচ্ছ?" "ভয় কিসের?" "আমি তো মানুষ নই !" "তবে শঙ্কা কেন মনে?" "শান্ত হও। কোনো ক্ষতি করব না তোমার। ক্ষতি তো মানুষে করে, আমরা তো কেবল নিরাকার হয়ে ঘুরে বেড়াই।"

ততক্ষণে ভয়ে সিঁধিয়ে গেছি, হাতের সিগারেট কখন জ্বলে নিভে গেছে, আমতা স্বরে বললাম, " ক-কে তুমি?" সে বলল, " তোমারই মত মানুষের পৈশাচিক শিকার আমি। আমি দামিনী। একদিন আমিও মানুষ ছিলাম। হেসে খেলে ঘুরে বেড়াতাম তোমাদের সমাজে। আমারও একটি পরিবার ছিল, একটি ছোট ভাই ছিল, এক বিধবা মা ছিল। তোমারই মত আমার এক সাথীও ছিল। আজ শুধু ছিলটাই আছে, আমি আর নেই !"

"কী হয়েছিল তোমার?" জানিনা আমার অস্পষ্ট ভাষণ সে শুনতে পেল কিনা ! একটা নীরবতা, এক তিমির অন্ধকার, তারপরে সে বলল, "পাড়ায় ছিল কুখ্যাত কিছু কালো হাত, পথে ঘাটে চলতে গেলেই উড়ে আসতো তাদের শ্লেষাক্ত বাণী। একদিন এক রাত্রে ফিরছিলাম কলেজ শেষে, আমি ও আমার সাথী। মদ্যপ কুচক্রীরা জানতাম না থাকবে সেদিন ওঁত পেতে, জানতাম না তাদের লালসার শিকার হতে হবে সেদিন আমাকে ! জানতাম না সাত আট জনের পৈশাচিক অঙ্গ আমায় করবে এফোঁড় ওফোঁড় ! জানতাম না নগ্ন হতে হবে আমায় সেদিন কতগুলো নোংরা চোখের সামনে ! হাজার ক্রন্দন, কাকুতি, মিনতিও সেদিন করতে পারে নি তাদের ক্ষান্ত ! সঙ্গীর আমার মুণ্ডহীন দেহ রইলো পরে রাস্তার 'পরে। যখন তাদের পৈশাচিক তাণ্ডব চলছে আমায় ঘিরে, দেখেছিলাম চেয়ে খেলছে তারা মুণ্ড নিয়ে ফুটবল খেলা ! অকস্মাৎ আঁধার ঘনিয়ে এলো আমার চোখের তারায়, দুহাত জুড়ে মিনতি করেছি, ওগো তোমরা এবার ছেড়ে দাও ! অট্টহাস্যে উঠলো চেঁচিয়ে সেই পিশাচের দল, "তোকে ছেড়ে দেবো আমরা ভেবেছিস কি করে. তোর ভবলীলা সাঙ্গ করে তবেই আমাদের শান্তি !" অকস্মাৎ কঁকিয়ে উঠেছিলাম এক তীব্র যন্ত্রণায়, দেখি চেয়ে ফিনকি দিয়ে ছুটছে শোনিত আমার অঙ্গ চিরে ! কোনো এক লৌহ শলাকা ঢুকছে তার মধ্যে ! অবশেষে নির্বাপিত হল আমার জীবনদীপ, শেষবারের মত মাকে আমার ডেকেছিলাম সেদিন আমি, জানিনা সে বাণী পৌঁছালো কিনা আমার মায়ের কানে !"

ভয় ভীতি দূর হয়ে গেছিল নিজেরই অজান্তে, সেই অশরীরীর নীরব যন্ত্রণা মুহুর্মুহু আঘাত হানছিল আমার বুকে ! তার কান্নায় ধ্বনিত হচ্ছিল "এর বিহিত করো ! বিচার করো এর !" ধীরে ধীরে ভোরের আলো ঘরের মেঝেতে এসে পড়ল, কখন রাত কেটে ভোর হয়ে গেল জানতেও পারি নি। চোখ উঠিয়ে দেখি ঘর শূণ্য, বললাম "আছ?" "দামিনী?" কোনো সাড়া নেই, জানিনা কখন সে চলে গেছে ! মনে পড়ল সেই কথাটা, "সবার উপর মানুষ সত্য, তাহার উপর নাই !"

অশোক কুমার লোধ

1 কমেন্টস্
আলোয় ফেরা
অশোক কুমার লোধ



কথা ফুরিয়ে যাওয়া দুটি মানুষ , একটি বিবাহিতা নারী ও একটি বিবাহিত পুরুষ । ওরা পরস্পরের সহকর্মী । একই অফিসের একাধিক বিভাগে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ পাশাপাশি টেবিলে । স্বাভাবিক সৌজন্য বিনিময়ের পালা শেষ হতেই যে যার মত কাজে ব্যস্ত । দুজনেই কিছুটা অস্বাভাবিক অন্যদের চোখে । কারণে অকারণে ওদের হা হা হি হি নেই , নেই অহেতুক উচ্ছ্বাস , অফিসের চলতি হাওয়ায় বেজায় বেমানান । আসলে রুচিতে বাধে আলোচনার বিষয়বস্তুতে -- কে কার সাথে ঘনিষ্ঠতার সুযোগে ইদানীং অতি উৎফুল্ল , এই মুহূর্তে কি তার রগরগে রসায়ন , কিম্বা কার শাশুড়ি কত বজ্জাত , কে কার বরকে কেমন বাধ্য ছাগল বানাতে পারদর্শী , কিছু মেয়েলি ন্যাকামি বা কিছু পুরুষালী আস্ফালন ও অসভ্যতা – অফিসের এই চলতি রসালাপ বড় বিচিত্র ও বিরক্তিকর । এসবের থেকে দূরে সরে থাকা মানেই অনেকের কাছে তারা অহংকারী , দেমাকি , অসহ্য ।

তমালি সেন , বয়েস ৩০ + , গড়নে গড়পড়তা বাঙ্গালী নারী । চমৎকার কণ্ঠস্বর , কথা শুনলে কানের আরাম হয় । চোখে পরার মতো দুটি গভীর চোখ চশমার আড়ালে , চরম উদাসীন চাউনি । কাজের ক্ষেত্রে যদিও বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ , সহযোগিতা চাইলে সহজেই মেলে । সর্বদাই ইয়ার-ফোনে গান শোনেন বা অন্য কিছু শুনতে ব্যস্ত , কে জানে কি শোনেন ! তবে কীবোর্ডে আঙ্গুল চলে ঝড়ের গতিতে , অদ্ভুত এক যন্ত্র - মানবী না কি বিষাদ প্রতিমা !

দিগন্ত রায় , বয়েস ৩৫ + , সুখী সুখী চেহারায় বুদ্ধিদীপ্ত দুটি অপলক অচঞ্চল চোখ । কাজের অবসরে মুখ গুঁজে থাকেন কোনও বইয়ের পাতায় । কখনো উপন্যাস কখনো বা গল্প , কবিতায় ! কাজের ক্ষেত্রে এনার দিকেও আঙ্গুল তোলার কোনও অবকাশ নেই , কাজের কথা ছাড়া অবশ্য অন্য কোনও কথাই বলেন না তেমন ! অদ্ভুত এক নিঃস্পৃহ নিস্তরঙ্গ জীবনে অভ্যস্ত দুর্বোধ্য মানুষটি ।

এহেন দুটি মানুষের প্রাত্যহিক দেখা সাক্ষাৎ কালের নিয়মে । উভয়েই উভয়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল , সেটা কথায় না বললেও বোঝা যায় , বুঝে যান দুজনেই । এভাবেই বইতে থাকে সময় , চলতে থাকে নিয়মমাফিক কাজ , সাজতে থাকে নীরব কথামালা দুটি মানুষের অন্তরে অন্তরে । একজনের হঠাৎ অনুপস্থিতি অপরজনকে বিচলিত করে , মন খারাপ হয়ে যায় , ফাঁকা ফাঁকা লাগে । আবার ব্যক্তিগত কারণ জানতে চাওয়াও তো স্বভাববিরুদ্ধ । পরস্পরের প্রতি এই যে অদৃশ্য টান , এই সামান্য চাওয়া পাওয়ার কি কোনও বৈধতা আছে ? মুগ্ধতা কি কোনও বৈধতার ধার ধারে কখনো ? না বোধ হয় । এভাবেই কিছু না হ্যাঁ হয়ে যায় , ভেঙ্গে যায় সংযমের দুর্ভেদ্য প্রাচীর ।

কথা ফুরিয়ে যাওয়া দুটি মানুষ অনেক কথা বলতে চেয়ে ছটফট করতে থাকে । শুরু হয় ছোট ছোট সংলাপ , পরস্পরের চোখে চোখ রাখা , দুজনেই পড়ে নিতে চায় না বলা কথাদের , দুটি হাত ছুঁতে চায় কিছু উষ্ণতা , নীরবতা হারায় মুখরতায় । শুরু হয় একসাথে আসা ও যাওয়া । জানা হয়ে যায় পরস্পরের পছন্দ অপছন্দের লম্বা তালিকা , কিছু আলো কিছু ফেলে আসা অন্ধকারের মুহূর্ত ।

তমালি – “ আপনি অনেকটাই আমার মতো ! কু-সংস্কার মুক্ত , বিজ্ঞান - মনস্ক , যুক্তিবাদী , খানিক কাজ পাগলও বটে ! ” দিগন্ত – “ হ্যাঁ , তা বলতে পারেন , আমাদের দুজনেরই রুচি ও সংস্কৃতি-গত মিল থাকায় এই অফিসে আমরা ভীষণ বেমানান । ফাঁকি দিয়ে সরকারী টাকা পকেটে পুরতে বিবেকে বাধে । ” তমালি – “ সে তো একশবার কিন্তু এত দুঃখবিলাস কেন আপনার ? কেনই বা অমন গুটিয়ে রাখেন , আড়ালে রাখেন নিজেকে ? ” দিগন্ত – “ ওই একই প্রশ্ন তো আমারও আপনার কাছে ! ” তমালি – “ কি হবে জেনে ? সব অঙ্কের ভাগফল মেলে না কি ? কিছু ভাগশেষ থেকেই যায় ! ” দিগন্ত – “ জীবনের গণিতে আমিও বড়ই কাঁচা , হিসেবের খাতা ভুলে ভরা । ভালোবাসায় প্রতারিত হয়ে বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত বদল বাবা মায়ের অবুঝ আবদার মেটাতে , না কোনও শঠতা আমি করিনি , তাদেরই পছন্দের একটি মেয়েকে সমস্ত অতীত ইতিহাস জানিয়ে বিয়ে করে বুঝেছি তার মধ্যে কোনও প্রেম নেই , গান নেই , কবিতা নেই , আছে শুধু প্রবল আত্মসুখ , সন্দেহ আর অকারণ অবিশ্বাস । আমি কিন্তু আমার বিবেকের কাছে পরিষ্কার । গড়পড়তা সাদামাটা মানুষ ও চালাকির মুখোশ আমাকে ক্লান্ত করে । বহুদিন পরে আপনাকে পেলাম আমারই মতন সংসার বিমুখ , উদাসীন । ” তমালি – “ বিশ্বাস করুন , আমিও খুব সাধারণ একটি সংসার চেয়েছিলাম নিজের । যেখানে আমার আমির মর্যাদা থাকবে , সুর তাল গান থাকবে জীবনের ছন্দে । আমার বিয়ে করা পুরুষটির স্বরূপ ধরা পড়লো বিয়ের পরে , যে বিয়ের আগে আমার গান শুনে আহ্লাদে গদগদ হয়েছিল , এখন সে চায় না আমি গান করে সময় নষ্ট করি ! আমার চাকরির টাকাটি তার প্রয়োজন , প্রয়োজন সংসারে বিনামূল্যে যাবতীয় কাজ এবং ভোগ করার জন্যে একটি শরীর মর্জিমাফিক , মনের কোনও স্থান নেই সেখানে , এর বাইরে নারীর আর কোনও জগত থাকা অনুচিত বলেই মনে করে যে মানুষ , তাকে মানুষ ভাবতেও ঘেন্না হয় । ”

বোবা কান্নারা মুক্তি চায় অচেনা পাটিগণিতে । জীবনের অঙ্কে হিসেব মেলে না বেহিসাবি সময়ের হাতছানিতে । একাধিক চোখ প্রত্যহ মেপে চলে দুটি মানুষের আচরণ । দিগন্ত ও তমালি দুজনেই বেশ বুঝতে পারে তারা ক্রমশ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে । অথচ কে কি জানে ? আর কতটুকুই বা জানে ? না জানা গল্পটিও অল্প অল্প করে অনেক বড় হয়ে যায় । এই বিড়ম্বনা এড়াতে দুজনেরই চাই কিছুটা সময় আর অকপটে কথা বলার , কাছে আসার নির্জনতা ।

অবশেষে একদিন একসাথে দুজনেই পৌঁছে যায় অচেনা অজানা কোনও এক মড়া নদীর মোহনায় , একটি নির্জন কটেজে । আগল ভেঙ্গে পাগলপারা দুটি শরীর মন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় বাধাহীন স্বতঃস্ফূর্ততায় । ঠিক পুরুষের সাথে সঠিক নারীর মিলন হ’লো ফুরিয়ে আসা গোধূলির আলোয় । সম্পূর্ণ হ’লো দুটি অসম্পূর্ণ জীবন এবং একটি শপথ নিলো দুজনেই – “ এই দিনটির পুনরাবৃত্তি আর নয় । ” বিকেলের আলো ফুরিয়েছে অনেক আগেই , আকশে জমতে থাকা মেঘের কালো কখন যে দু-এক ফোঁটা বৃষ্টি হয়ে ঝরে পরতে শুরু করেছে টের পায়নি কেউই । এরপর বৃষ্টি এলো খুব জোরে । কাকভিজে দুটি মানুষ ফিরে যায় যে যার ঘরে ।

২৯ জানু, ২০১৪

অনুপ দত্ত

0 কমেন্টস্
সেই গানের মানুষটা
অনুপ দত্ত



তার সাথে পরিচয়ের কথা ঠিক মনে নেই I ওর সঙ্গে গানের আসরে যেতাম ৷I মাথার ভেতরে আমার তখন গানের পাগল যেন উলঙ্গ হয়ে নাচে --গাইত সে খুব ভালো I অবধারিত তার ডাক আসতো সবার শেষে ৷i আমার লাভ হতো তার ষ্টেজে উঠার গে,মাঝে মাঝে তার সাথে কথা বলা আর অন্যের গান শোনা I আমরা দুজনে কথা বলা মানে গল্প করতাম ৷ তবে গল্প বেশি হতো তার অন্য পরিচিত নামকরা লোকজনের বা তার অনুপ্রানিত সখী অথবা সখার এক অভাবনীয় গল্প গাঁথা নিয়ে৷I বেশির ভাগ সময়ে সে প্রণব সরকার কথা বা মালবিকা খানের গান গাইবার কথা বলত I তাদের সঙ্গীত জীবনের সাধনার কথা -- প্রনবদার উদ্দাত্ত কন্ঠে রবি ঠাকুরের গান বা লুপ্তপ্রায় বাংলা ভজন গাইবার কথা I কখনো কখনো মালবিকার সুরেলা নজরুলের গান গাইবার কথা বলত I প্রনবদা তো আর বেচে নেই.. তবে তার গান আজও আমার কানে লেগে আছে I মালবিকার কথা জানিনা অনেকদিন...সেই বালুরঘাট ছাড়ার পর থেকে তার সঙ্গে আমার যোগাযোগ নেই I



আমার পাগলপনা গানের মন ভরে যেত যখন তার সঙ্গ পেতাম, আর তার গান শুনতে পেতাম একেবারে খালি গলায় I আহা ...অমন উদ্দাত্ত গলা অনেকদিন আমি শুনিনি I তার সাথে কথা বলে এক অদ্ভুত শুন্যতা নজরে পড়ত I সে এত কথা বলত আমাকে কিন্তু নিজের বিষয়ে বা নিজের ছেলেবেলার কথা কখনো বলত না I কখনো আমার ক্রমাগত অনুরোধে --সে চুপ করে থাকত তারপর এক বিনম্র হেঁসে অন্য কথায় সুর বদলে দিত I কৌতহল হতো আমার I আবার তাকে জোরাজুরি করে দুঃখের ভাগী হতেও মন চাইত না I

একবার শীত জাঁকিয়ে পড়ার আগে তার সাথে অনেক দুরে অনুষ্ঠান করেতে যাবার সুযোগ হলো.....জায়গাটা শিলিগুড়ি I তখনও বালুরঘাটে ট্রেন আসেনি I হবার কথা চলছিল তা প্রায় ২৫/৩০ বছর ধরে I রাজনৈতিক মতবিরোধের এক অনন্য নাজির আর কি I



আমাদের জায়গা থেকে শিলিগুড়ি প্রায় ৭/৮ ঘন্টার রাস্তা হবে বাসে ৷i আমি তো বেশ তৈরী ছিলাম I এমন সুযোগ কি হাত ছাড়া করা যায় I সকালের বাস ...আমাদের পাশা পাশিপাশি সীট পড়েছিলো I সব ঠিক থাক চলছিল ..খুশির মেজাজে... স্বর্গ যেন একেবারে নিচে নেবে এসেছিল ....গর্বের ভেতরে সবকিছু নিয়ে একেবারে হাতের মুঠোয় I

ঘটনাটা ঘটল একটু অন্য রকম ..বাসের ভেতরে এক ১০/১২ বছরের ছেলের সঙ্গে বাস কন্ডাকটারের অভাবনীয় ব্যবহারে তাকে আমি প্রথম দেখলাম বেশ উত্তেজিত হতে I টিকিট কাটতে পারছিল না বলে কন্ডাক্টার ছেলেটাকে বেশ জোরে চড় থাপ্পর মারছিল ....ছেলেটা বার বার বলছিল..

- বাবু..... পয়সা নেই..বাবু.........

- পয়সা নেই..বাবু..........

- খেতে পাই নি আজ দুদিন....শহরে যাচ্ছি কাজের আশায়...যদি কিছু করে খেতে পাই..."



দৃশ্যটা এমন কিছু নতুন নয় এমন ঘটে এবং দেখা যায় সর্বত্র I কিন্তু কেমন যেন অদ্ভুত ছিল I অবাক হবার পালা আমার,যখন দেখলাম সে উঠে গিয়ে কন্ডাকটারের কলার চেপে ধরে দাঁতে দাঁত ঘষে বলছে....

- ওকে চড় থাপ্পর মারার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে ? আপনার ঘরে কি নিজের ছেলে পুলে নেই..... আপনি কি মানুষ, না কি ? কত ভাড়া হয়েছে আমায় বলুন ..আর আমাদের সাথে ওর একটা টিকিট কেটে দিন শিলিগুড়ি অবধি, ও আমাদের সঙ্গে যাবে I

পরের সমস্ত সময় একেবারে চুপচাপ I

আর একটা কথাও হলো না....বাস শিলিগুড়ি পৌছনো পর্যন্ত i আমি বুঝতে পারছিলাম ---কোথাও একটা ছন্দ পতন তার মনে ---কিন্তু কোথায় ?



শিলিগুড়ি এসে গেলে, ছেলেটা বাস থেকে নেবে তার পায়ে হাত দিয়ে প্রনাম করাতে...সে তার দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো কিছুক্ষণ, কোনো কথা তার মুখ থেকে বেরোলো না ..এক গভীর দৃষ্টি দিয়ে ছেলেটার মাথায় হাত খালি বুলিয়ে দিলো I

আমি এত গভীর দৃষ্টি তার ছোখে দেখিনি কখনো আগে... সে দেখার ভেতরে কি এক মায়া ..এক আশ্বাস ...আর কি এক প্রতিবাদের ছায়া তার চোখে দেখতে পেলাম i ডাকবাংলোতে ঠাই হয়েছিল আমাদের I অনুষ্ঠান ছিল শিলিগুড়ি কলেজের ২৫ বছর পূর্তি রজত জয়ান্তি উত্সব পালনের I



যথা সময়ে আমরা কলেজ অনুষ্ঠানে পৌছে গেলাম ....... যথারীতি আবার সেই অপেক্ষা I তার নাম বার বার ঘোষক বলে চলেছে ....

- উনি এসে গাছেন আমাদের মাঝে ..একটু ধৈর্য ধরুন ..নবীনদের হয়ে গেলে উনি স্টেজে আসবেন...একটু সহযোগিতা করুন ...

তখন প্রায় রাত দশটা হবে... অত নিয়ম কানুন ছিল না তখন, যে রাত দশটা বাজলে মাইকে বন্ধ করে দিতে হবে বা পুলিশের পারমিশন লাগবে I তার ডাক আসার দেরী দেখে ..সাহসে শুধাই ...

- কি হোল তোমার আজ..কিসের অভাব মনে হচ্ছে তোমার...আমার কি কোনো অন্যায় হয়েছে ? এত চুপচাপ কেনো ? কথা বলছ না যে....

আমার দিকে তাকালো সে......সেই দীর্ঘ দীঘল চোখের চাউনি দেখতে পেলাম I যেমনটা দেখেছিলাম বাসের ভেতরে...তফাতটা শুধু এখন এক বিন্দু জল চোখে I ভয় হলো আমার ..কোথাও কি আমি আবার আঘাত করলাম তাকে হঠাট সে আমার হাতটা চেপে ধরল .......দেখলাম তার চোখে বেশ জল... প্রায় গড়িয়ে পড়ল বলে ..স্টেজের আলোতে চিক চিক করেছে যেন I এবার বেশ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি I ভেজা চোখ তুলে আমার দিকে চাইল সে -

- মানুষ এত নিষ্টুর হয় কেনরে ৷ I কেন এই সমতার অভাব ? জানিস,বাসের সেই ছেলেটা আজ আমায় আমার ছোট বেলার কথা মনে পড়িয়ে দিলো...এক সময় ওই রকমটা কেটেছে আমার I৷ খাবার ছিল না..,, পকেটে পয়সা ছিল না, দোরে দোরে ভিক্ষা করে বেড়িয়েছি ৷I কেউ ছিল না আমার ৷I বাবা মাকে হারিয়েছি হিলি বর্ডারে , যখন বাংলাদেশের সঙ্গে গুলি গোলা চলছিল ....রাজনৈতিক মতনৈক্য দুই দেশের ভেতরে ...মরলো কিছু নিরপরাধ লোকজন ৷ I বাবা মা গিয়েছিলেন সেখানে এক কাকার বাড়িতে...আমাকে রেখে গিয়েছিলেন মাসিমার বাড়িতে ,খাদিমপুর পাড়ায় I আর ফিরে আসেন নি তারা....এমনকি আমি তাদের আর চোখের দেখাও দেখতে পাইনি আমার বয়েস তখন ওই ছেলেটার মতন হবে I তারপর সংগ্রাম. আর সংগ্রাম ..জীবনের অর্থ কিছু ছিল না আমার কাছে ..যেমনটা হয় রুপোলি পর্দার গল্পের মত ৷ I কি করেছি...আর কি করিনি আজ আমার আর মনে নেই I মনে করতে চাইলে মনেও পড়ে না আর....মনে করতেও চাইনে এখন আমিI৷ শুধু মনে পড়ে.........মনের ভেতরে...মনের আধারে গান ছিল I সুরের মায়াজাল মনের ভেতরে কি এক অপার শান্তি বিস্তার করতো......................

কিছু ক্ষণ চুপ করে রইলো সে I দেখলাম চেহারাটা অনেকটা শান্ত হয়ে এসেছে ..বোধহয় কথা গুলো বলতে পেরে I আবার আমার হাতটা টেনে নিল হাতে বল্লে ...

- স্থান কাল, না বিচার না করে শুধু সুরের সাধনা করেছি আর মনে রেখেছি এক অদ্ভুদ প্রতিবাদের জ্বালা ..অন্যায় বা অনাচারের বিরুধ্যে I

দেখ ভাই , আমি তো আর তোমার মত লম্বা আর বলবান নয় যে দরকার পড়লে দুটো ঘা লাগিয়ে দিলাম আর সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেল ..........আমি মনকে জোর দিয়েছি, জুড়েছি কথা আর সুরের মোড়ে.......

আমি অবক হয়ে শুনছিলাম তার কথা ...এ কোন মানুষ ? কবে থেকে ঘুরছি তার সঙ্গে ..কোনো হদিস পানি তার..দেখছিলাম কেমন করে গুটিয়ে থাকে মানুষ তার নিজের খোলের ভেতরে I আবার যখন জল পায় কেমন নিজেই আবার বাইরে বেরিয়ে পড়ে ..কি তোমার খেলা হে অন্তর্যামী ...হঠাট এক শব্দে বাধা পরলো আমার চিন্তাধারা ..



- এই যে স্যার ..আসুন..দয়া করে.. সেই ঘোষক এসে প্রায় তাকে টেনে তুলে নিয়ে যায় আরকি I



গল্পটা ছেদ পড়ল বলে দুঃখ হলো মনে...সে ষ্টেজে উঠলো ...হাত তালিতে গম গম করে উঠলো সমস্ত আসর i অদ্ভুত এক দৃশ্য দেখলাম আজ....সে সাধারণত বসে এবং নিজে যন্ত্রের সঙ্গে গান গায়...i আজ দেখলাম সে মাইকম্যানকে ডেকে কি যেন আদেশ দিলো I স্টেজ ঠিক দু মিনিটের মধ্যে সাজিয়ে দিলো তারা....সে মাইক হাতে নিয়ে আজ প্রথম গাইল...আজ তার মুখে এক নতুন গান শুনলাম I জানি কথা তার মনে লেখা..সুর তো তার মনের ভেতরে কবে থেকে গুমড়ে গুমড়ে প্রকাশের অভাবে কাঁদছিল ........... আজ বাঁধ ভাঙ্গা জলের মত সে গাইলো........

ওরে মন..যা জেনে যা...
কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলতে হয়
প্রতিবাদে কর প্রতিভূ জয় I
ওরে মন..যা জেনে যা...

দিস না ছেড়ে নিজের আশা
বাঁধিস না ভয় মনে বাসা I
ওরে মন..যা জেনে যা...

দেখবি রে তোর জয়ের ধ্বজা
আকাশে উড়ে দশ ভুজা I
ওরে মন..যা জেনে যা........

কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলতে হয়
প্রতিবাদে কর প্রতিভূ জয় I
ওরে মন..যা জেনে যা........

সৌমেন্দ্র লাহিড়ী

0 কমেন্টস্
কফি হাউস
সৌমেন্দ্র লাহিড়ী



অফিস থেকে বেড়োতে আজ অনেকটা দেরী হয়ে গেছে । বাড়ীতে নিশ্চয়ই এতক্ষনে চিন্তা শুরু হয়ে গেছে, কিছু করার নেই, রাজুর বইটা কিনে নিয়ে যেতেই হবে । বাসটাও ঢিমেতালে চলছে, কলেজ ষ্ট্রীট আসলে নেমে পড়লাম । আমার ভাই রাজু এবার মাধ্যমিক দেবে, আজই টেষ্ট পেপার বেড়িয়েছে, বইটা নিয়েগেলে ওর উপকার হবে । ওই তো আমার একমাত্র ভরসা । বাবাকে সেই ছোট বেলাতেহারিয়েছি, মা চির অসুস্থ, আমি , আমার বোন ,ভাই । বাবার মৃত্যুর পর বাবার জমান টাকা কখন ফুটো কলসীর থেকে জল বেরিয়ে মত শেষ হলো বুঝতেও পারিনি । আমার বোন একজন বিধর্মীকে বিয়ে করে সুখে আছে । আমি হয়ত বিধর্মী হতে পারলাম না বলেই সমস্ত দুঃখের বোঝা বয়ে চলেছি । মাকে ঠিক বুঝতে পারি না কখনও বলে তোর বিয়ে দেওয়া উচিৎ - কখনও বলে তোর বিয়ে হলে আমাদের কি হবে ? কখনও আমিও ভাবি আমার কি হবে? নাঃ - জানি না এর উত্তর আমার জানা নেই ।

বাব্বা ,টেষ্ট পেপার নেওয়ার জন্যও লাইন । লাইনে দাঁড়িয়ে পড়লাম, দেশটার কি যে হলো ,সর্বত্র লাইন । অনেকদিন কফি হাউসে যাওয়া হয় নি । তখনও স্বপ্ন দেখতাম কিছু করার ,আর, মাঝে মাঝেই এসে কফির টেবিলে ঝড় তুলতাম । মনে হলো এক কাপ কফি আসলে কেমন হয় ,নাঃ মনটা খারাপ হয়ে গেল । যাব না কফি হাউস । বইটা নিয়ে টাকা দিয়ে, মানিব্যাগটা ভ্যানিটি ব্যাগে রাখতে রাখতে দোকান থেকে বেড়িয়ে আসলাম । আরে রণজয় না -কেমন চেহারা, উসকো খুসখো চুল , গালে ক'দিনের না কামান দাড়ি । ডাকলাম- রণজয় , রণজয় শুনতে না পেয়ে চলে যাচ্ছিল । আবার ডাকলাম ,এবার দাঁড়িয়ে পড়ে চারদিকে খুঁজতে লাগল ,এগিয়ে গিয়ে বললাম - কি হলো রণজয় চিনতে পারছ না ? নাকের উপর চশমাটা ঠিক করে নিয়ে ভাল করে দেখল -আরে মোহিনী !

-যাক চিনতে পারলে তা হলে ,আমি তো ভেবেছিলাম চিনতেই পারবে না । -আসলে অনেকদিন পরে দেখা ,কেমন আছ মোহিনী ? -ভালো তুমি কেমন আছো ? -মন্দ নয় অনেক কথা জমে আছে, চল একটু কফি হাউসে আমার দিকে তাকিয়ে রণজয়ের কথা শেষ হল না । কিন্তু আমার তো অনেক কথা বলার আছে, তাই আমিই বললাম -হ্যঁা ,চল খানিকক্ষন কফি হাউসে গিয়ে বসি । কফির টেবিলে দুটো কফির অর্ডার দিয়ে আমরা বসলাম । কিছু সময় নিঃশব্দে কেটে গেল । আজ থেকে আট বছর আগে ঐ কোনের টেবিলটায় পাক্কা দুঘন্টা একজনের জন্য অপেক্ষা করেছিলাম , বাড়ী ফিরে গিয়ে তার প্রত্যাখানের চিঠি পেয়েছিলাম কারন - আমি আমার মা , ভাইবোনেকে চিরদিনেজন্য ছাড়তে পারব না বলে- আসলে শর্ত ছিল- গরীব মা ভাইবোনের সাথে সম্পর্ক রাখা যাবে না ।

-কিছু বলো রণজয় , এভাবে চুপচাপ বসা যায় না । -কেন ? এর আগে তো কফির টেবিলে মধ্যমনি তো তুমিই থাকতে । - সে মোহিনী অনেক পাল্টে গেছে সেটা তো তুমি জান রণজয় । মুখ তুলে আমার দিকে দেখল তারপর চোখ সরিয়ে নিল , -জান মোহিনী, আমি খুব কষ্টে আছি - কিসের কষ্ট তোমার রণজয় ,তোমাদের মত বড়লোক সারা কলকাতায় কজন আছে গুণে বলতে পারা যাবে । - আর্থিক কষ্ট নয় মোহিনী, মানসিক কষ্ট -আমরা তো গরীব , আমার সামান্য আয়েই সংসার চলে ,তাই আমাদের কাছে কষ্ট হলো অর্থাভাব । রণজয় তীক্ষ্ণ নজরে আমার দিকে তাকাল তারপর মাথা নিচু করে টেবিলের ওপর জড়ো করে রাখা হাত দুটোর উপর রেখে বলতে লাগল - - আজ আমি প্রত্যাখ্যাত । রুবি আমাকে ছেড়েচলে গেছে, জান মোহিনী ও বলেছিল আমার কবিতা লেখা সিগারেট খাওয়া ওর পছন্দ নয় । কবিতা সিগারেট নয়ত রুবিকে যেকোন একটা ছাড়তে হবে বলে জানিয়েছিল । সেদিন এক কবি সম্মেলন থেকে বেড়োতে দেরী হয়ে যায় বলে রুবি কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থেকে চলে যায় ,তারপর আর ওর দেখা পাই নি, আমাকে বার বার ফিরিয়ে দিয়েছে । পরশু বিকালে এস এম এসে বলেছে ওকে ভূলে যেতে । আমি কি করব মোহিনী ?

রণজয়ের উসকো খুসকো চুলে হাত বুলাতে ইচ্ছে করল । কিন্তু না....... - গোলাপ যদি নিতে চাও কাঁটা সাথে নাও সুখ যিদ পেতে চাও দুঃখ সাথে নাও ভালবাসা যদি পেতে চাও বিরহ সাথে নাও আলো যদি পেতে চাও অন্ধকার সাথে নাও কিছু যদি পেতে চাও তবে কিছু দাও । রণজয় মুখ তুলেদেখল -এখনও তোমার মনে আছে? - একথা গুলি আমি কখনই ভুলতে পারব না রণজয় ,বার বার মনে করতে করতে শব্দ গুলি আমার মনে স্থায়ী বাসা বেঁধে ফেলেছে । -মোহিনী তুমি আমায় ক্ষমা করতে পার না ? -ক্ষমা ,দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে আসল একটা -আমি তো তোমাকে ক্ষমা অনেকদিন আগেই করেছি । -তবে ফিরে এস মোহিনী আমায় গ্রহন কর ।

রণজয় ,তুমি আজ প্রত্যাখ্যাত বলেই কি আমাকে পেতে চাও? তুমি যে কারনে আমাকে প্রত্যাখান করে ছিলে, তা এখনও ভীষন ভাবে বর্তমান । সংসারের গুরুদ্বায়িত্ব এখনও আমার কাঁধে ,যা আমি অস্বীকার করতে পারিনা । সব জেনেও কেন দীর্ঘ আট বছর পর ফিরেএলে ? তোমাকে এখনও ভালবাসী রণজয় , তোমাকে পেলেই আমি সবচেয়ে খুশী হবো । তবু, তোমার ডাকে সাড়া দেবার ক্ষমতা আজ আমার মধ্যে বিলীন হয়েছে,স্যরি রণজয় পারলাম না তোমায় আপন করতে ।

ম্লান হাসি হাসলাম - - কোণের ঐ টেবিলটার থেকে আজ এই টেবিলে দীর্ঘ আটবছর সময় বয়ে গেছে ।আমার বেড়েছে আরও দ্বায়িত্ব । কিন্তু, জীবনের এই অমুল্য আটবছরের মুল্য কে দেবে রণজয় ?

- প্লিজ মোহিনী আমাকে একটা চান্স দাও । আমি সমস্ত দোষ স্খালন করতে চাই ।

ভ্যানিটি ব্যাগ তুলে দাঁড়িয়ে পড়লাম-চলি রণজয়,মা চিন্তা করছে, বাড়ী ফিরে রান্না করতে হবে ।

চেয়ার সরিয়ে টেবিলে ছেড়ে বেড়িয়ে আসলাম , রণজয় উঠতে গিয়েও বসে পড়ল । এগিয়ে যেতে যেতে দেখলাম সেই টেবিলে একটা মেয়ে একা বসে আছে , হয়ত কারো প্রতীক্ষায় আমারই মতো । কফি হাউস ছেড়ে রাস্তায় নামলাম ,যেন বুকের উপর থেকে একটা ভারী ওজন সরে গেল ।