ছোটগল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ছোটগল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

২ এপ্রি, ২০১৪

সৌমেন্দ্র লাহিড়ী

0 কমেন্টস্
(ছোটগল্প)

ভিজিটিং কার্ড

সৌমেন্দ্র লাহিড়ী



পাখী আজ একমাস পর বিউটি পার্লারে গিয়েছিল । আসার সময় লিপষ্টিক নেলপালিশ আরো টুকিটাকি কিনে ফিরেছে । যদিও দেখতে সে খুবই সুন্দর তবুও সবসময়েই সেজেগুঁজে থাকতে ভালবাসে । পাড়ার সবাই তাকে ভালবাসে তনুমাসি তো চোখে হারায় । তাছাড়া পাখী মাত্র পনের বছর বয়সে মাকে হারিয়েছে, তাই হয়ত সকলের ভালবাসা একটু বেশীই পায় ।

মা চলে যাবার আট বছর হয়ে গেছে । বেশ ছিল ছোটবেলার দিনগুলো মায়ের হাত ধরে স্কুলে যেত, দুপাশে দুটো ছোট্ট বিনুনি ঝুলিয়ে , সবাই গাল টিপে আদর করত । সারাদিন মায়ের কাছে থাকলেও বিকেলের পর থেকে সে তনুমাসির কাছেই থাকত , তনুমাসিকে পাখীর মাও মাসি ডাকত ।


পাখী ধীরে ধীরে কখন যেবড় হয়ে গেছে বুঝতেও পারে নি । মা - কিএকটা রোগে ভূগে ভূগে চলে গেল । প্রথমে কিছু চিকিৎসা হলেও, পরে বিনা চিকিৎসাতেই মারা গেছে । ক' দিন খুব কেঁদেছিল পাখী - পৃথিবীতে আপন বলে ঐ একজনই ছিল । কিন্তু পেট বড় দায় - শুরু হলো নতুন জীবন । মায়ের জায়গায় নিজেকে মানিয়ে নিতে এতটুকু অসুবিধা হয় নি পাখীর । ছোটবেলা থেকেই তো মাকে দেখে এসেছে । যেটুকু অস্বস্তি ছিল তাও তনুমাসির দৌলতে কেটে গেছে । এখন পাখী এ পাড়ার আকর্ষণ- মধ্যমণি ।

দুপুরে খাওয়ার পর একটু গড়িয়ে নেওয়া অভ্যেস পাখীর - কিন্তু, আজ আর হলো না । কি মনে হলো - মায়ের পুরানো টিনের বাক্সটা খুললো । মায়ের গোলাপী শাড়ীটা এখনও প্রায় নতুন আছে , মাত্র দু একদিন পরেছিল । শাড়ীটা তুলে নিলো , মাকে এই শাড়ীটাতে দারুণ লাগত - আজ এই শাড়ীটাই পরবে । শাড়ীর পাশে সেই পুঁটুলি, যেটা মা যত্ন করে রাখত । খোলার ইচ্ছে হয়নি কোনদিন ,তাছাড়া তেমন প্রয়োজনও হয় নি । পুঁটুলিটা রেখে শাড়ীটা নিয়ে উঠে পড়ল পাখী ।


শাড়ীটা খুব সুন্দর করে পড়ল পাখী । নতুন কেনা গোলাপী নেলপালিশটা যত্ন করে পরল । ফুঁ দিয়ে দিয়ে নেলপালিশটা তাড়াতাড়ি শুকাল পাখী । শুরু করল মেকআপ- ধীরে ধীরে সুন্দর পাখী অপরুপ হয়ে উঠল । আয়নাতে নিজেকে আজ বেশীই ভাল লাগল পাখীর ।

আজ আর বাইরে দাঁড়ানোর দরকার নেই । তনুমাসি সকালেই বলে গেছে । ঘরে বসেই অপেক্ষা করতে লাগল পাখী- কখন দরজায় টোকা পড়ে । বেশীক্ষণ বসতে হলো না - ঠিক সময়েই দরজায় টোকা পড়ল । দরজা খুলে দেখল- তনুমাসি আর এক খদ্দের, বয়স প্রায় ষাটের কাছাকাছি, ধোপদুরস্ত পোশাক - খুশীই হলো পাখী । এদের কাছে একটু বেশীই পাওয়া যায় । তনুমাসি চলে গেল লোকটা ঘরে ঢুকল ।

অল্প সময়েই পাখী বুঝতে পারল লোকটা একদম আনকোড়া নয় । ঘন্টা দুয়েক সময় কেটে গেল । লোকটা উঠে দাঁড়াল । পাখীও নিজেকে সাব্যস্ত করে তুলল ।

লোকটা পকেট থেকে টাকা বের করে পাখীর হাতে দিল - পাখীও অভ্যস্ত হাতে গুনে দেখল - অন্যদিন যা পায় তার থেকে অনেকবেশীই আছে । লোকটা এবার একটা ভিজিটিং কার্ড বের করে বললো -" তুমি আমায় খুশী করে দিয়েছো, যদি কখনও দরকার পড়ে যোগাযোগ করো" । কার্ড হাতে নিয়ে পাখী দাঁড়িয়ে থাকল- লোকটা ধীরে ধীরে বেড়িয়ে গেল ।

মনটা কেমন উদাস হয়ে গেল পাখীর - অন্যদিন তো এমন হয় না, দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়ল । টাকাগুলো বালিশের তলায় রেখে ভিজিটিং কার্ডটা ভাল করে দেখতে লাগল । হঠাৎ দেওয়ালে ঝোলানো মাকালীর ছবি দেওয়া ক্যালেন্ডারের দিকে নজর পড়ল পাখীর - আজ- আজই তো মায়ের মৃত্যুদিন, চোখ থেকে জল চলে এলো । ছুটে গেল পুরানো টিনের বাক্সটার দিকে - মায়ের একটু ছোঁয়া নিতে । বাক্সটা খুলে প্রথমেই নজরে পড়ল পুঁটুলিটার দিকে, তুলে নিয়ে বসল বিছানায় । খুব যত্নে পুঁটুলিটা খুলল - মায়ের একটা পুরানো জরা জীর্ণ ফোটো , একজোড়া রুপোর দূল , একটা ভাঙা নুপুর - ওগুলো বুকের কাছে জড়িয়ে ধরল ।আরে ছবিটার পেছনে আটকে আছে একটা পুরানো পোষ্টকার্ড । পোষ্টকার্ড খুলে নিল ফোটোর থেকে ।


মায়ের লেখা একটা ছোট্ট চিঠি । ঠিকানা ভূল হওয়ায় ফিরে এসেছিল । লেখা মাত্র কয়েকটা শব্দ - "বাবু তোমার মেয়ে হয়েছে , মা হয়ে আমি চাই না ও এখানে থাকুক ,আপনি এই নরক থেকে ওকে নিয়ে যান , আমার প্রণাম নেবেন । ইতি রমলা" । চিঠিটা পড়েই তাড়াতাড়ি উল্টে দেখল ঠিকানাটা ,কিন্তু - ঠিকানাটাই তো ভূল, নামটা পড়ল - আরে ,এই নামটাই তো একটু আগে লোকটার দেওয়া ভিজিটিং কার্ডে ...................

স্তব্ধ হয়েগেল পাখী । নিঃশব্দে চোখের জল গড়িয়ে পড়তে লাগল । নিজের নারীত্বকে খুব ঘৃণা হতে লাগল - খুন করতে ইচ্ছা করল নিজেকে, না পেরে নিজের তলপেটে আপ্রাণ ঘুঁষি মারতে শুরু করল ।

দরজায় আবার টোকা - শব্দটা আরো জোরদার হতে লাগল ।

৩০ ডিসে, ২০১৩

ছোটগল্প - শ্রীশুভ্র

0 কমেন্টস্
জন্মের দাগ
শ্রীশুভ্র

 

(পর্ব=১)

গড়িয়াহাটার মোড়ে ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে মনে মনেই বিড়বিড় করছিল মন্দিরা! অদ্ভুত সব কাজকারবার এদেশের! দরকার রাসবিহারী রোডের উপর উড়ালপুল! তৈরী হল গড়িয়াহাট রোডের উপরে! আশ্চর্য্য! অথচ বাইপাস মুখি ট্রাফিকের সংখ্যা ঢাকুরিয়া মুখির থেকে অনেক বেশি! কিন্তু কে কাকে বোঝাবে? সিগন্যাল পেয়ে যেতেই যে একসিলেটরে চাপ দেবে সে উপায়ও নেই! এত ব্যস্ত একটা মোড়ে সেটা সম্ভবও নয়! মানুষের ভিড়ে গাড়ির ভিড়ে রাস্তা ফাঁকা পাওয়াই দুস্কর! তারপর যত্রতত্র অটো! কখন একটু ধাক্কা লেগে যাবে, দোষ হবে চারচাকার! সামনের শাদা রঙের সুইফ্টটাকে ওভারটেক করতেই আবার ফোনটা বেজে উঠল! ডেস্ক থেকেই ফোন করেছে! পেশেন্টের অবস্থা ক্রমেই খারাপ হচ্ছে!

গতকালই গুরুতর আহত হয়ে এমার্জেন্সিতে ভর্ত্তি হয় একজন! মোটর সাইকেল একসিডেন্টে! মাথায় হেলমেট ছিল, তবুও সিটি স্ক্যানের রিপোর্টে ইনটারনাল হেমারেজ ধরা পড়েছে! পেশেন্ট পার্টিকে জানানোও আছে অবস্থা ফিফটি ফিফটি! অন্তত বাহাত্তর ঘন্টা না গেলে ভরসা দেওয়ার মতো বলার উপায় নেই কিছু! পেশেন্টের অবস্থা কিছুটা স্টেবল হলেই একটা মেজর অপারেশন করতে হবে! আইসিসিইউতেই রাখা আছে! কিন্তু সকাল থেকেই পেশেন্টের পাল্সরেট ফল করে যাচ্ছে! সুগার হাই! ফলে অসুবিধেও আছে! রঞ্জন আছে! কন্স্ট্যান্ট মনিটরিং করেও যাচ্ছে! তবু ডিপার্টমেন্ট হেড হিসেবে সব দায়িত্ব মন্দিরারই! পার্কিং স্লটে গাড়ি রেখেই মন্দিরা লিফ্টের দিকে দৌড়ালো!

ডঃ রঞ্জন প্রাথমিক ধাক্কাটা সামলে দিয়েছেন! মন্দিরা পেশেন্টের অবস্থা দেখে নিউরোলজির জয়ন্ত বিশ্বাসকে ডেকে নিল! তিনি সব রিপোর্ট দেখে মাথা নারলেন! - মনে হচ্ছে সার্ভাইভ করবে না বুঝলেন!

-এখনই অপারেশনের রিস্কটা নিলে!

-গড নওজ! তবে পেশেন্ট পার্টি যদি রাজী হয়! বলেই নিতে হবে, চান্স নেই তবুও...

-রাইট! আমি বলে রেখেছি যদিও!

-না! দে সুড নো, উই আর ট্রাইং আওয়ার লেভেল বেস্ট আগেইনস্ট অল ওডস!
একচুয়্যালি চান্স ইজ ভেরী স্লীম!

মন্দিরা ডঃ রঞ্জনকেও ডেকে নিল! রঞ্জনও সহমত হলেন!
-যদিও লস্ট কেস, ইয়েট উই ক্যান গীভ ইট আ লাস্ট ট্রাই!

মন্দিরা ওটি রেডি করতে বলে পেশেন্ট পার্টির সাথে কথা বলে নিতে বলল ডঃ রঞ্জনকে!

ওটি থেকে বেরোতেই ভদ্রলোককে দেখে খুব চেনা চেনা মনে হল! কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারল না মন্দিরা! উদ্বিগ্ন মুখে পেশেন্টের খবর জানার জন্য দাঁড়িয়ে ছিলেন! নীল রঙের কোট প্যান্টে দীর্ঘ ঋজু চেহাড়া! এক মাথা শাদা ঢেউ খেলানো চুল! বয়স হলেও নির্মেদ টান টান শরীর! মন্দিরা কে দেখেই একরাশ উৎকন্ঠা নিয়ে পেশেন্টের খবর জানতে চাইলেন!

আশ্বস্ত করার মতো অবস্থা নয়, তবু ডাক্তারিতে আশা করেই যেতে হয়!

বলল ঈশ্বরের উপর ভরসা রাখতে! নিজে যার উপর কোনো ভরসাই রাখতে পারেনি কোনোদিন!

ভদ্রলোককে পেড়িয়ে যেতে গিয়ে হঠাৎই চোখে পড়ে গেল ওর বাঁদিকের কানটা! আর তখনই টুটুনের শেষ কথাটা মনে পড়ে গেল মন্দিরার! এতগুলো বছর পর!

সেই দিনটার কথা আজও ভুলতে পারেনি মন্দিরা! মন্দিরা তখন ক্লাস নাইনের ছাত্রী! আর টুকুন যাদবপুরে আর্টসে সেকেণ্ড ইয়ার! ছাত্র রাজনীতির হাত ধরে ক্রমশই জড়িয়ে পড়ছে দলীয় রাজনীতিতে! রাজনীতির বিষয়ে তখনো বোঝবার মতে বয়স হয়নি মন্দিরার! তবু টুকুনের মুখে বিশ্ব অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে আর্থসামাজিক স্তরে রাজনীতির গুরুত্ব নিয়ে অনেক কথাই শুনতো! দেশের মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষা, দূর্নীতির প্রতিরোধে ছাত্রসমাজের ভূমিকা, আরও কত কিছু নিয়ে একনাগারে বলে যেত টুকুন! খুবই রূপবান ছিল! বেশ একটা নায়কোচিত নেতৃত্বের ভাব ফুটে উঠত ওর উদ্বীপ্ত কন্ঠস্বরে! আর সেটাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো আকর্ষণ করতো ক্লাস নাইনের মন্দিরাকে!

সেদিনটা ছিল লক্ষ্মীপূজোর পরদিন! বুধবার! আগেরদিন বড়ো মাসীর বাড়িতে ধুমধাম করে লক্ষ্মীপূজোয় সবাই হইচই করেছে! টুকুন বরাবরই এসব ধর্মীয় বিষয় থেকে দূরে থাকলেও সবাই মিলে একজায়গায় জড়ো হওয়ার উৎসবে ঠিক সামিল হয়ে যেতো! কিন্তু সেদিন টুকুনের যেন কি হয়েছিল! সবার মাঝে থেকেও যেন একা হয়ে যাচ্ছিল! মন্দিরার বুঝতে অসুবিধে হয়নি, কিছু একটা সমস্যা নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছে ওর ভেতরে! প্রথমে জিজ্ঞাসা করেও সদুত্তর পায়নি! কিন্তু চাপা টেনশনের একটা আঁচ মাঝে মাঝেই ফুটে উঠছিল ওর চোখেমুখে! আর সেটা ঢাকার চেষ্টা করছিল এর ওর পেছনে লেগে! কেউ না বুঝলেও মন্দিরার বুঝতে দেরি হয়নি! টুকুনকে ও অনুভব করতে পারত অনেক গভীরে!

খুব বেশি কিছু বলেনি টুকুন! শুধু বলেছিল পার্টির মধ্যে দূর্নীতিগ্রস্ত মাফিয়ারাই শক্তিশালী হয়ে উঠছে দিনে দিনে! এদেরকে এক্সপোজ্ড করতে হবে! তখনো জানতো না হয়ত, মাফিয়াদের হাত কতটা লম্বা! পরের দিন খবর পেয়ে মন্দিরা যখন বড়ো মাসির বাড়ি পৌঁছালো তখন মেডিক্যাল থেকে টুকুনের ডেডবডি রওনা দিয়েছে! বড়ো মাসি তখন অচৈতন্য! কে বলবে এই বাড়িতেই আগের দিন অত আনন্দ উৎসব হয়েছে! সকালের বাজারটা টুকুনই করতো! কিন্তু সেদিন আর বাজারে গিয়ে পৌঁছাতে পারেনি! বড়ো রাস্তার মোড়েই পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে শুট করে দিয়ে চলে যায় দুটো ছেলে! গুলিবিদ্ধ টুকুনকে পাড়ার ছেলেরাই হাসপাতালে নিয়ে যায়! কিন্তু পথেই শেষ হয়ে যায় টুকুনের যাবতীয় প্রতিরোধ!

একজন মোটর সাইকেলে ছিল! আর একজন টুকুনকে গুলি করেই চালকের পিছনে উঠে পালিয়ে যায়! মৃত্যুর আগে পাড়ার ছেলেদেরই বলে যায় টুকুন! শুধু শেষ কথাটা বলেছিল, শ্যুটারের একটা কানে বিশাল একটা কালো জরুল! না আর কোনো কথা বলার সামর্থ্য হয়নি টুকুনের! সেই ক্লাস নাইন থেকে সেই দিনটা তাড়া করে বেড়ায় মন্দিরাকে! আজ এতগুলো বছর- সারাটা জীবন টুকুনের মতো আর কাউকেই খুঁজে পায়নি! বলা ভালো খুঁজতে চায়নি! বুকের নিভৃতে সেই স্মৃতিটুকু নিয়েই বাঁচিয়ে রেখেছে ওর টুকুনকে!

ভদ্রলোকের বাঁ কানেও বিশাল একটা কালো জরুল! শাদা চুলের ফাঁক দিয়েও চোখে পড়ে গেল মন্দিরার! অনেক, অনেক গুলো বিনিদ্র রজনী অপেক্ষা করেছিল হয়ত এই দিনটার জন্যেই!

ছোটগল্প - শমীক (জয়) সেনগুপ্ত

1 কমেন্টস্
আজগুবি নয়
শমীক (জয়) সেনগুপ্ত



মন ভালো নেই, কান্না পাচ্ছে বা কষ্ট হচ্ছে খুব- এ সব নিয়ে পাতায় পাতায় যে শিরশিরানী উত্তুরে হাওয়ায় ভাসিয়ে দিয়েছিল ছেলেটা.. তার খবর নিতে দরজায় নক না করে ঢুকে পরলো

মাতাল পবন; আচ্ছা আজ নাকি ফুলেদের সাথেও ও কথা বলেনি! গঙ্গাফড়িং আর গুবরে পোকা কানাকানি করছে... "এটা ওর বড় বেশী দেমাক। একরত্তি ছেলে সে কি না -"

"চুপচুপ, " সাবধান করে দেয় প্রজাপতি;ছেলেটা বাঁশী হাতে ঐ পথ দিয়েই যাচ্ছে- বাঁশের বাঁশীতে সুর নেই। দুপুরের আলসেমি মেঘে মেঘে অভিমান এঁকে দিয়েছে। আমবাগানে বোল ধরতে এখনো মাস তিনেক বাকি। কিন্তু সবাই তার দিকে তাকালেও আজ তার বড্ড একা লাগছে। ছেলেটার ঠোঁটে লাল আভা, ভারী দগদগে। তাই বাঁশী তার হাতে বাজছে না। সব চুমুতেই ছ্যাঁকা পোড়া হচ্ছে মন। রোদ্দুরে পিঠ ঠেকিয়ে শক্ত চোয়ালে ছেলেটা বাঁশী আঁকড়ে

বসে আছে।

"ও ছেলে তোর পিঠে রোদ লাগছে না ?"

লাগুক।

"তোর পিঠ পুড়ছে যে-"

পুড়ুক।

"কষ্ট হয় না !!"

চোখের জল চেপে ছেলেটা বলল "আমার এখন ভারী সুখ।"

তারপর কত সময় নুড়ির ফাঁকে ফোকড় বেয়ে জল এল কুলকুলিয়ে.. শ্যাওলার সোঁদা দাগে

সবাই আমের মুকুলের অপেক্ষায় আছে । কিন্তু ছেলেটার কথা সবাই ভুলে গেছে । বুড়ো আমগাছ খালি বলল "ছেলেটা বাঁশী বাজাবে না ?"

আকাশের তারাগুলো সবাই যদি ছেলেটাকে আলো দিত না পুড়িয়ে তবে হয়ত' সুর থাকত আজ। কৃষ্ণগহ্বরে আলো থাকে না ।। যেমন অভিমানে আলো থাকে না । সেখানে কে যেন

ডাকলো " ও ছেলে-"

শব্দগুলো ব্রক্ষ্মের আকার ধারন না করেও বুদ্বুদের মত মিশুক অন্য কোন কালো বুকে- সব ডাকে সাড়া মেলে না,যেমন ভাবে সব রূপকথাই আজগুবি নয়।।

হালকা হালকা ঠান্ডা পরেছে আর আমার ঘুমে ঢুলতে থাকা চোখে

পিঁপড়ের কামড়ের মত স্বপ্নগুলো কুটকুট করছে। কথা ছিল জেগে

জেগে স্বপ্নের ওপর রঙ বুলাবো,কিন্তু সাদা কালো ক্যনভাসে আর সব রঙই বেমানান। আচ্ছা আমি না কি খুব সুন্দর হয়ে উঠি যখন ঘুমোই, আর জেগে থাকলে ভীষণ বেখাপ্পারকমের অদ্ভূত থাকে আমার মন.. আসলে আমি বুঝতে পারি না। মেঘেরা খবর চালাচালি করে রোদ বৃষ্টির ফাঁক দিয়ে আর ভুলে যদি কখনো সে খবর আমার কাছে আসে হাওয়ায় ভেসে ভেসে আমি তখন শুনে ফেলি...তবু বুঝতে পারি না।

রাতের অন্ধকারে আমার নরম তুলতুলে টেডিটাকে জড়িয়ে ভুলতে চাই নিজের অস্তিত্ব, আসলে বয়স আমায় প্রাচীণ করেনি। মন আমার জড়তাকে আকাশ বানিয়েছে..আর চিন্তাগুলোকে নদী।

আর একফালি রোদ্দুরে হাসি এলোমেলো হাওয়ার খাঁজে লুকিয়ে থাকা মন খারাপকে বলে," এই বেঁধে দিলাম রুমাল তোর দু চোখে, এবার কানামাছি ভোঁ ভোঁ.......... সুখ পেলে তবে ছোঁ ।"

সুখটা এখন অনেকটাই গরম ভাঁড়ে ঠান্ডা চায়ের মত হয়ে গেছে।

হাত জ্বলছে, এদিকে পাঞ্ছা মিয়ানো অনুভূতি। পেলাম তবু মন ভরে না। ওদিকে দুঃখটাও আরেক কাপ চা... সে হল ঠান্ডা কাপে ছ্যাঁচ্চোর গরমের মত, জিভ পুড়িয়ে জাহির করে আমি আছি।

মিয়ানো চায়ের স্বাদ পাল্টাতে অদলবদল পলিসি চলে কিন্তু পোড়া

জিভে যে ক্যান্ডিডও কাজ করে তিনদিন পর থেকে ঐ জ্বালা বোঝে কোন শালা।

আমাদের সব ভাব ভালবাসা চায়ের টেবিলেই ।।

আর সব কল্পনাই আসলে বাস্তবের নামান্তর ।।

ছোটগল্প - জয়তী ভট্টাচার্য্য

1 কমেন্টস্
ভোলামন মন রে
জয়তী ভট্টাচার্য্য



বচ্ছরে এই একবার ''টেচকি'' চাপে দাস পরিবার ! দাস বাবু, দাসগিন্নি, আর ওনাদের তিন ছেলে মেয়ে ।

প্রত্যেক বছর ছেলেমেয়ের ইশকুলে বড়দিনের ছুটিতে যখন পুরী যাওয়া হয় দিন চারেকের জন্য । তা এই বছরেও দাস পরিবারের এই বাত্সরিক পুরী ভ্রমন এর কোনো ব্যাত্যয় হয় নি । হাবরা (হাওড়া আর কি) ইষ্টিশন থেকে জগন্নাথ এক্সপ্রেসে চেপে এবারেও প্রতিবছরের মত ওরা যাবে পুরী । “জয় জগন্নাথ !!” বলে বেরিয়ে পড়া গেল । প্রতিবারের মত এবারেও মালপত্তর একটু বেশি রকমের বেশি হয়ে গেছে । দাস পরিবারের কর্তা গিন্নি ট্রাভেল লাইট কি জিনিস জানেন না, জানলেও মানেন না । সঙ্গে প্রচুর জামাকাপড়,শীতের চাদর ,বাচ্চাদের গরম জামা, জলের বোতল,'' টিফিন কেরি ''। সব মিলিয়ে সঙ্গের জিনিসপত্র এক্কেবারে গন্ধমাদন হয়ে উঠেছে! তাতেই সুখ ! কম জিনিস পত্র নিয়ে বেড়াতে যাওয়া আবার কেমন ধারা বেড়াতে যাওয়া ? বিদেশ বিভুই জায়গায় গিয়ে অসুখবিসুখ যদি করে ,তার জন হরেক রকমের ওষুধপত্র, সে-ও ভুল হয়না ! তা এবারেও দাস পরিবার, যথারীতি হরেক আকারের বাক্স প্যাঁটরা সঙ্গে নিয়ে , দশ বছরের আর চার বছরের দুটি ছেলে,আর সাত বছরের একটি মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে বেড়িয়ে পড়লেন,হাওড়া ইষ্টিশনের দিকে ।''টেচকি ''তে ফাইনালি চাপার আগে দাসবাবু তিনবার ফিরে গেলেন,দরজা খুলে বাড়ির ভিতরে গেলেন, সব ঘরের আলো গিন্নি শেষ মুহুর্তে নেভাতে ভুলে গেছেন কিনা দেখে নিলেন,ফ্রিজ অফ হয়েছে কিনা,গ্যাস সিলিন্ডার বন্ধ করেছে কিনা,এই দেখো কান্ড,বাড়তি পড়ে থাকা কটা মাছের টুকরো পাশের বাড়ির ফ্রিজে রাখতে পাঠাবে ভেবে কৌটোয় রেখে শেষ অবধি ভুলে গিয়ে রান্নাঘরের তাকে রেখে সাত তাড়াতাড়ি গিন্নি গিয়ে টেচকি তে চেপে বসে আছে । সংসারে একটুও যদি মন থাকে ! সেই কৌটো নিয়ে বেড়িয়ে ছোট ছেলের হাতে পাশের বাড়িতে রেখে আসতে পাঠালেন, গিন্নিকে মৃদুমন্দ একটু ধমক লাগিয়ে । ধমকের ডোজ বেশি হলে, সেখানে পৌঁছে ,রাত্রে ছেলেপুলেগুলো ঘুমুলে রাত্রিকালীন সুখটি মাটি,বিদ্রোহিনী হয়ে উঠবেন গিন্নি । শেষ পর্য্যন্ত রওনা হওয়া গেল ! ''টেচকি'' একটু করে এগোয় আর দাসবাবুর ইটা মনে পড়ে সেটা মনে পড়ে।

- ওষুধ নিতে ভোলোনিতো ?

- “টিপিনকেরি”টা কে নিল ? টেচকির ডিকিতে ভুলে রেকে দাওনি তো ?

গিন্নির সরোষ জবাব ধেয়ে আসে বুলেট এর মত ,

- ''নারে বাবা , ওই তো মিনির হাতে ধরা আছে , দেখতে পাচ্ছ না ?''

- ''তপনকে বলেছ ? রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠে বাড়ি থেকে চলে যাবার সময়ে পাখা আলো সব যেন ঠিকঠাক নিবিয়ে যায় ?''

এবারেও গিন্নির বুলেট বর্ষণ ,

- ''হ্যারে বাবা ! গতবার ভুলে গেছিল বলে কি এবারেও ? আমার ভাই অত ভুলো নয় , বরঞ্চ সেই যে সেবার ঠাকুরপো কি করেছিল মনে নেই তোমার?''

- ''কি করেছিল?''

- ''তা মনে থাকবে কেন? এ যে তোমার নিজের ভাই, গ্যাস নেভাতে ভুলে গেছিল , সকালে উঠে চা করে খেয়ে গাস্ত জ্বেলে রেখে চলে গেছিল''-

- ''তাতে কি? আমরা তো সেদিন ভোরবেলায় ফিরে এসেছিলাম ,বেশি গ্যাস খরচ হয়নি''

- তা আমার ভাই পাখা নেবাতে বুলে গেলেই বা তাইলে কি এমন মহাভারত অশুদ্ধ হবে শুনি ?''

- ''যাকগে যাকগে যেতে দাও দিকিনি , দুদিনের জন্য বেড়িয়ে আর অত টেনচন করতে হবে না, জগন্নাথ দেব এর কৃপায় সব দেকবে ঠিকঠাক থাকবে !''

গিন্নি হাত জোড় করে মহা ভক্তি ভরে কপালে ঠেকালেন, দেখাদেখি কর্তাও ! তিন ছেলেমেয়ে আপাতত মা-বাবার সন্ধি স্থাপনে খানিকটা নিশ্চিন্ত হলো যেন ! পৌঁছে গেছে হাওড়া ,ট্যাক্সি থেকে সব একে একে নামানো হলো,বাক্স,প্যাঁটরা ,লটবহর,গোনাগুনি করে কুলির মাথায় চাপানোর আগে প্রচুর দরকষাকষি চলল ! অবশেষে একসময়ে জগন্নাথ এক্সপ্রেস স্টেশন ছেড়ে রওনা হলো ! গিন্নি জোড় হাত কপালে ঠেকিয়ে বললেন,

- ''দুগ্গা-দুগ্গা,কালি-কালি শিব-শিব !''

কর্তা বললেন,

- ''টিফিন কেরি ?''

ছোট ছেলে বলল

- '' আমি কিন্তু রাত্তিরে ওপরে ঘুমুবো বলে দিলুম ''!

ট্রেন ছুটছে, দাসবাবু কেমন যেন উশখুশ করছেন,একবার উঠে দরজার কাছে যাচ্ছেন, ফিরে আসছেন,বসছেন, উঠছেন , পাশে সহযাত্রীরা বিরক্ত হচ্ছেন,গিন্নি বললেন,

- ''এমন করছ কেন? একটু স্থির হয়ে বোসো দিকিন!''.....

দাসবাবুর দোনামোনা সুরে জবাব,

- ''না ,আসলে মনেহচ্ছে, শেষ বার বেরোনোর সময়ে আমি সদর দরজায় তালা লাগাতে ভুলে গেছি''....

- ''সেকি কথা?এইত,দরজার চাবির গোছা আমার বাগে আছে ''...

- ।না''না ,চাবি তোমার হাতে দিয়েছি সে আমার মনে আছে কিন্তু দরজায় তালা লাগাতে ভুলে গেছি ,পরিস্কার মনে পড়ছে''........

- ''তপনকে একবার ফোন করে দেখো,সাইকেল নিয়ে ছুট্টে গিয়ে দেখে এসে ফোন করতে বলো''......

তাই করলেন দাসবাবু, ফোন সুইচড অফ্ ! ...

- ।''ঠাকুরপো কে করো !” …..

- ’’ফোন তুলছেনা,বোধহয় বাড়িতে ফোনটা ফেলে রেখে গেছে!’’………………………..!!’

- ’নাঃ নাঃ ! আর এগিয়ে যাওয়া ঠিক হবেনা,চলো সব নেমে পড়ি,বাড়ি ফিরি ,এরপর যেখানে ট্রেন থামবে নেমে পড়ব’’….

ট্রেন থামলে সপরিবারে নেমে আবার হাওড়ামুখী লোকাল ট্রেনে চেপে হাওড়া । ছেলেমেয়েরা কাঁদো-কাঁদো,এবছরের পুরী যাওয়া মাঠে মারা গেল,গিন্নী রেগে আগুন,সারাপথ স্পিকটি নট । বাড়ির দরজায় ট্যাক্সি এসে থামল,কর্তা ট্যাক্সির ভাড়া মেটাচ্ছেন, বড় ছেলে দৌড়ে গিয়ে ফিরে এল…

- ’’ওমা ! ওবাবা !! দরজায় তো ডবল তালা দেওয়াই আছে !’’

গিন্নী ঝাঁঝঁ করে উঠলেন,

- ’’তখুনি আমি বলেছিলুম !’’………

’’কর্তার মৃদু প্রতিবাদ,

- ’’তুমি অমনি বলেছিলে?’’…………..

গিন্নীর রাগত জবাব,

- ’’ওসব ছেড়ে এখন গুনে গুনে মালপত্তর নামাও দিকিন’’!

- ট্যাক্সিড্রাইভারকে ডিকি খুলতে বলতে গিয়ে দাসবাবুর মনে পড়ল ডিকিতে চারটে সুটকেস তোলাই হয়নি,সেগুলো ট্রেনে সিটের তলাতেই রয়ে গেছে ! মেয়ে বড় সাধের লুচি আলুরদম ভরা ‘’টিফিনকেরি’’হাতে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে !

৪ ডিসে, ২০১৩

ছোটগল্প - সঞ্জয় চ্যাটার্জ্জী

0 কমেন্টস্
সবার উপর মানুষ সত্য
সঞ্জয় চ্যাটার্জ্জী


জানিনা কখন নিদ্রাচ্ছন্ন হয়েছিলাম। অকস্মাৎ এক আবেগ স্পর্শ অনুভূত হল মননে, কোনো এক রমনীয় ছলাকলায় উদ্বেলিত শিরা ধমনীতে পেলাম আকর্ষণ। এ কোন চেতনা ধাবিত হয় আমার অঙ্গে অঙ্গে? ঘুম ভেঙ্গে গেল নিদারুণ উত্তেজনায় !

চোখ মেলে দেখি কোথাও নেই তো কিছুই আমি ছাড়া ! অন্ধকারে একলা ঘরে সেই তো বিছানায় আমি একাই ! তবে কি কেবল স্বপ্ন দোষেই আক্রান্ত ছিলাম নিদ্রায়? হয়তো তাই ! খোলা জানালায় একফালি চাঁদ উঁকি দিয়ে যেন মুচকি হাসে। ঝিরি ঝিরি বাতাস বয়ে আনছে কোনো ফুলের বাস, দূরে কোথাও এফ এম রেডিওতে বাজছে কোনো স্বর্ণ গান, নিস্তব্ধ প্রকৃতি যেন আমায় দেখে খিলখিলায় ! কেন জানিনা এ রাত্রি আমায় সর্পিল এক আবেগ মাখায় ! আবার ঘুম আসে...নিজের মনেই মুচকি হেসে সব ঝুট বলে চোখ বন্ধ করি।

জানিনা কতক্ষণ ঘুমিয়েছি, ঘুম ভেঙ্গে গেল এক নারী কন্ঠে। কে যেন বলছে ডেকে, "কেমন আছ !" চোখ মেলে চাইলাম, আবার সেই শূণ্যতা ~ বিছানা, আমি, অন্ধকার, আর সেই খোলা জানালা। এখন আকাশে চাঁদ নেই, ঢেকে গেছে কোনো বারিদ পিছে; হাওয়াও এখন তাল মিলিয়ে আনছে না বয়ে সুরভি। কেমন যেন গুমোট মার্কা বিশ্রী এক প্রকৃতি ! নিরানন্দ, ঘোর নিরানন্দ ! মন ছেয়ে যায় বিষন্নতায়, কে ডাকলো তবে? উঠে পরলাম বিছানা ছেড়ে, জ্বলন্ত সিগারেট আঙ্গুলে জড়িয়ে জানালা ভরিয়ে দিলাম ধোঁয়ায়। কিন্তু সেটা বাষ্প হয়ে মিলিয়ে যাওয়ার আগেই আবার সেই রমনীয় কন্ঠস্বর ! "কেমন আছ?" সচকিত হয়ে ঘুরে দাঁড়ালাম, অন্ধকার, প্রবল অন্ধকার ! কম্পিত কলেবর হতে ভাঙ্গা ধ্বনি নির্গত হল, "কে? কে ওখানে?" দরজার কাছে অনুভূত হল আবছা কোনো নারী মূর্তি ! হিম হয়ে এলো দেহ, একি ! কে এ !! "ভয় পাচ্ছ?" "ভয় কিসের?" "আমি তো মানুষ নই !" "তবে শঙ্কা কেন মনে?" "শান্ত হও। কোনো ক্ষতি করব না তোমার। ক্ষতি তো মানুষে করে, আমরা তো কেবল নিরাকার হয়ে ঘুরে বেড়াই।"

ততক্ষণে ভয়ে সিঁধিয়ে গেছি, হাতের সিগারেট কখন জ্বলে নিভে গেছে, আমতা স্বরে বললাম, " ক-কে তুমি?" সে বলল, " তোমারই মত মানুষের পৈশাচিক শিকার আমি। আমি দামিনী। একদিন আমিও মানুষ ছিলাম। হেসে খেলে ঘুরে বেড়াতাম তোমাদের সমাজে। আমারও একটি পরিবার ছিল, একটি ছোট ভাই ছিল, এক বিধবা মা ছিল। তোমারই মত আমার এক সাথীও ছিল। আজ শুধু ছিলটাই আছে, আমি আর নেই !"

"কী হয়েছিল তোমার?" জানিনা আমার অস্পষ্ট ভাষণ সে শুনতে পেল কিনা ! একটা নীরবতা, এক তিমির অন্ধকার, তারপরে সে বলল, "পাড়ায় ছিল কুখ্যাত কিছু কালো হাত, পথে ঘাটে চলতে গেলেই উড়ে আসতো তাদের শ্লেষাক্ত বাণী। একদিন এক রাত্রে ফিরছিলাম কলেজ শেষে, আমি ও আমার সাথী। মদ্যপ কুচক্রীরা জানতাম না থাকবে সেদিন ওঁত পেতে, জানতাম না তাদের লালসার শিকার হতে হবে সেদিন আমাকে ! জানতাম না সাত আট জনের পৈশাচিক অঙ্গ আমায় করবে এফোঁড় ওফোঁড় ! জানতাম না নগ্ন হতে হবে আমায় সেদিন কতগুলো নোংরা চোখের সামনে ! হাজার ক্রন্দন, কাকুতি, মিনতিও সেদিন করতে পারে নি তাদের ক্ষান্ত ! সঙ্গীর আমার মুণ্ডহীন দেহ রইলো পরে রাস্তার 'পরে। যখন তাদের পৈশাচিক তাণ্ডব চলছে আমায় ঘিরে, দেখেছিলাম চেয়ে খেলছে তারা মুণ্ড নিয়ে ফুটবল খেলা ! অকস্মাৎ আঁধার ঘনিয়ে এলো আমার চোখের তারায়, দুহাত জুড়ে মিনতি করেছি, ওগো তোমরা এবার ছেড়ে দাও ! অট্টহাস্যে উঠলো চেঁচিয়ে সেই পিশাচের দল, "তোকে ছেড়ে দেবো আমরা ভেবেছিস কি করে. তোর ভবলীলা সাঙ্গ করে তবেই আমাদের শান্তি !" অকস্মাৎ কঁকিয়ে উঠেছিলাম এক তীব্র যন্ত্রণায়, দেখি চেয়ে ফিনকি দিয়ে ছুটছে শোনিত আমার অঙ্গ চিরে ! কোনো এক লৌহ শলাকা ঢুকছে তার মধ্যে ! অবশেষে নির্বাপিত হল আমার জীবনদীপ, শেষবারের মত মাকে আমার ডেকেছিলাম সেদিন আমি, জানিনা সে বাণী পৌঁছালো কিনা আমার মায়ের কানে !"

ভয় ভীতি দূর হয়ে গেছিল নিজেরই অজান্তে, সেই অশরীরীর নীরব যন্ত্রণা মুহুর্মুহু আঘাত হানছিল আমার বুকে ! তার কান্নায় ধ্বনিত হচ্ছিল "এর বিহিত করো ! বিচার করো এর !" ধীরে ধীরে ভোরের আলো ঘরের মেঝেতে এসে পড়ল, কখন রাত কেটে ভোর হয়ে গেল জানতেও পারি নি। চোখ উঠিয়ে দেখি ঘর শূণ্য, বললাম "আছ?" "দামিনী?" কোনো সাড়া নেই, জানিনা কখন সে চলে গেছে ! মনে পড়ল সেই কথাটা, "সবার উপর মানুষ সত্য, তাহার উপর নাই !"

ছোটগল্প - অভিলাষা

0 কমেন্টস্
অমলাদিদি ও অমলতাস
অভিলাষা


আজ অনেকদিন পরে পুরানো অ্যালবাম খুলতেই ঘিরে ধরলো ন্যাপথালিনের গন্ধ। সাথে ভুলে যাওয়া দিন, হারিয়ে ফেলা মানুষের স্মৃতি যেন ঝাপিয়ে পড়ল। সাথে মন কেমন করা একটা আদরমাখা ডাক “ভাইটু, ও ভাইটু”। অমলাদিদি, আমার ভাইফোঁটা,রাখী, আমার ঘুড়ি লাটাই,মার্বেল গুলি,গরমের ছুটীর কুলফি মালাই, কাসুন্দী সর্ষেরতেল লঙ্কা দিয়ে কাঁচা আমমাখা, শীতের নতুন ডিজাইনের সোয়েটার, ছাদের পিকনিক,কুলের আচার । মায়ের মার, ঠাকুমার বকা, বাবার কানমলা থেকে বাঁচার ঢাল, সব আবদার রাখার আপনজন, আমাদের পাশের বাড়ীর অমলাদিদি।

আমি তখন ক্লাস থ্রি সবে, অমলাদিদি শাড়ী পরে মেয়েদের হাইস্কুলে যায়। বাড়ী থেকে জোর করে বিয়ে দিয়েছিল সম্বন্ধ করে,ব্যবসায়ী ঘর, বড়লোক শ্বশুরবাড়ী।দিদি আর আমি দুজনেই খুব কেঁদেছিলাম। পরে কানাঘুষোয় জেনেছিলাম অমলাদিদি নাকি কোন এক “বজ্জাত বেজাত ছেলের” খপ্পরে পড়েছে। তাড়াতাড়ি বিয়ে না দিলে বাড়ীর লোকের মুখে চুনকালি মাখাবে। তখন মানে বুঝিনি।মানে বুঝেছি আরো খনিকটা বড় হয়ে। এর মধ্যেই জানা হয়ে গেছে ওর বরটি নাকি স্কিজোফ্রেনিক,বছর পাঁচেক মারধোর, লাঞ্ছনা-গঞ্জনা, অপবাদ, আকথা- কুকথা, অনেক কিছু সয়েও মানাতে না পেরে ঘর পালিয়ে দিদি আমার ঘর পেতেছে সেই পুরানো মনের মানুষটির সাথে।বাড়ীর কেউ তাই খোঁজ রাখেনা, নামটাও নেয় না আর।খালি আমার ভালোমানুষ মা নিশিকালীমন্দিরে পূজো দিতে গেলে সবার চোখ কান এড়িয়ে অমলাদিদির খোঁজখবর নিতে যায়।এমনকি, ঠাকুমা বা অমলাদিদির মা সইপিসি জানতে পারলে বকবে ভেবেই বুঝি আমাকেও সাথে নেয় না।অথচ আমি তো জানি মন্দিরপাড়ার বন্ধ গলির শেষ বাড়ীতে অমলাদিদির কবুতরী সংসার। আজ হঠাৎই দিদির জন্য মনটা কেমন করে ওঠায় লুকিয়ে দেখতে গেলাম, দূর থেকেই নজরে এলো, উদাস চোখে আটপৌরে হলুদ শাড়ীর আঁচলে পরিপাটি দিদি আমার আনমনে আকাশের দিকে চেয়ে ছাদে দাঁড়ানো। মনে পড়ে গেল হলুদ শাড়ী,হলুদ ফুল,হলুদ আবির, আসলে হলুদ রংটাই বড় প্রিয় ওর।হাওয়ায় চুল গুলো মুখে ঠোঁটে বিরক্ত করছিল, একটা গাছের আড়ালে মেঘ চোখে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি, মনে হচ্ছিলো একছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরি আগের মতন , সঙ্কোচে পারি নি।

তারাশংকর অমলতাস গাছের কথা লিখেছেন । অমলাদিদি বলেছিল, অমলতাস এক ফুলগাছের নাম, হলুদ গুচ্ছ ফুলের গাছ ।আজ হলুদ শাড়ীপরা আকাশের দিকে তাকানো অমলাদিদির গোধূলীর আলো রাঙানো সুখী মুখ দেখে কেন জানিনা সেই অমলতাসের কথাই মনে হল, মনে হল আমার অমলাদিদিও এখন সেই অমলতাসের মত জীবনের লাবণ্যে ভরপুর হয়ে শ্বাস নিচ্ছে,বাঁচছে,ভালো আছে।আমাদের বাড়ীর সামনে অমলাদিদির নামে একটা অমলতাসের চারা পুঁতেছি।ঠিক করেছি, প্রথম যেদিন ফুল আসবে সেইদিন হলুদ গুচ্ছফুলের তোড়া নিয়েই দিদির বাড়ী যাবো।

ছোটগল্প - শ্রীশুভ্র

0 কমেন্টস্
ডায়েরীর শেষ পাতা
শ্রীশুভ্র


এ পথ দিয়ে তো প্রায়ই যাই. কিন্তু এতদিন খেয়াল করিনি. আশ্চর্য্য! একে বারেই সামনা সামনি. অথচ এমন সুন্দর একটি দৃষ্টিনন্দন দোতলা বাড়ি আগে কোনোদিন চোখেই পড়েনি. আমার অফিস থেকে ফেরার পথে মাঝেমধ্যেই এই শর্টকার্ট রাস্তাটা ধরি. রাস্তাটা ঠিক ঐ সুন্দর বাড়িটার সামনে এসেই পুরো ডানদিকে বেঁকে গিয়েছে. বাঁকের ঠিক মুখেই সেদিন হঠাৎ খেয়াল হল! খেয়াল হল, সুন্দর আর্কিটেকচারের ঘন পদ্মরঙের একটি দোতালা বাড়ি, আর অবিস্মরণীয় গভীর কালো দুটি চোখ! দোতলার ঝুল বারান্দায় সোনালী পাড়ের ঘন কালো রঙের শাড়িতে দীর্ঘাঙ্গী তন্বী একহারার একটি মেয়ে সোজা আমারই দিকে তাকিয়ে! স্থির নিষ্পলক অন্তরভেদী অনন্ত দৃষ্টি!

সেই অনন্ত গভীর কালো দুটি চোখের সম্মোহনী দৃষ্টির ছোঁয়া নিয়েই বাড়ি ফিরতে হল সেদিন. সেদিনের সন্ধ্যাটি আর অন্য কিছুতেই মনোনিবেশ করা গেল না. কেবলই ঐ অপরূপ দুটি চোখ আমার মনোরাজ্য অধিকার করে বসল.পরের দিন কি একটা ঘোরের মধ্যে দিন শুরু হল. জানি না আর সুযোগ ঘটবে কিনা, ঐ দৃষ্টির মুখোমুখি হওয়ার. সারাদিন কেবলই একটা অজানা আশঙ্কায় পেয়ে বসল, যদি আর না দেখা হয়! হাসিও পেল অচেনা অজানা সম্পূর্ণ অপরিচিত কাউকে নিয়ে এতটা ভাবনা চিন্তা করার জন্যে. আসলে সম্পূর্ণ নিস্তরঙ্গ ব্যাচেলার লাইফ. এ শহরে নতুন বদলি হয়ে এসেছি সদ্য. আলাপ পরিচয় যৎসামান্য. সারাদিন অফিস আর বাসা. এরই মধ্যে হঠাৎ গতকালের এই ঘটনা.

অফিস ফেরত যথারীতি শর্টকাট রাস্তায় পা বাড়ালাম, মনের মধ্যে আশঙ্কা নিয়েই. কিন্তু কি আশ্চর্য্য! সেই একই গভীর দৃষ্টি মেলে দোতলার ঝুলবারান্দায় আমার গতকালের সেই স্বপনচারিনী! এবং আমাকে আরও অবাক করে দিয়ে তার দৃষ্টি আমাকেই অনুসরণ করে গেল গোটা পথটা. অথচ সৌজন্যবশতঃ আমার সহাস্য দৃষ্টিবিনিময়ের কোনো প্রত্যুত্তর এল না দোতলার ঝুলবারান্দা থেকে. একটু অপ্রতিভ হয়েই বাকি পথটা পেড়িয়ে এলাম মনের মধ্যে একরাশ বিস্ময়ের বোঝা নিয়ে. আজ যেন মনে হল, ঐ দৃষ্টির মধ্যে কোনো প্রাণের স্পন্দন নেই! নেই কোনো স্বপ্নের চলাচল! পার্থিব বাস্তবতার উর্দ্ধে ধ্যানমগ্ন, কোনো আকাশভ্রষ্ট স্বপ্নপরীর অতলান্ত নির্বাক নিরবধি অনন্ত দৃষ্টি শুধু.

এরপর বেশ কিছুদিন কেটে গেছে. কেটে গেছে প্রথম কয়েকটা দিনের সেই ঘোরও. কারণ আমার ফেরার পথে রোজই সেই একই দুটি চোখের অনিমেষ দৃষ্টির নিস্পন্দন অনুসরণ ছাড়া অন্যতর কোনো রকম কোনো ঘটনা ঘটেনি. গড়ে ওঠেনি রোজকার দেখা হওয়া স্বাভাবিক পরিচিত দৃষ্টিবিনিময়ের সৌজন্য সম্পর্ক! প্রথম দিকে কিছুটা অবাক হলেও ভেবেছি বড়োলোক বাড়ির সুন্দরী মেয়ের অহংবোধ ছাড়া আর কিছু নয়. আমি সামান্য সরকারী চাকুরে! হাঁটা পথে বাড়ি ফিরি. এটাই স্বাভাবিক. কিন্তু তবু সেই দুটি চোখের অমোঘ টান এড়াতেও পারিনি. পারিনি বলেই, মাঝে মধ্যে বাড়ি ফেরার শর্টকাট রাস্তাটি আমার নিত্যদিনের ফিরতি পথ হয়ে উঠল. তবু সেই গভীর দৃষ্টির নীরবতায় আনন্দের সুর-লহরি বেজে উঠল না.

রোজই একটা আশঙ্কা থাকে, আজও কি সে ঝুলবারান্দায় দাঁড়াবে! আজও কি তার সেই দীঘল কালো চোখের নিথর দৃষ্টি অনুসরণ করবে আমার গোটা পথ. দেখে যেন মনে হয়, সেও যেন ঐ ঝুলবারান্দারই অংশ. ঐভাবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই কেটে যায় তার সারাটাদিন, পথচারীর পথচলা দেখে দেখে. আবার ভাবি আমিও কেমন বেহায়া! কেমন কাঙালের মতো এই পথ ধরে ফিরি. অথচ সেই নিস্পন্দন দৃষ্টিতে নেই কোনো সাড়া! এসব ভাবতে ভাবতেই পথটুকু পেড়িয়ে যাই. কিন্তু সেদিন কি হল, হটাৎই হোঁচট খেয়ে সামান্য টাল খেয়ে গেলাম. আর টাল সামলিয়ে উঠতেই দেখি ঝুলবারান্দা দিয়ে হাসি গড়িয়ে পড়ছে ঝর্ণার মতো! হাসি যে এমন অপরূপ হতে পারে, এত স্নিগ্ধ এত অনুপম আমার জানা ছিল না সত্যি!

বেশ কিছুদিন কেটে গেছে এরপর. মাঝের এই কয়টি দিন আমাদের দেখা সাক্ষাৎ আর পাঁচজনের মতোই স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল. সে দেখায় প্রাণের স্পন্দন ফুটে উঠত রোজকার দেখাসাক্ষাতের স্বাভাবিক পরিচিত ভঙ্গিমাতেই. সেই অতলান্ত গভীর দৃষ্টির সাথে শুধু যোগ হয়েছিল অমন সুমধুর হাসির নীরব ঝর্ণাধারা. কিন্তু আলাপ হয়নি আমাদের তখনো. আলাপ চলত দুজনের মনোবীণায় পরস্পরের কল্পনায়. সত্যি বলতে কি দিনটা যে কোথা দিয়ে কেটে যেতো বোঝা যেত না. সারাদিনের কাজকর্মে ধরা দিল সুন্দর একটা ছন্দ. শেষ বিকেলের আলোয় আমাদের সেই পরস্পরকে দেখার মধ্যে গড়ে উঠেছিল ভালোলাগার অনুরণন. তাকে ভালোবাসা বলা না গেলেও অপেক্ষা ছিল একান্ত, সুদূরের কল্পনাপ্রবণ আলপনায়.

সেদিও এ পথেই ফিরছিলাম. কিন্তু কি আশ্চর্য্য ঝুলবারান্দা খালি! কি হল? এরকম তো হয় না! ভালো করে এধার ওধার তাকিয়েও কোনো সুরাহা হল না. কিছুটা দুশ্চিন্তা নিয়েই ফেরার পথে পা বাড়ালাম. কিন্তু থামতে হল মোড় ঘোরার আগেই. বাড়ির লোহার গেট ঠেলে এক সৌম্য সুদর্শন ভদ্রলোক বেড়িয়ে এলেন. নিজের পরিচয় দিয়ে আমন্ত্রণ জানালেন একবার ওনাদের আতিথ্য নিতে. বিশেষ করে ওনার মায়ের নাকি আমার সাথে আলাপ করার খুব ইচ্ছে. বেশ বিস্মিত হলেও মনের উচ্ছ্বাস গোপন করে অন্য একদিন আশার আশ্বাস দিয়েই সেদিন বাড়ি ফিরলাম. ঠিকই, সেদিন সারারাত জেগেই কেটে গেল. সম্ভব অসম্ভব সব মধুর কল্পনার ডানায় ভর দিয়ে কেটে গেল একটা রাত. ঐ চোখ ঐ হাসি ছেয়ে রইল সারা মন.

দিনকয়েক বাদে ফিরতি পথে একদিন সত্যি সত্যিই ওনাদের বাড়ি গিয়ে হাজির হলাম. খুবই অমায়িক সদালাপী ভদ্রলোক. এবং শৌখিন! গোটা বাড়ি জুড়েই আভিজাত্যের ছাপ.পরিচয় হলো ওনার মায়ের সাথেও. বৈধব্যের মাঝেও রূপের ঐশ্বর্য্যের স্বকীয় দ্যূতি ব্যক্তিত্বের সৌন্দর্যকে যেন আলোকিত করে রেখেছে. কিন্তু আমি অধীর হয়ে যার কথা ভাবছিলাম তার তখনো দেখা নেই. আর ঠিক তখনোই ঘরে ঢুকলো সে. হালকা নীল শাড়িতে সেই আকাশভ্রষ্ট পরী! সেই দুটি অপরূপ চোখ আর অতলান্ত দৃষ্টির নিমগ্ন অভিসার. এত কাছ থেকে এই প্রথম দেখা. সে তো এক অনির্বচনীয় অভিজ্ঞতা.আর সেই সহাস্য মিষ্টি স্নিগ্ধতা. সব মিলিয়ে স্বর্গের নন্দনকাননে হঠাৎ একটি সন্ধ্যা. অনুপম সত্যিই অনুপম!

কথাবার্তা যা হল সব ওর দাদা আর মায়ের সাথে. ওর দিক থেকে এক আশ্চর্য্য নীরব মাধুর্য্যের আকর্ষণ ঘিরে রাখল আমাকে আগাগোড়া. আমার নিজের পরিচয় দিলাম. প্রায় সব কথাই, কথা প্রসঙ্গে উঠে আসায় বলতে হল. নিজের জীবনের নানান টুকরো সব বিষয়. একথা সেকথায় অনেকটাই সময় কেটে গেল.এবার ওঠার পালা. দেখলাম ওর মুখের রেখায় বিদায়বেলার বিষাদের রঙ. সেই প্রথম মনের মধ্যে খেলে গেল ভালোবাসার অনন্য অনুভবের নির্মল শিহরণ.ওনাদের অনুরোধে আবারো আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাসার পথ ধরলাম সেদিনের মতো. মনে হল যেন পেড়িয়ে এলাম অন্তহীন পথ. নিয়ে এলাম ওদের সাথে প্রথম আলাপের সখ্যতা.

তবু এই আনন্দধারার মাঝে একটাই দুঃখের ছোঁয়া রয়ে গেল, ওদের কাছে নিজের কত কথাই বলে এলাম, অথচ ওর সাথে সরাসরি কোনো কথাই হল না. জানা হল না, ঐ অতল দীঘির কাজল কালো দৃষ্টির গভীরে কি মণিমুক্ত রয়েছে. জানা হল না ওদের সম্বন্ধে কিছুই.পরেরদিন ফিরতি পথে আবার দোতলার বারান্দার সেই অপরুপ হাসির মাধুর্য্যে ঝলমল করে উঠল প্রাণমন. বেশ কদিন পর আবার একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে ওদের বাড়ি গিয়ে হাজির হলাম. ভদ্রলোক বাড়ি ছিলেন না, দেখা হল ওর মায়ের সাথে.সেদিন ওর সাথে আলাপ করার বাসনা নিয়েই যাওয়া. আমাদের কথার ফাঁকেই ঘর আলো করে সে ঢুকল. ওর মায়ের মতোই বনেদী একটা আভিজাত্যের ছাপ ওর হাঁটাচলায়. আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকালাম ওর দিকে.

আজ বাসন্তী রঙের শাড়িতে ওর ভুবনমোহিনী মৃদু হাসির সাথে সেই গভীর অনন্ত দৃষ্টি যেন আমারই প্রতীক্ষায় ছিল. ওর সাথে আলাপ শুরু করার জন্যে সে কথাই বল্লাম. দেখতে চাইলাম ওর প্রতিক্রিয়া. হয়ত ওর মায়ের সামনে নিজের রূপের প্রশংসায় ঈষৎ লজ্জিত হতেই পারে.কিন্তু অবাক হলাম, ওর মধ্যে কোনো ভাবান্তর না দেখে. সেই একই মৃদু হাসির আলোয় সুন্দর দুই চোখে আমায় দেখতে লাগল. অথচ মুখে কোনো কথা নেই. উত্তরের আশায় জানতে চাইলাম আজও নীরব হাসিতেই বিদায় জানাবে কিনা. কিন্তু তাতেও মুখ ফুটে বল্ল না কিছুই. শুধুই দেখতে লাগল আমায় দু চোখ ভরে. সারা মুখে একটা পরিতৃপ্তির মৃদু আভা ছড়িয়ে. কিছুটা অপ্রতিভ হলাম ওর এই নীরবতায়.

ওর দিক থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে ওর মায়ের দিকে তাকাতেই চমকে উঠলাম. ভদ্রমহিলার চোখেমুখে বিষাদের ছায়া যেন সমস্ত রক্ত শুষে নিয়েছে. নিজেকেই যেন অপরাধী মনে হল, আমার অজান্তে কোনো ব্যাথ্যা দিলাম কিনা কে জানে. ঠিক তখনই ওর দাদা ঢুকলেন. ভদ্রলোক খুবই তীক্ষ্ণধী. ঢুকতেই বুঝলেন সামথিং ইজ রং! এবং ওনার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে ঘরের পরিবেশটা হালকা করে নিলেন নিমিষেই. হালকা হলেও আমার মনের মধ্যে অজানা কোনো রহস্যের ভার চেপে বসল. হয়ত আমার মুখ দেখেই উনি বুঝতে পারলেন. বল্লেন -আসলে আপনার সাথে দেখা হওয়ার পরপরই আমরা লক্ষ্য করি, ইন ফ্যাক্ট মার-ই এটা প্রথম চোখে পড়ে যে, আমার বোনের মধ্যে ধীরে ধীরে একটি সামান্য পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে.

-পরিবর্তন?
আমি জিজ্ঞাসা করি.
-হ্যাঁ, পরিবর্তন. সেই ঘটনার পর থেকে এই প্রথম ওর মুখে হাসি. মাঝের এতগুলো দিন ওর মুখে আমরা হাসি দেখিনি.
-ঘটনা?
আমার বিস্ময়ের উত্তরে উনি বল্লেন, বছর চারেক আগে, কলেজ থেকে উত্তর ভারতে বেড়াতে গিয়ে কিছু দুর্বৃত্তের হাতে ধর্ষিত হতে হয় তাঁর বোনকে.
-সেকি!
আমি প্রায় আঁৎকে উঠে তাকাই ওর দিকে. এই রকম পাশবিক আক্রমণের স্বীকার হতে হয়েছে পরীর মত সুন্দর এই মেয়েকে. তখনো ওর মুখচোখে কোনো ভাবান্তর নেই. সেই একই রকম মৃদু হাসির নীরব ঝর্ণায় আলোকিত ওর সারা মুখ. যেন আমাদের কোনো কথাই ওর কানে গিয়ে পৌঁছায়নি.
ভদ্রলোক যেন আমার মনের কথা পড়ে ফেল্লেন তখনই, বল্লেন-
-না ভয় নেই, ও আমাদের কথা শুনছে না.

ভয় নয়, আরও বিস্মিত হয়ে তাকালাম ওর দিকে. সেই একই ভাবে স্বহাস্যে দেখে চলেছে আমাকে, অথচ আমাদের কোনো কথার দিকেই খেয়াল নেই ওর. আশ্চর্য্য! তখনো জানতাম না আমার আশ্চর্য্য হওয়ার আরও বাকি ছিল.বল্লেন

- প্রচণ্ড শক পেয়েছিল সেই ঘটনায়.
-সে তো খুবই স্বাভাবিক বলি আমি.

-আর সেই শকেই ওর স্নায়বিক বিকার দেখা যায়.

-সেও স্বাভাবিক. কিন্তু তারও তো এখন চিকিৎসা আছে ভালো. বল্লাম আমি.

-হ্যাঁ সে সবই করিয়েছি জানেন, দেশের সব বড় ডাক্তারদেরই দেখানো হয়ে গিয়েছে. কিন্তু কোনো উপকারই তো হল না.

-উপকার হল না? ওনার কথারই প্রতিধ্বনি করি আমি.

-না, কই আর হল, মাঝে এক বছর নিভান্সেও ছিল.

- -সেকি? সেখানে তো মেন্টাল পেশেন্টদের চিকিৎসা হয়!

-হ্যাঁ সেই তো, ডাক্তারি পরিভাষায় ওযে মেন্টাল পেশেন্ট এখনো! কিন্তু কোনো কিছুতেই কিছু হল না, অথচ চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখিনি জানেন! বোনটা সেই ঘটনার পর বদ্ধ উন্মাদ হয়ে গেল!

-উন্মাদ? আতঙ্কে শিউরে উঠি আমি! স্তম্ভিত হয়ে চেয়ে দেখি ঠিক সেই একই ভাবে মধুঝরা হাসি মুখে চেয়ে চেয়ে দেখে যাচ্ছে আমাকে, কোথাও কোনো ভাবান্তর নেই. আর ও মা যেন পাথরের মতো স্থবির হয়ে বসে আছেন বিষাদে ছেয়ে আছে তাঁর সারা মুখ.শুধু ধরা গলায় জানালেন আমার সাথে রোজ বিকেলে এই দেখা হওয়ার সময়টুকু মেয়ের মুখে হাসি ফোটে, গত চার বছরে এই প্রথম.ভদ্রলোক আমার হাতদুটো ধরে বল্লেন ওঁদের ধারণা, আমিই নাকি শেষ ভরসা! যদি ভালো হয়ে ওঠে ওঁর বোন.

ওনাদের সব কথা ঠিক মতো শোনার অবস্থা নয় তখন আমার, মনে পড়ে গেল ছোট বেলার কথা. মামাবাড়িতে মার খুড়তুতো বোন শেফালীমাসিকে দেখেছিলাম বদ্ধ উন্মাদ. আর আমার এই কয়দিনের সব আশা সব স্বপ্ন যাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে সেও কিনা সেই শেফালীমাসির মতোই বদ্ধ উন্মাদ? ওর এই মিষ্টিঝরা হাসি, পাগলের হাসি? ঐ সুগভীর চোখের অমন অতলান্ত দৃষ্টি, পাগলের দৃষ্টি? তার পিছনে কোনো মানসিক সুস্থতা নেই? আমার যেন পায়ের তলা থেকে মাটি সরতে থাকে. চুড়মাড় হয়ে ভেঙ্গে পড়া ধুলিসাৎ আশা মাড়িয়ে যখন বাড়ি ফিরলাম তখন আর আমি আমার মধ্যে নেই. সেই বীভৎস রাতের স্মৃতি নিয়েও আবারও ভোর হল, কিন্তু ততক্ষণে আমার যা সর্বনাশ ঘটার, ঘটে গিয়েছে.

এরপর আরও মাস দুয়েক কেটে গিয়েছিল, কিন্তু সেদিনের পর থেকে, আমি আর ঐ পথে বাড়ি ফিরতে পারিনি. মনের দূর্বিষহ কষ্ট সময়ের সাথে অনেকটাই কমে এলেও জীবনের অনেকখানি আশাভরসা যেন চিরদিনের জন্যেই হারিয়ে গিয়েছিল. বিকেল হলেই প্রচণ্ড একটা কষ্ট আমায় পেয়ে বসতো. প্রথম প্রথম বাড়ি ফেরার পথে পা যেন আপনা আপনিই রোজকার শর্টকাট পথে এগিয়ে যেত. কিন্তু সেদিন সন্ধ্যায় বড়বাজারে হঠাৎই ভদ্রলোকের সাথে একেবারে মুখোমুখি দেখা. আমার সারা শরীর যেন হিমশীতল শিহরণে কেঁপে উঠল. পাশ কাটিয়ে এড়িয়ে যাবারও কোনো উপায় নেই. উনিই এগিয়ে এসে প্রথমে কুশল সংবাদ নিলেন. বল্লেন, আপনি আর ওপথে যান না বলে আমার কিছুই বলার নেই. কিন্তু ও খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছে.

-অসুস্থ?
-হ্যাঁ সেদিনের পর থেকে রোজই বিকেলে হয়ত আপনার জন্যে অপেক্ষা করত.

সেই ঝুলবারান্দা আর সেই দুই দীঘল কালো চোখ! সব মনে পড়ে যেতে থাকল আবার.ভদ্রলোক আক্ষেপ করেই বল্লেন, কিন্তু আপনাকে আর দেখতে না পেয়েই ক্রমেই অস্থির হয়ে উঠছিল, আমরাও ঠিক সামলাতে পারছিলামও না. আশ্চর্য্যের বিষয় কি জানেন, আর একদিনও ওর মুখে হাসি দেখতে পাইনি আমরা.

-এখন? প্রশ্ন করি আমি.

এখন সারাদিন আর ওর ঘর থেকে বেরোয় না. সারাদিন গুম হয়ে বসে থাকে. কখনো নিরবে কাঁদে...

ওনার গলা ধরে আসে, আমার হাতদুটো ধরে মিনতি করার মতো করেই বল্লেন, আপনাকে শুধু অনুরোধ অন্তত একটিবার আসুন একদিন. জানি আপনাকে জোর করা শোভনীয় নয় আমার, তবু...যদি...

কিন্তু তারপরেও যাব যাব করেও আর যেতে পারিনি. শুধু মনে হত, ওর সেই দৃষ্টি, ওর সেই হাসি, ওর নীরবতা, কোনোটাই সুস্থ মনের পরিচয় তো নয়. মানসিক অসুস্থতারই একটা প্রকাশ. সেখানে আমি গিয়েই বা কি লাভ হবে? এত বড়ো বড়ো ডাক্তাররা যেখানে কিছুই করতে পারননি. বিশেষ করে নিভান্সের মতো ভারতবিখ্যাত প্রতিষ্ঠানে এক বছর থেকেও যেখানে ওর অসুস্থতা কাটেনি. সেখানে আমার ভূমিকা কত অকিঞ্চিৎকর. শুধু মনে পড়ত ওর সাথে সেই কটা দিনের অমলিন স্মৃতি. আর তাড়া করত একটা চাপা গুমরানো কান্না. অফিস আর বাসা, বাসা আর অফিস, আমার প্রতিটিদিন একটা অব্যক্ত কষ্টের মধ্যে কাটতে লাগল. একদিকে এই অস্থিরতা আর সবসময় একটা অশ্রুত চাপা কান্না যেন ঘিরে ধরল আমায়.

মাঝে কেটে গেছে আরও কিছুদিন. অন্তর্দন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত হয়ে আমারও শরীর মন খারাপ গেল কদিন. একটু সুস্থ হতেই রবিবার দেখে একদিন সত্যিই সরাসরি ওদের বাড়ি গিয়ে পৌঁছালাম. বাড়ির পরিচারিকা আমায় বসার ঘরে বসিয়ে ভিতরে গেল খবর দিতে. মনের মধ্যে উথালপাতাল. প্রথম আসার সেদিনের সাথে কত তফাৎ. সেসবই ভাবছিলাম. খেয়াল করিনি কখন ভদ্রলোক এসে দাঁড়িয়েছেন.চমক ভাঙ্গল ওনার কথায়,

-আপনি?

কিছুটা অপরাধীর মতোই বলতে যাই,

- শরীরটা কদিন ভালো যাচ্ছিলনা...
আমাকে মাঝ পথে থামিয়ে দিলেন হাতের ইশারায়. দেখলাম ওনার মাও এসে দাঁড়িয়েছেন ওনার পাশে. চমকে উঠলাম, এযে জীবন্ত মৃতদেহ! মহাকালের সমাধি থেকে সদ্য উঠে দাঁড়ানো! এ কি চেহারা হয়েছে ওনার?

আর তখনই ডুকরে কেঁদে উঠলেন ভদ্রমহিলা. ওনার কান্না ভেজা হাহাকারে জানতে পারলাম বেশ কিছুদিন আগেই আত্মহত্যা করেছে ওনার একমাত্র মেয়ে!

ভদ্রলোক শুধু বল্লেন, -বেঁচেছে!

অনেকক্ষণ আমি কোনো কথা বলতে পারিনি. শুধু ভাবছিলাম পাগল কি কখনো আত্মহত্যা করে! এও কি সম্ভব?
ডায়েরীর শেষ পাতায় এসে স্তম্ভিত হয়ে দর্পনের দিকে, মুখ তুলে তাকালাম.
বল্লাম, -সত্যিই আশ্চর্য রে!
দীর্ঘশ্বাস ফেলে দর্পন বল্ল -হ্যাঁ সত্যিই আশ্চর্য্যের.
বল্লাম, -তোর প্রফেশানটা খুব ইন্টারেস্টিং, গল্প লেখার প্লটের ছড়াছড়ি.
হেসে উঠল ও,-হ্যাঁ এক একটা জীবনের বিনিময়ে!
-কিন্তু সেরেও তো ওঠে অনেকে?
-ওঠে, তবে সবাই নয়!

"পাগল কি কখনো আত্মহত্যা করে! এও কি সম্ভব?"দর্পনকে বল্লাম এই কথাটাই মনের মধ্যে ঘুরছে শুধু.
-চল! বলে ওর চেম্বার থেকে আমায় নিয়ে বেড়িয়ে এল. এগোলাম আমরা সামনের দিকে. একটু এগিয়ে ডান হাতের লম্বা করিডর দিয়ে বেশ কিছুটা এগিয়ে বাঁহাতের শেষ রুমে ঢুকলাম আমরা. পেশেন্টদের জন্যে এই হাসপাতালের বন্দোবস্ত বেশ ভালোই শুনেছি. সেটাই চোখে দেখে তাক লেগে গেল. দর্পন বল্ল

- ভালো করে দেখে নে.
খুবই সুদর্শন সন্দেহ নাই. তবু উদভ্রান্ত দুটি চোখ যেন কিছু একটা খুঁজে চলেছে. আমায় নতুন দেখে তড়াক করে লাফিয়ে উঠে এসে ব্যগ্র ভাবে জিজ্ঞাসা করল,
- "আচ্ছা বলতে পারেন, পাগল কি কখনো আত্মহত্যা করে? এও কি সম্ভব!"

২৯ অক্টো, ২০১৩

ছোটগল্প - অভিলাষা দাশগুপ্ত আদক

0 কমেন্টস্
অন্য অপু-দূর্গা
অভিলাষা দাশগুপ্ত আদক


ভাইফোঁটার দিন জন্ম বলে চাটুজ্জেবাবুর মেয়ে শিউলি (মানে দুগ্গা) ওর ছোটভাই শরতকে (মানে অপুকে) নাম ধরে না ডেকে ‘ভাই’ বলে ডাকত। তাই থেকে অপুকে পাড়ায় অনেকেই ভাই বা ভাইদা বলে। গোড়ার দিকে অপুর অভিমান হত, ভাবত ওর দিদি বুঝি ওর নামটাই জানে না কিন্তু এখন এই ক্লাশ ফাইভে উঠে বোঝে ওটা দিদির আদরের ডাক।অপুর আবার দিদি অন্ত প্রাণ,পিঠোপিঠি কিনা, যত ভাব তত ঝগড়া।তবু দিদিকে বড্ড ভালবাসে অপু।এই যেমন এবার পূজোর আগে তাল ধরেছিল অপু, ওর একটা লাল টুকটুকে রেসিং সাইকেল চাই,তার বদলে পূজোর জামাকাপড় হাতখরচা কিছ্ছু চাইনা। কিন্তু মায়ের কানের কাছে গুনগুন করলেও বাবাকে বলার সময় কিন্তু ‘দুগ্গা সহায়’।এমনিতে শান্তশিষ্ট ছেলেটার দু’টোই নেশা। এক সাইকেল, দুই ফুটবল। বিশেষত একসময়ের স্পোর্টং ইউনিয়ানের নিয়মিত স্ট্রাইকার গৌতম সাধুখাঁ ওদের স্কুলের গেমস টিচার হয়ে জয়েন করে একই পাড়ায় ঘরভাড়া করেছেন আর সকাল সন্ধ্যা পাড়ার বাচ্চাগুলোকে নিয়ে মাঠে নামছেন বলে নেশাটা আরো বেড়েছে।চাটুজ্জেবাবু ব্যাঙ্কে চাকরী করেন। স্ত্রী রমাদেবীও প্রাইমারী স্কুলটিচার। মেয়ের আবদারে ছেলেকে সাইকেল কিনে দিলেও শর্ত করিয়ে নিয়েছেন দুবেলা পড়তে বসতে হবে।

ভাইফোঁটার দিন সকালে বাগানের দূর্বাঘাসের ওপর থেকে চন্দন বাটবে বলে শিশির তুলতে তুলতে দুগ্গা দেখলো পাশের বাড়ীর পিন্টুকে ক্যারিয়ারে বসিয়ে গেট খুলে বেরোচ্ছে অপু।

- কোথায় যাস ভাই এত কালে?

- মাঠে রে দি’ভাই, স্যার বলেছেন আজ টিম সিলেক্ট হবে।

- আজ ভাইফোঁটা, না গেলে নয়? তোর জন্মদিনের নারায়ন পূজোও তো আছে।

- এই যাবো আর আসব। প্রমিস, আজ খেলবনা। দ্যাখ না তোর বানানো পূজোর নীল কাঁথাকাজের পাঞ্জাবীটা পড়েছি।এ পড়ে কেউ ফুটবল পেটায়? টিমে সিলেক্ট হলেই চলে আসব।

- তাড়াতাড়ি আসিস কিন্তু।

কে জানত এ যাওয়াই ছেলে দু’টোর শেষ যাওয়া।গলি থেকে বেরিয়ে খোলা রাস্তায় উঠতে না উঠতে একটা মালবোঝাই ডাম্পারের মুখোমুখি। কারোরই কিছু করার ছিল না।আইনি ঝামেলা মিটিয়ে মা দিদির বুকফাটা কান্নার মধ্য দিয়ে অপুকে যখন সবাই শেষযাত্রায় নিয়ে যাচ্ছে, তখন নারায়ণ পূজোর জন্য সাজানো ঠাকুরঘরে বিগ্রহের সামনে দুগ্গার সাজানো ভাইফোঁটার থালায় রাখা প্রদীপটা জ্বলতে জ্বলতে তেল ফুরিয়ে কালো হয়ে নিভে গেছে।

ছোটগল্প - হরি শংকর রায়

0 কমেন্টস্
অশ্রুজলে ভাসি
হরি শংকর রায়



মাঝ নদীতে নৌকাখানা আটকে গেল।
 
হ্যাঁ ! আমি তিস্তা নদীর কথা বলছি।
 
আজ সন্ধ্যায় যখন লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ থানার কাকিনা হয়ে চর ভেঙে-ভেঙে গংগাচড়ার মহিপুর ঘাটে আসছিলাম তখন অদূরে মাথার উপরে পূর্ণিমার চাঁদ জলের সাথে আপন মনে খেলছে।

আহা ! কী অপরূপ !

মাঝি বলল, নৌকা আটকে গেছে।
 
সত্যি বলছি, হিসাব মেলাতে পারছিলাম না।
 
আমার আত্মারাম খাঁচাছাড়া অবস্থা। এই হলো আমার হাঁটুজল ভাঙা সাধের তিস্তা নদী। ও নদী ! তুমি কাঁদো ! আমি অশ্রুজলে ভাসি।

৩ সেপ, ২০১৩

ছোটগল্প - ফারহানা খানম

0 কমেন্টস্


কথা দেয়া ছিল
ফারহানা খানম


সকাল সকাল এই দৃশ্যটা অকল্পনীয় আর অসহ্য ,অদিতি রাগ করবে না দেখবে ভেবে পেলো না অগত্যা চা এর কাপ হাতে দাঁড়িয়ে রইলো ।এসময় ভাইয়া এলো তিনিও নির্বাক ,কিছুক্ষণ পর সম্বিৎ ফিরে পেয়ে যা যা বলে চেঁচিয়ে উঠলেন । অদিতি বলল কি করলে ভাইয়া ? ইসশ পাখিটা ধরা যেতনা ? এসময় চোখ মুছতে মুছতে মিমিও এসে পড়েছে ,সে শুধু দেখলো ৪/৫টা সবুজ টিয়া উড়ে যাচ্ছে , তার বায়না ওটা চাই । এই হৈ চৈ এ পাশের বাড়ির দোতালায় মুকুল গান থামিয়ে ক্যামেরা নিয়ে ছবি তুলছে ...মুকুল চেঁচিয়ে বলল ভাইয়া আমি ছবি তুলেছি , এদিক থেকে অনিক বলল যাক তুমি দুর্লভ দৃশ্যটা ধরে রেখেছ তাহলে ? আমায় দিও ছবিটা ।

রোজ ভোরে নামাজ শেষ করে খালি পায়ে বাগানে হেঁটে হেঁটে অদিতি আর অনিক চা খায় , গাছগুলো দেখে পানি দেয় পরিচর্যা করে পুরনো ফুল তুলে নেয় ঘর সাজায় এ সময় পাশের বাড়ির মুকুলের বোন মৌ আসে , ওপাশের দোতালা বাড়ির শানু চার তালার মামুন তিন তলার রুপা এসে ফুল নিয়ে যায় ।, তারপর ওরা পড়তে যায় ।

বাগানটা ওদের দুই ভাইবোনের নিজের হাতে করা কোন মালী নেই ,অদিতি আর অনিক দুজনে দেশী -বিদেশী ফুলের গাছ লাগায় যত্ন করে আবার পরের মৌসুমে লাগাবে বলে বীজ রাখে যত্ন করে । শরতে শিউলি গাছটার নিচে যখন রাশি রাশি শিউলি পরে থাকে সবুজের বুকে শিশির জড়ানো শিউলি কি যে অপূর্ব দেখায়!কিংবা জ্যোৎস্না রাতে যখন চন্দ্রমল্লিকা বা হাসনাহেনা ফোটে কি সুন্দর যে দেখায় ফুলগুলো যেন এক একটা নক্ষত্র !

তা আজ যে ঘটনা অদের যুগপৎ অবাক আর রাগান্বিত করেছে তা হল বারান্দার ধারের যে বেড তাতে সূর্যমুখীর ১২ টা গাছ তাতে বিরাট বিরাট খয়েরী -হলুদ সূর্যমুখী ফুটে ছিল । ত সকালে নিয়ম মাফিক অদিতি চা এর কাপ নিয়ে বারান্দায় এসে দেখল ৩/৪ টা টিয়ে পাখি সূর্যমুখী ফুলের বুকে বসে ফুলের খয়েরী বীজ খুঁটে খাচ্ছে পাপড়িগুলো তছনছ হয়ে আছে , এ দৃশ্য অকল্পনীয় আবার নির্মম সুন্দর, অদিতির মনে হচ্ছিল যেন পাখিগুলো ওর বুকে ঠোকর দিচ্ছে! তখন ভাইয়াও এসে নির্বাক তাকিয়ে থাকে ।ঠিক এই সময় প্রতিদিন মুকুল বারান্দায় বসে রেওয়াজ করে সে প্রথম বারান্দায় এসেই এ দৃশ্য দেখতে পায় দৌড়ে গিয়ে মোবাইল নিয়ে এসে ঘর ছবি তুলতে তৈরি হয় আর একটা ছবি তুলতেই নিচে গোলমাল বেঁধে যায় । মিমি পাখির জন্যে কান্না জুড়ে দেয় ।

ধীরে ধীরে রঙ পাল্টাচ্ছে আকাশে নীল কমে গাড় হচ্ছে সাদা আর সোনালী আভা । কয়েকটা প্রজাপতি উড়ছে ফুলে ফুলে। সুন্দর ঝির ঝিরে হাওয়া । বেশ কিছু নতুন ফুল ফুটেছে অদিতি আর অনিক বাগানে নেমে গেল গাছের পরিচর্যা করতে হবে ফুল নিয়ে সাজাতে হবে । । অদিতি পড়ে ক্লাস টেনে অনিক ভার্সিটিতে পড়ছে ২য় বর্ষে ।অদিতি ফুল তুলতে থাকে মৌ কে কিছু ফুল দিল, সে নিজে কিছু গাঁদা ফুল নিয়ে উঠে পড়লো । মুকুল ওপর থেকে বলল আমার জন্যে কিন্তু ৩ টে গোলাপ দিও অদিতি ,৩ টি গোলাপ দিয়ে দিল তুলে । ফুটন্ত গোলাপগুলো পাপড়ি মেলে ফুটে আছে সেগুলো সে ধরল না , বাকী যে কটা আছে ধরলেই ঝরে যাবে । উঠে এল ওরা বাগান থেকে বেলা বাড়ছে ঝকঝকে রোদ কিন্তু বার বার মনে পড়ছে ক্ষতবিক্ষত ফুলগুলোর কথা ।

নাস্তার টেবিলে মা জিজ্ঞেস করেন কিরে সকালে কি নিয়ে এত গোলমাল হলরে ? মিমি মহা উৎসাহে ঘটনা বর্ণনা করে এও বলে তার একটা টিয়া পাখি আজই চাই , মিমি পড়ে ক্লাস সিক্স এ ।বাবা হেসে বলেন বেশ তো রুনু তুমি কাঁটাবন থেকে ভালো দেখে একটা পাখি কিনে দাও ওকে তবে হ্যাঁ মামনি পাখিটাকে কিন্তু তুমি কথা শেখাতে হবে ।মিমি বলে শেখাবো । সবাই হাসতে থাকে ।

অদিতি নিজের ঘরে এসে পড়তে বসে। মৌ আর অদিতি একই স্কুলে পড়ে একটু পড়েই ওরা স্কুলে যাবে এসময় মুকুল আসে এ বাড়িতে ওদের আর ওই বাড়িতে এদের অবাধ যাতায়াত । কেউ কিছু মনে করেনা ,মুকুল এসে বলে

---আমার গোলাপ কই?

----কেন সকালেই ত দিলাম মৌ এর হাতে ,

---কেন তুমি নিজে দিতে পারনি ? অদিতির সারা মনে অদ্ভুত এক আলোড়ন নিজেকে শান্ত রেখে বলে একই ত কথা আপনি ফুল চেয়েছেন আমি দিয়েছি ,

----এক কথা নয় কাল থেকে তুমি দেবে আমি নিচে নেমে হাত বাড়িয়ে নেব ।

অদিতি বলে বেশ দেব । মুকুল যায় অনিকের ঘরে একটা বই নিতে এসেছিল সে , তারপর মনে হল অদিতিকে একটু ঘাবড়ে দিই ,এমনি অদিতি খুব শান্ত মেয়ে ওর সাথে দুষ্টুমি করতে বেশ লাগে ।ও খুব শান্ত আর দেখতে শ্যামলা মিষ্টি । আর খুব ভিতু ।

অদিতি আর মৌ রেডি স্কুলে যাবে অনিক চলে গেছে ওর পরীক্ষা মা বলেন মুকুল আমার হাতে অনেক কাজ একটা রিক্সা ঠিক করে দাও ওদের দেখো রিক্সা ওয়ালা যেন বুড়ো আর ভাল হয় ,মুকুল হাসতে হাসতে বলে

----বুড়ো কি ওদের টানতে পারবে খালা ?এক এক জনের যে ওজন ।হেসে ফেলে মা বলেন

--- বাবা দুষ্টুমি রাখো দেরি হয়ে যাচ্ছে ওদের ।

ওরা বেড়িয়ে পড়ে । ওদের বাড়ির সামনে রাস্তার ধারে বড় পুকুর , এর ধার ঘেঁষে বড় বড় গাছ আর শান বাঁধানো ঘাটে সারাবেলা কেউ না কেউ গোসল করে ,কাপড় কাঁচে গল্প করে ,মোটের ওপর লোকের আনাগোনা থাকেই । গাছগুলো সুন্দর তুমুল হাওয়া দেয় পানিতে সাতার কাটে রাজ হাঁস আর হাঁস ।

পুকুর পাড়টা পেড়িয়ে একটা গলি ,ভাগ্য প্রসন্ন না হলে গলির মোড়ে না গিয়ে রিক্সা পাওয়া যায় না । ওরা গলিটা পার হওয়ার সময় দুটো বখাটে ছেলে কি যেন বলে ওদের লক্ষ্য করে মুকুল ভীষণ রেগে কিছু বলতে যায় লোকজন থামায় ওকে তবে সেও সাবধান করে দেয় কোনোদিন যেন এ পাড়ায় না দেখা যায় ওদের । এরপর মুকুল ওদের রিক্সা ঠিক করে দিয়ে সেও চলে যায় ভার্সিটিতে সে এবার প্রথম বর্ষের ছাত্র তার বিষয় গণিত ,ভীষণ রসকষহীন মনে হয় তার ।

ক্লাস শেষে বাসায় এসে মুকুল ভাবতে বসে অদিতিকে তার শুধু ভাল না বেশ ভালো লাগে কিন্তু কথাটা বলার সময় এখনো আসেনি সামনে ওর এস এস সি পরীক্ষা এসময় এই কথা বলে ওকে ভাবিয়ে তোলা ঠিক হবে না ,অথচ না বলতে পেরে সে ছটফট করে রাত দিন ।একটা ভয়ও কাজ করে যদি অদিতি ওকে না বলে ? না ওকে তেমন অপছন্দ করে বলে ত মনে হয়না।

অদিতি খুব সরল একটা মেয়ে ছোট থেকে ওকে দেখছে ,বই পড়া আর বাগান করা এই নিয়েই মেতে থাকে সারাক্ষণ । মুকুলের খুব অপছন্দ ওদের গানের মাষ্টার কে ,ওরা তিনজন মানে অদিতি মৌ আর মিমি যখন গান শিখতে বসে ,মুকুল খেয়াল করে দেখেছে মাষ্টার যেন অদিতির দিকে একটু বেশি মনোযোগ দেয় , আর বেছে বেছে প্রেমের গানগুলোই ওকে শেখাবে বড় রাগ হয় তার , এসময় মা খেতে ডাকেন ।

ফাগুনের এই দুপুরগুলো দুর্বিসহ! কি মন উদাস করে ...পুকুর পার থেকে আসা হাওয়া কি যেন বলতে চায় , বার্তা টা ঠিক ধরতে পারেনা মুকুল ,আমের মুকুলের গন্ধ অন্যরকম আবেশ ছড়ায় কাউকে খুব কাছে পেতে ইচ্ছে করে ,তখনই ভেসে উঠে অদিতির মুখটা । বাগানের দোলনায় নির্জন দুপুরে অদিতি যখন আনমনে দোল খায় আর গেয়ে ওঠে ' কত যে কথা ছিল ,কত যে ছিল গান...' মনে হয় ওর জন্যেই গানটা গাইছে ... অদিতির হাতে থাকে বই এলোমেলো চুল, কি অপরূপ যে লাগে ওকে দেখতে যেন ফুলপরী ।পথ ভুল করে থেকে গেছে যেতে পারেনি নিজের দেশে ... অদ্ভুত সুন্দর সে দৃশ্য ।

আচ্ছা অদিতি কি কিছুই বুঝতে পারেনা ওকে ? অদিতির জন্মদিনে মুকুল চুপি চুপি ওকে ছাদে ডেকে এনে গোলাপ আর প্রেমের গানের সি ডি উপহার দিল তবুও কি মেয়েটা বুঝল না ? না কি বুঝেও বুঝতে চায় না ?

লাল কৃষ্ণচূড়ার দিকে তাকিয়ে মুকুল ভাবে আর নয় কালই ওকে বলবে যদি অন্য কেউ এরই মধ্যে ওর জীবনে এসে পড়ে ।ওই গানের মাস্টারটা যদি এসে পড়ে ওদের মাঝে ? না দেরী করবে না মুকুল কিছুতেই না ।

কিছু দিন কেটে গেল নিজের নিয়মে দিন শেষে রাত নামলো বেশ কয়েকটি অমাবস্যা পূর্ণিমাও এলো গেলো কিন্তু অনিকের আর বলা হোল না। কি এক সঙ্কোচে । সে খুব ব্যস্ত এখন গানের প্রতি খুব ঝোঁক বেড়েছে আর সামনে পরীক্ষা ।

দিন কাট তে থাকে অদিতিও ব্যস্ত পড়ালেখায় সামনে পরীক্ষা মুকুলেরও ফার্স্ট ইয়ার ফাইনাল চলছে সেও ব্যস্ত , বাগানটার দায়িত্ব এখন অনিকের আর মিমির ।

অদিতির পরীক্ষা গান শেখা বাদ । পুরোদমে লেখাপড়া করছে রুটিন মেনে ।স্যার আসেন পড়িয়ে যান কোচিং যায় মায়ের সাথে মাঝে মাঝে মিমি আর ভাইয়ার সাথে খুনসুটি , মিমির টিয়াটা নিয়ে দুষ্টুমি , এভাবেই কাটছে তার সময় , পড়ার ফাঁকে ফাঁকে খুব মনে পড়ে মুকুলের কথা ও কি এত ব্যস্ত অর মনেও পড়েনা ওর কথা ? এখনো রোজ ভোরে অদিতি বাগানে হাঁটে তারপর পড়তে বসে আর মুকুল তখন রেওয়াজ করে বারান্দায় একবারও ত তাকায় না ওর দিকে , বুক চিরে কান্না আসে অভিমান হয় না আর ভাববে না সে মুকুলের কথা ।

আসলে মুকুল ঠিকই খেয়াল করে অদিতিকে কিন্তু মনে হয় অদিতি কেন নিজে থেকে একটা কথাও বলে না ? এত অহংকার কিসের ? আবার এও ঠিক মুকুল ভীষণ ব্যস্ত পরীক্ষা নিয়ে এর মধ্যে ঠিক প্র্যাক্টিক্যল পরীক্ষার আগে খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে ,অথচ বসে থাকলে চলবে না অ্যাসাইনমেন্ট তৈরি করতে হবে পেপারস রেডি করা অনেক কাজ এগিয়ে আসে বন্ধুরা সবচেয়ে বেশী সাহায্য করে অন্তরা ।

মাঝে মাঝে অদিতির মুখটা খুব বেশী মনে পড়ে , সেদিন ও এসেছিল বাগানের গোলাপ নিয়ে মুকুল কে দেখতে ,কিন্তু অভিমানে মুকুল কথা বলেনি কেন এত দেরীতে এল ও ? অদিতি মুখ ভার করে চলে এসেছে ওর চোখের কোনে কান্না জমেছিল । না ওকে কাল ক্ষমা চেয়ে নেবে ভাবলও সে । কিন্তু ব্যস্ততার কারণে মনেই থাকলো না সে কথা ।

সেদিন রাতে খুব সুন্দর জ্যোৎস্না ছিল ,বাগানে হাসনাহেনা ফুটেছে গন্ধে পাড়া মাতাল রাত তখন বারটা প্রায় মুকুল গাইছিল ' কাজলও নদীর জলে , ভরা ঢেউ উচ্ছল ছলে ...' এই গানটা, অদিতি নিজের অজান্তেই বাগানে এসে বসে , মনে হয় মুকুল ওর উদ্দেশেই গানটা গাইছে কাল যেভাবেই হোক সে জানাবে মুকুল কে তার ভালোবাসার কথা ।

মুকুল ভাবে অদিতি শুনতে পাচ্ছে ত ?

এসময় বাগানে আসে অনিক ও বলে তুই একটা গান কর নারে ? অদিতি গায় ''চাদের হাসি বাঁধ ভেঙ্গেছে ...' বাবা মাও এসে বসেন ওপরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে গান শোনে মুকুল মৌ আর খালা খালু ।

কি সুন্দর গাইল ও বুকটা কেমন করে উঠলো অনিকের না ওকে বলতেই হবে কাল 'ভালোবাসি ' ।

এদিকে ভয়াবহ রক দুঃসংবাদ অপেক্ষা করে আছে মুকুল জানত না জানলো দুদিন পর খাবার টেবিলে বাবা বললেন আমাকে রাজশাহী বদলী করা হয়েছে এ মাসেই যেতে হবে । সবাই খুব অবাক হয় অথচ করার কিছু নেই সরকারি চাকুরী বদলী করলে যেতেই হবে । মা বলেন মৌ এর জন্য ভাল স্কুল পাবো ত ? এই ক্লাস নাইনের বছরটা খুব জরুরী সময় । বাবা বলেন পাবে সরকারী স্কুলেই ওকে নিয়ে নেবে এটা নিয়ম ।এখন গোছগাছ করতে থাকো আমি আগে যাই তোমারা দুমাস পর এসো , সেভাবেই গোছগাছ চলতে থাকে ।মুকুল হলে সিট যোগার করে নেয় । দুমাস পর মৌ রা ঢাকা ছেড়ে চলে যায় । যাবার সময় খুব কান্নাকাটি করে সবাই ।

যাবার দুই দিন আগে অদিতির মাথায় হাত বুলিয়ে খালা বলেন ভালো করে পরীক্ষা দিশ , তুই যে আমার বউমা হবি ।

খালার কথাটা কানে বাজতে থাকে আনন্দ শিহরণ খেলে দেহ মনে । খালা আরও বলেন এত তাড়াতাড়ি বলতাম না কিন্তু বলার ত সময় পাবনা তাই বলা তোর মায়ের সাথে কথা হয়ে আছে তুই আমার ছেলের বউ হবি ,মুকুল ও জানে তোকেও বলে রাখলাম । তবে এও বলি তোর যদি এতে মত না থাকে বা মুকুলের যদি মত না থাকে আমরা জোর করবো না । মুকুলের খুব পছন্দ তোকে এখন তোর মত বল । সামনে মা আর খালা দুজনেই দাঁড়িয়ে ভীষণ লজ্জা করে অদিতির ,সে অস্ফুটে বলে আপনাদের মতই আমার মত সেদিন থেকেই সে ভাবতে শুরু করে ওর বিয়ে হয়ে গেছে মুকুল ওর স্বামী । মনে তখন আনন্দের বন্যা । চলে গেলেন খালারা। সব কেমন খালি খালি লাগছে মৌ নেই মুকুল নেই । দুপুর বেলায় মনটা কেমন বিষণ্ণ হয়ে যায় খুব কান্না পায় ।

খালারা যাওয়ার পর মুকুল হল থেকে মাঝে মাঝে আসে । আগে ২/১ দিনের ছুটি হলে এসে রাতে থেকে যেত ,সেই দিনগুলো খুব আনন্দের হত সারাদিনই হৈ চৈ গান । মা ভালমন্দ রান্না করতেন ,ইদানীং ও আসেনা বললেই চলে , ভাইয়ার সাথে দেখা হয় হয়ত কিন্তু ভাইয়ার কাছে জানতে চাইতে খুব লজ্জা করে অথচ কি কষ্ট যে হয় মনে মনে । অদিতির পরীক্ষা শেষ হাতে অফুরন্ত সময় । এখন মুকুলের দেখা নেই । একদিন হঠাৎ এল মুকুল কেমন যেন দূর দূর ভাব রাতে থাকতে খুব অনুরোধ করলো মা থাকলোনা সে ,এক সময় অদিত ও বলল আজ থাকলে কি এমন ক্ষতি হবে ? মুকুল বলল হবে পড়াশুনার খুব চাপ ।

মুকুলের মনে তখন তোলপাড় একদিকে অদিতি অন্য দিকে অন্তরা । ও অদিতিকে ভুলতে পারছেনা অন্তরাকেও অস্বীকার করা যাচ্ছে না বরং অন্তরার ছায়া গাড় হয়ে উঠছে ওর মনে । অন্তরা অদিতির চেয়ে অনেক বেশী পরিপক্ব , সাবলীল , ওর সাথে কথা বলতে ভালো লাগে অনেক স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে মুকুল, অনেক বিষয় নিয়েই যা অদিতির সাথে বলা যায় না ।

অদিতি এখনো ছেলে মানুষ । লজ্জাবতী লতার মত ছুঁয়ে দিলেই নেতিয়ে পরে, যা বলে মুকুল সেটাই মেনে নেয় ভালো বলে । নিজের মতামত দিতে পারেনা ।সিদ্ধান্ত নিতে শেখেনি । ও অবুঝ ।

অন্তরা তা নয় ও সিদ্ধান্ত দিতে ও নিতে জানে মুকুলকে অনেক বিষয়ে পরামর্শ দেয় সে ।

অদিতি কে কথা দেওয়া আছে এখন সে কি করবে ? ভেবে ভেবে রাতের ঘুম হারাম হয়েছে ওর ।

এখনো সে অন্তরাকে বলেনি অদিতির কথা আর অদিতিকে ত বলার প্রশ্নই আসেনা অন্তরার কথা বলার । আরো ভাবতে হবে তাকে ।

দিন দিন জায়গা করে নিচ্ছে মুকুলের অন্তরার সাথেই আজ কাল অনেকটা সময় কাটে ওর ।পড়াশুনা সব কিছুতেই অন্তরা তাকে খুব সাহায্য করে ।ওদের দুজনকে প্রায়ই একসাথে এখানে ওখানে বেড়াতে দেখা যায় । ব্যাপারটা অনিকের ও জানতে বাকী থাকে না ।কিন্তু এই মুহূর্তে সে অদিতিকে কাঁদাতে চায় না তাই ওকে কিছু বলবে না বলেই ঠিক করে ।

সেদিন একা ঘরে মুকুল মা কে প্রশ্ন করে

-----কেন কথা দিয়েছিলে মা? এখন যে আমার বোনটা কষ্ট পাবে বুঝতে পারছ ? সে সব খুলে বলে মাকে, মা চুপ হয়ে যান একদম ,ভাবেন এ কি করলাম আমরা ? মুকুল বলতে থাকে

--- ভাবলে না একবারও বড় হলে মানুষের ইচ্ছেও বদলে যেতে পারে ? ওদের নিজেদের ইচ্ছে অনিচ্ছা থাকতে পারে?

----মা বলেন ওদের ত সব জানিয়েছি । তাও মুকুল এমন করতে পারলো ?

-----অদিতি জানে কথা দেওয়া আছে ?

----কেন মা ওকে জানালে ? ও নিশ্চয় মুকুলকে অনেক স্বপ্ন দেখছে ,তুমি বুঝতে পারছ ওর এই বয়সে স্বপ্ন ভাঙ্গার কষ্ট কত তীব্র হবে ?

মা চুপ করে কাঁদতে থাকেন । এখন মুকুল কেউ ত দোষ দিয়ে কোন লাভ নেই এ হল মনের ব্যাপার । রাতে অদিতির বাবার সাথে এ নিয়ে কথা বলবেন ঠিক করেন ।তারপর সিদ্ধান্ত নেবেন ,অদিতিকে বোঝাতে হবে ,মন ভাল রাখতে হবে ।

সেদিন থেকে অনিক খুব মনোযোগী হয়ে ওঠে অদিতির প্রতি বাগানের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে নতুন উদ্যমে । কলেজে ভর্তির জন্য পড়তে বলে বেড়াতে নিয়ে যায় । অদিতি সব বুঝতে পারে সে এতদিনে জেনে গেছে কি হয়েছে ?অনেক আগেই আঁচ করেছিল এখন সন্দেহমুক্ত হয়েছে ।

মায়ের অনুরোধে নিজের মুখ রক্ষার খাতিরে এখনো মুকুল কে যেতে হয় ওই বাসায় , একদিন দুপুরে অদিতি যখন এলোচুলে বাগানে দোলনায় বসে বই পড়ছিল আসলে ও কিছুই পড়ছিল না বই হাতে নিয়ে ভাবছিল ... দুপুরের নির্জনতায় খুব মন খারাপ ছিল তার সে শুনছিল মৌমাছির গুনগুন দেখছিল প্রজাপতির উড়ে যাওয়া দুটো শালিক হাঁটছে শিউলি গাছের ছায়ায়। এসময় মুকুল এল গেট দিয়ে ঢুকতেই অদিতি ডাক দেয়,-এদিকে আসুন ও তাকে আপনিই বলে ,মুকুল অপরাধী মুখে থমকে দাঁড়ায় ...কাছে আসে অদিতি যায়গা করে দিয়ে

---বলে বসুন খুব সংকোচে ওর পাশে বসে মুকুল অথচ ছয় মাস আগেই এই সংকোচ ছিল না তার ।

একটু চুপ থেকে নিজেকে সামলে নেয় অদিতি তারপর বলে এত ভাবছেন কেন বলুন তো ? আপনার অন্য কাওকে ভাল লেগেছে লাগতেই পারে তার জন্য এত দ্বিধা কেন ? আপনি আমাকে বললেই তো মিটে যায় সব । আপনি মুক্ত আমি ত আপনাকে কোনদিন কথা দিই নি বলিনি ভালোবাসি তাহলে কিসের বন্ধন আপনার ? যাকে ভাল লেগেছে তার কাছে ফিরে যান ...বিস্ময়ে বিমুঢ় হয়ে মুকুল প্রশ্ন করে তুমি জানলে কি করে ?

---সেটা কোন দরকারি বিষয় নয় যা দরকারি ছিল বলেছি ।

---না তবুও বল কি করে জানলে ? আর তুমি কি করে এভাবে সমস্যার সমাধান করে দিলে তুমি জানোনা আমাদের বিয়ে ঠিক হয়ে আছে ।

----জানি সব জানি কিন্তু জোর করে পেতে চাইনা । কথা দিয়েছিলেন আমাদের দুজনের বাবা -মা তাই না । আজ আপনার একজন কে ভালো লেগেছে ,কাল আমার ক্ষেত্রেও এটা হতে পারে তাই এ কথা দেয়া নেয়ার মূল্য আর নেই ।

-----তুমি বড়দের মত করে ভাবতে শিখলে কবে অদিতি ?এভাবে দুই মিনিটে সমস্যার সমাধান করে দিলে তুমি কি করে? কষ্ট হল না তোমার ? আমি ভেবেছিলাম তুমি খুব কষ্ট পাবে এসব শুনলে ।

-----না হল না কষ্ট .. আর এসব কথা কি লুকিয়ে রাখা যায় ?.ভাবনার কথা বলছেন ? পরিস্থিতি আমাকে এভাবে ভাবিয়েছে ,আপনি যতটা অবুঝ ভাবেন আমি তত অবুঝ নই মুকুল । কারো বিরুদ্ধে আমার কোন অভিযোগ ও নেই আপনি ভেতরে যান মা আছেন ।

--- আচ্ছা এখন বল তুমি কি করে জানলে ?

-----বলতেই হবে ? তবে শুনুন সেদিন আপনি একটা খাতা ফেলে গিয়েছিলেন সেখানে লেখা ছিল আপনার এই ভাললাগার কথা । আর আপনার আচরণেই প্রকাশ পাচ্ছিল আপনার দ্বিধার কথা , ইদানীং খুব এড়িয়ে চলছিলেন আমাকে যাই হোক , খাতাটা আমি রেখে দিয়েছি নিয়ে যাবেন আজ ।আর খালা খালুকে বলবেন এই বিয়েতে আমার মত নেই।

----বেশ তাই হবে বলে উঠে যায় মুকুল আর অদিতি তখন কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে ...

বাগানে শিউলি গাছের ছায়ায় এতক্ষণ দুটো শালিক ছিল এখন একটা একা মনের সুখে ঘুরছে ।অদিতি ভাবে আজ থেকে আমিও ওর মতো একাই উড়বো মনের আকাশে ............

অনেক বছর পর অদিতি তখন ডাক্তারি পাশ করে চাকরী করছে এতদিনে মিমি কলেজে পড়ছে মৌ এর বিয়ে হয়েছে সে বিদেশে থাকে বরের সাথে । অদিতির দেখা হল মুকুলের সাথে এয়ারপোর্টে অদিতি ট্রেনিং এ যাচ্ছে ইংল্যান্ড আর মুকুল যাচ্ছে অফিসের কাজে সে বেশীর ভাগ সময় ওই দেশেই থাকে ইমিগ্রেশন পার হয়ে এসে ওরা থমকে দাঁড়ায় ,মুকুলের চুলগুলো সাদা , চালচলনে বেশ ভারিক্কি ভাব , বলে

----কেমন আছ অদিতি ?

-----ভালো ।আপনি একা যে ?

---তুমিও ত একা ?

অমিত সবসময় একাই ছিলাম একাই আছি কিন্তু আপনি একা কেন ?

---- অন্তরা নেই ।আমাদের প্রথম সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা গেছে ...

---মেয়ে কোথায় থাকে কেমন আছে ? বয়স কত ?

---বলছি দাঁড়াও মেয়ে এতিম খানায় মা মারা যাবার পর ওকে দেখার কেউ ছিল না বয়স ৩ বছর ।

----কেন অর নানা - নানু নেই

---না তারা এই বিয়ে মেনে নেননি ওর সন্তানের দায়ভার কেন নেবেন ? আমিই বা কেন দেব?

---তাই বলে এতিম খানায় বড় হবে ও ?

--- হা উপায় কি বল অণুর যে কেউ নেই আর । আমি থাকি ব্যস্ত কে দেখবে ওকে ? মৌ টাও বিদেশে ।একবার মনে হয়েছিল তোমার কাছে যাই পরে ভাবলাম কোন মুখে যাবো ? আজ আরও অপরাধী মনে হচ্ছে নিজেকে তুমি বিয়েই করলে না । আমার জন্য তোমার জীবন ও নষ্ট হল।

কোন কথা বলল না অদিতি শুধু মনে মনে ভাবল বিয়ে তো হয়েছিল সেই ছোট বেলায় আর ভেঙেও গেল তখনি । পুরো জার্নিতে অদিতি কোন কথা বলল না । প্লেন ল্যান্ড করবে কিছুক্ষণের মধ্যেই মাইক্রোফোনে তার ঘোষণা আসছে সিট বেল বাঁধতে বলা হচ্ছে ,

--- তখন অদিতি বলে একটা কিছু চাইবো দেবেন ?

---কি দেব বল ? আমার দেবার মত কিছুই নেই আর ...তবুও যদি থাকে দেব বল তুমি ।কিছুক্ষণ চুপ থেকে অদিতি বলে ,

----অণুকে চাই আমিও বড় একা , আমি ওর দায়িত্ব নেব মানুষ করবো ।ও জানবে আমি ওর খালা । ওর কোন অযত্ন হবে না ,এখনো মা আছেন ,আমরা দুজনে ঠিক ওকে দেখে রাখবো ।

----- দীর্ঘশ্বাস গোপন করে মুকুল বলে বেশ তাই হবে ,ফিরে এসে ওকে তোমাদের ওখানে রেখে আসবো ,তোমার কাছে আমি হেরে গেলাম চিরকাল । ওর চোখে ভেসে ওঠে সেই ক্ষতবিক্ষত সূর্যমুখী ফুলটা একদিন নিজে সে ছবিটা তুলেছিল।

অদিতি মনে মনে বলে তোমার জন্যই আমার ঘর বাঁধা হোল না সংসার করা হোল না , জগতের স্বতঃসিদ্ধ নিয়মের কাছে আমি কবেই হেরে বসে আছি চোখের সামনে ভেসে ওঠে উড়ে যাওয়া সেই টিয়া পাখিটা ।

প্লেন তখন লন্ডনের মাটি স্পর্শ করল মাত্র ।

ছোটগল্প - সৈয়দ রায়হান বিন ওয়ালী

0 কমেন্টস্


ভাঙ্গনের নিগুঢ়ে কাঙ্ক্ষিত আগামী
সৈয়দ রায়হান বিন ওয়ালী


অনেক ভেবেচিন্তে এবং দীর্ঘদিন নিজের সাথে বোঝাপড়া শেষে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে দীপান্বিতা। তীব্র আবেগের ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে অকস্মাৎ নেয়া সিদ্ধান্ত এটি নয়।

আশেপাশে একটাও রিক্সা নেই। হাতের ব্যাগটাকে অনেক বেশী ভারী মনে হচ্ছে। তেমন কিছুই তো নেয়নি সে সাথে। তবুও এত কষ্ট হচ্ছে। শরীরটা আসলেই অনেক দুর্বল হয়ে গেছে।

বড় রাস্তার মাথায় একটা রিক্সা দেখা যাচ্ছে, এতোটা কাছে নয় যে ডাক দিলে শুনতে পাবে। দ্রুত পা চালানোর চেষ্টা করলো দীপান্বিতা। ট্রেনটা মিস করলে ঝামেলা হয়ে যাবে। পরবর্তীতে আর কি কোনদিন এই সাহস তাকে পথে নামাতে পারবে? হয়তো আর কোনদিনও এমন সাহস দেখানোর সাহস করা তার হয়ে উঠবে না। ভাবতে ভাবতে সে বড় রাস্তার মাথায় এসে দাঁড়াল। ট্রেন ষ্টেশন যাবেন? তাড়া সূচক প্রশ্ন ছুড়ে দিল সামনের খালি রিক্সাটার চালককে লক্ষ্য করে? রিকশাচালক মাথা কাঁত করে হ্যাঁ সূচক জবাব দিতেই ব্যাগ হাতে রিক্সায় চেপে বসল দীপান্বিতা রিক্সা ভাড়া না মিটিয়েই। রিকশায় উঠে রিকশাওয়ালা কে বলল, ভাই একটু তাড়াতাড়ি চালাবেন, নইলে ট্রেনটা ধরতে পারবো না। এমনিতেই অনেক দেরী হয়ে গেছে। কোন উত্তর না দিয়ে রিক্সা চালতে শুরু করলো যুবক রিকশাওয়ালা।

ফের হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময় দেখে নীল দীপান্বিতা। পারবে কি এই রিকশাওয়ালা তাকে দশ মিনিটের ভেতর স্টেশনে পৌঁছে দিতে? ঠিক ঠিক আটটায় যে ট্রেনটা ছেড়ে যায়। রিকশাওয়ালাটা তার কথামত বেশ জোরেই রিক্সা টানছে। আকাশ পাতাল ভাবনা চলছে দীপান্বিতার মাথার ভেতর। ছেলেটার কথা চিন্তা করেই বারে বারে চোখে পানি এসে যাচ্ছে। তাকে ছাড়া ছেলেটা চলবে কি করে? সেটাই তাকে বেশী ভাবাচ্ছে এবং পাশাপাশি কষ্টও দিচ্ছে। ছেলেটার জন্যই তো দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে উঠছে তার যাত্রা পথ। অনেক স্মৃতি মনে পরে যাচ্ছে। কত স্মৃতি! কত স্মৃতি! এক যুগেরও অধিক সময় মানুষটার সাথে ঘর করলো সে অথচ মানুষটা কোনদিন তাকে তার নিজস্ব পরিচয়ে বেড়ে উঠতে দিতে চাইলো না। এই বিংশ-শতাব্দীতে, এত পাশ দেয়া অথচ এত পশ্চাৎপদ ভাবনা চিন্তার মানুষও থাকে! আশ্চর্য! তার স্বামীর বেড়ে ওঠা সঙ্ক্রান্ত কোন বিষয়ে সে তো কখনও বাঁধা দিতে যায়নি! তবে কেন সে এমন? সব পুরুষেরাই কি এমন? নারীকে সারাজীবন তারা পদানত করে রাখতে চায়? নারী কি পুরুষের ব্যবহার্য কোন পণ্য? না কি পোষ মানে এমন কোন গৃহপালিত পশু? প্রচণ্ড ক্ষোভে ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠে তার অন্তর। মানুষটার এই হীনতা আর বিজাতীয় গোঁড়ামির কারণেই আজ তার প্রাণের সন্তানের মায়া ছেড়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে বেরিয়ে পড়তে হয়েছে। মানুষটাকে সে কোনদিন ও কোন কিছুর বিনিময়েও ক্ষমা করবে না। মানুষটা তার জীবন টাকে পুড়িয়ে পুড়িয়ে অঙ্গার করে দিয়েছে।

কত সখ ছিল তার পড়ালেখা শেষ করবে, ভালো চাকরি করবে, আর সব নিজের পায়ে দাঁড়ানো স্বনির্ভর নারীদের মত। অথচ এই মানুষটাই তার কোমল ও মমতা প্রবণ তরুণী মনের সুযোগ নিয়ে তাকে তার পড়ালেখা টা পর্যন্ত শেষ করতে দেয়নি অথচ নিজে ঠিকই পড়ালেখা শেষ করে, ধীরে ধীরে নিজের পেশাগত সবকিছু গুছিয়ে নিয়েছে। কিসের কমতি ছিল তার। লেখাপড়ায় তো সে একদম খারাপ ছিল না, আর সব মেয়েদের চেয়ে তার সাধারণ জ্ঞান ঈর্ষা করার মতই ঋদ্ধ ছিল। ছিল গান শেখার সহজাত ক্ষমতা আর সৃষ্টি কর্তা প্রদত্ত সুরেলা ধ্রুপদী কণ্ঠস্বর। ছিল নরম কাদামাটির মত সুগন্ধে ভরা এক জ্ঞান পিপাসু হৃদয়। আফসোস! কিছুই সে কাজে লাগাতে পারেনি। না ভুল, লোকটা কাজে লাগাতে দেয়নি। ভালবাসার দোহাই দিয়ে, ভুলিয়ে ভালিয়ে বিয়ে করে ঘরে নিয়েছিল। ভালবাসা! ভালবাসার অর্থ বোঝে সে, না বোঝার কোনদিন চেষ্টা করেছে?

এতোটা বছর কিভাবে সে সংসার করেছে কেউ কি জানে সব! কেউ কি বোঝে একটি তরুণী কি ধরনের লাঞ্ছনা ও বঞ্চনা নিয়ে এই স্বার্থপর, নিষ্ঠুর ও অকৃতজ্ঞ মানুষটার সাথে এত দিন ঘর করেছে সে! না জানে না। জানে না আর বোঝে না বলেই অনেকে তাকে ভুল বোঝে। ভুল বুঝেই তার বিরুদ্ধে বলে নানান অকথা কুকথা।

পুনরায় হাত ঘড়িটার দিকে তাকাল সে। পথ টা প্রায় অর্ধেক পেরিয়ে এসেছে। রিকশাওয়ালা টা বেশ জোরেই টেনে চলেছে রিকশা। সকাল আটটা বাজতে আর মাত্র ছয় মিনিট বাকী আছে। ট্রেনটা ধরতে না পারলে সত্যি অনেক ঝামেলা হয়ে যাবে। পরের ট্রেন সেই রাত দশটা। ট্রেনটা মিস করলে এতক্ষণ সময় সে কাটাবে কোথায়? এই ভেবে অস্থিরতা অনুভব করতে লাগলো দীপান্বিতা।

আর কতক্ষণ লাগবে। আবার হাত ঘড়িটার দিকে তাকাল দীপান্বিতা। আর মাত্র দুই মিনিট বাকী। ডান দিকে বাঁক নিচ্ছে রিক্সাটা, ষ্টেশনে প্রায় পৌঁছে গেছে সে। হটাৎ তীক্ষ্ণ আর বিকট আওয়াজের সাথে সাথে পেছন থেকে প্রচণ্ড ধাক্কায় রিকশা থেকে ছিটকে রাস্তায় আছড়ে পড়ল সে । মাথার পেছনে কে যেন হাতুড়ি দিয়ে সজোরে আঘাত করলো। মাথার পেছনে তীব্র বেদনা ও দু চোখে অন্ধকার নিয়ে জ্ঞান হারাল দীপান্বিতা।

... ... ...


মা, ও মা, কি, কি হয়েছে তোমার? এমন করছ কেন? কি হয়েছে তোমার? কাঁদ কাঁদ গলায় প্রশ্ন করে চলে ঋদ্ধ। ধড়মড়িয়ে এবং প্রায় ফোঁপাতে ফোঁপাতে উঠে বসে দীপান্বিতা। তীক্ষ্ণ চোখে চারপাশ দেখে নিয়ে, আতংকিত ও বিহবলিত কণ্ঠে প্রায় স্বগতোক্তির মত বলে উঠে, আমি, আমি এখানে কেন? পরোক্ষনেই ঋদ্ধকে কাঁদতে দেখে জিজ্ঞেস করে উঠে, কিরে, কি হয়েছে তোর, তুই কাঁদছিস কেন? এবং প্রায় সাথে সাথেই, আবার জিজ্ঞেস করে, আমি, মানে আমি হসপিটালে কেন? তীব্র উত্তেজনা প্রশ্নমালা শেষ হবার আগেই, বিদ্যুৎ ঝলকের মত দীপার মনে পড়ে যায় সব কথা। ঢাকা যাচ্ছিল সে। রেল স্টেশনে পৌঁছে যাবার একেবারে শেষ মিনিটে রিকশাটা যখন স্টেশনে ঢোকার জন্য ডান দিকে বাঁক নিচ্ছিল ঠিক তখনই পেছন থেকে একটি দ্রুত গতির কোন একটি কিছু এসে তাদের রিকশাকে প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা দেয়। আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিত প্রচণ্ড ধাক্কার কারণে তার শরীর উল্টে প্রথমে পিঠ ও মাথার পেছনের অংশ পিচ ঢালা কঠিন রাস্তায় সরাসরি আছড়ে পড়ে। তারপর তার আর কিছু মনে নেই। শুধু একটি কিশোর মুখের ছবি মনের গহীনে ভেসে উঠতে না উঠতেই দপ করে সব কালো হয়ে যায়।

... ... ...


এখন কটা বাজে রে ঋদ্ধ? তোর বাবা কোথায়? সুস্থির হয়ে কিছুটা ক্লান্ত গলায় এক সাথে দু দুটো প্রশ্ন করে বসে ঋদ্ধকে দীপান্বিতা। ঋদ্ধ দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলে, রাত এগারোটার কাছাকাছি। আর বাবা ডিউটি ডাক্তারের সাথে দেখা করে বাসায় গেছে। তোমার জন্য খাবার ও দাদু কে নিয়ে আসতে। রাতে তো কাউকে থাকতে হবে, নাকি?

কে নিয়ে এলো আমাকে এখানে? একই রকম ক্লান্ত গলায়, আবারও প্রশ্ন করে ঋদ্ধকে দীপান্বিতা। রাস্তার কয়েকজন লোক তোমাকে তোমার ব্যাগ ও মোবাইলসহ এই হসপিটালের ইমারজেন্সি কক্ষে পৌঁছে দিয়ে গিয়েছিল। পরে বাবা এসে ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে তোমাকে এই কেবিনে ভর্তি করিয়েছে, বলে ঋদ্ধ থামল।

আচ্ছা ঋদ্ধ, আমি যে রিকশায় যাচ্ছিলাম সেই রিকশা চালকের অবস্থা কি? তার কি বড় কোন ক্ষতি হয়েছে?

ঋদ্ধ জানালো, সে এ ব্যাপারে কিছু জানে না। তারপর প্রায় আঁতকে উঠে বলে উঠলো, ওহো তোমাকে তো একটি বিষয় জানাতে ভুলেই গেছি। মা, এক আংকেল এসেছিল। সেই আংকেল টা যার কথা তুমি আমাকে বলেছিলে। তোমার ঘুম ভাঙ্গার অপেক্ষায় অনেক ক্ষণ অপেক্ষা করে এই কিছুক্ষণ আগে চলে গেছে। যাওয়ার সময় এই প্যাকেট টা দিয়ে গেছে। এই কথা বলে বিছানার পাশের ছোট্ট টেবিল থেকে একটি প্যাকেট হাতে নিয়ে মায়ের হাতে তুলে দিল ঋদ্ধ।

চমকে উঠলো দীপান্বিতা। তবে কি উনিই চলে এসেছে এতোটা পথ পাড়ি দিয়ে তাকে দেখতে, সেই সুদূর ঢাকা থেকে? যার উপর ভরসা করে সে এই অনিশ্চিত যাত্রা শুরু করেছিল। যার যুক্তি আর অনুপ্রেরণা তাকে তার অর্গল ভাঙ্গার সাহস দেখিয়েছিল। কার কাছে তার দুর্ঘটনার খবর জানলেন উনি। আর কিভাবেই বা জানলেন যে আমি এখানে? একগাদা প্রশ্ন জেগে উঠলো তার মনে।

প্যাকেটটা হাতে নিয়েই দীপান্বিতা বুঝে গেলো যে এর ভেতরে কোন বই আছে। তবে কি সেই বইটি, যে বইটির কোথা সেই মানুষটি খুব বলতেন? দ্রুত হাতে প্যাকেটটা খুলে ফেললো। ঠিক তাই, সে যা ধারণা করেছিল। সেই বইটি, “মার্জিনে মন্তব্য”, লেখক সৈয়দ শামসুল হক। আর একটা খাম। খামটাও খুলল দীপান্বিতা। একটা চিঠি আর কিছু টাকা। বই, টাকা আর চিঠি দেখে চোখে জল এসে গেল দীপান্বিতার। আশ্চর্য মানুষ তো উনি এমন সময়েও ঠিক ঠিক তার প্রিয় জিনিসগুলোর কথা মনে রেখেছে। চিঠি পড়তে শুরু করলো দীপান্বিতা।

সে লিখেছে,

প্রিয় দীপা,

যাকে সামনাসামনি কখনও দেখা হয়নি তাকে প্রথমবার দেখার অজানা আনন্দে মনটা বিভোর ছিল সেই মধ্যরাত থেকে, তাকে যে হেমন্তের এই সন্ধ্যায় এভাবে এমন অসহায়ভাবে দেখতে হবে ভাবিনি। ট্রেনে উঠেই আমাকে ফোন দেয়ার কথা ছিল তোমার। তুমি জানিয়েছিলে, তোমার ট্রেন সকাল আটটায়। তাই সকাল সোয়া আটটা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও যখন ফোন পেলাম না তখন কেন যেন অজানা আশঙ্কায় মনটা দুলে উঠলো। তোমাকে ফোন করলাম, একবার, দুবার, ধরলে না তুমি। অস্থিরতা বাড়তে লাগলো। আবার ফোন করলাম। এবার অপরিচিত লোক ফোন ধরল। তাকে তোমার কথা জিজ্ঞেস করতেই সে হড়বড় করে তোমার দুর্ঘটনার কথা জানালো এবং বলল তারা তোমাকে একটি হসপিটালে নিয়ে যাচ্ছে। আমি তোমার অবস্থার কথা জিজ্ঞেস করতে ঐ লোকটি বলল যে তুমি অজ্ঞান অবস্থায় আছো আর তোমার মাথার পেছন থেকে একটু একটু রক্ত ঝরছে। কি যেন কি হারানোর আশঙ্কায় ফের জিজ্ঞেস করলাম তোমার পরিবারের কাউকে খবর দেয়া হয়েছে কিনা লোকটি জানালো যে, সে এ ব্যাপারে কিছু জানেনা। আমি লোকটির কাছে হসপিটালটার নাম জিজ্ঞেস করে ফোন কেটে দিলাম। ফোন কেটে দিয়েই তোমার স্বামীকে ফোন দিয়ে জানালাম যে তুমি সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছ এবং এখন তোমাকে হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। উনি আতঙ্কে আঁতকে উঠলেন, আমার পরিচয় জানতে চাইলে পুনরায় ফোন কেটে দেয়ার আগে তাকে শুধু বললাম, প্লিজ, তাড়াতাড়ি হসপিটালে যান নয়তো দীপার বড় কোন ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। বাসার কাউকে কিছু না বলে তোমার জন্য যে বইটি কিনে রেখে দিয়েছিলাম সেটা, কিছু টাকা, আর আমার ব্যাবহারের কয়েকটা প্রয়োজনীয় জিনিস ব্যাগে ভরে সোজা বাস ধরে তোমার এখানে। হসপিটালে পৌঁছে দেখি তোমাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেবার পর ঘুমের ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে। মাথা ছাড়া আর কোথাও তেমন চোট লাগেনি আর মাথার আঘাতটাও গুরুতর কিছু নয়। ভাবছ এত খবর কিভাবে পেলাম? রিসেপশন থেকে তোমার কেবিন নাম্বার সহ সবকিছু জেনে নিয়েছিলাম। জেনে নিয়েছিলাম ডিউটি ডাক্তার কোথায় বসে। ডিউটি ডাক্তার কে বলেছিলাম আমি তোমার আত্মীয়,আত্মীয় তো নাকি? ডিউটি ডাক্তার সব খবর জানালো। কেবিনে গিয়ে দেখি তোমার ছেলে মুখ অন্ধকার করে তোমার বিছানার পাশের চেয়ারে বসে আছে। তোমার স্বামীকে কোথাও দেখলাম না। তোমার ছেলের কাছে আমার পরিচয় দিলাম, দেখলাম ও আমাকে চেনে। হয়তো তুমিই আমাকে ওর কাছে পরিচিত করিয়ে রেখেছিলে।

সন্ধ্যার একটু আগেই আমি এখানে পৌঁছেছি। সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে অনেকক্ষণ হোল। তুমি ঘুমচ্ছ আর আমি লিখছি। আমার কাছে, তোমার অনেক দিনের আবদার ছিল আমি যেন তোমাকে একটি চিঠি লিখি। কিন্তু বিভিন্ন কারণে তা আর হয়ে উঠেনি। আজ এই অবেলায় অসময়েই সেই সময়টা হয়ে গেল। হসপিটালের ক্যাফেটেরিয়ার এক কোনে বসে, মন খারাপ নিয়ে লিখছি। ভয় হচ্ছে এই ভেবে, দীর্ঘ দিনের লাঞ্ছনা গঞ্জনার ভেতর দিয়ে জন্ম নেয়া যে আত্মউপলব্ধি তোমার ভেতর পুরাতন, জীর্ণ অস্বাস্থ্যকর অর্গল ভাঙ্গার সাহস দেখিয়েছিল, এই আঘাত তোমাকে সেই চেতনা থেকে বিচ্যুত করবে কিনা, থাকবে কিনা চারিত্রিক সেই দৃঢ়তা যা তুমি আমাকে বিভিন্ন সময় জানিয়েছিলে। দীপা, তোমার এই আত্মউপলব্ধিজাত চেতনা ও দৃঢ়তাই যে তোমার কাঙ্ক্ষিত আগামীর গড়ে তোলার মূল শক্তি, তা কি তুমি জান? আজকের এই আঘাতের মানসিক ও শারীরিক দখল পার হয়ে তুমি কি পারবে তোমার স্বপ্নের আগামীর জন্য পুনরায় যাত্রা করার সাহস দেখাতে। কে জানে। পারাটাই উচিৎ, কিন্তু এটাও তো সত্য কত উচিৎই আমাদের আর করা হয়ে উঠে না। যে কোন অর্গল ভাঙ্গা যে সত্যি কঠিন দীপা, সত্যি কঠিন ...। তোমাকে দেব দেব বলে অনেক দিন ধরে যে বইটি আমি তোমার জন্য আগলে রেখেছি সেই বইটি আজ তোমাকে দিয়ে গেলাম, সঙ্গে কিছু টাকা, হয়তো তোমার কাজে লাগবে। খরচ করতে সংকোচ বোধ করো না। প্রয়োজনে আয় করে দিয়ে দিবে, কি বল? একটু আগেই আবার দেখে এলাম তুমি এখনো ঘুমচ্ছ, ঘুমোও। তোমার সত্যি একটি লম্বা ঘুম দরকার।

আমি রাতের ট্রেনেই ফিরে যাব। সারা রাস্তায় এই ভাবতে ভাবতে যাব যে তুমি তোমার সব অর্গল ভেঙে ঠিকই একদিন বেরিয়ে আসবে। হয়তো, এমনি সারা রাত কোন এক ট্রেনের কোন একটি কেবিনে কোন এক সুদূর অজানা যাত্রায় আমরা একজন আরেকজনকে আরও গভীরভাবে জানার সুযোগ পাব। সেই অপেক্ষায় রইলাম। আজ এই পর্যন্তই। ভালো থাকার চেষ্টা কর।

ইতি

সুহৃদ

চিঠি পড়া শেষ করে অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকলো দীপান্বিতা। ঋদ্ধ জিজ্ঞেস করলো, মা তোমার কি খারাপ লাগছে। কোন উত্তর দিল না দীপান্বিতা, বলল আমাকে ধরে একটু বারান্দায় নিয়ে যাবি বাবা। ঋদ্ধ একটু অবাক হলেও কিছু না বলে বলল, ঠিক আছে ওঠো, তোমাকে ধরছি আমি। বিছানা থেকে নেমে, ঋদ্ধর হাত ধরে বারান্দায় এসে দাঁড়াল দীপান্বিতা। রাত কটা বাজলো? নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলো সে। তার ট্রেন কি শহর ছেড়ে চলে গেছে? হসপিটালের পেছনের দিক দেখা যাচ্ছে বারান্দা দিয়ে। একটু দুরেই ফসলের মাঠ। বাইরে কি আজ জ্যোৎস্না নাকি। অগ্রাহায়ন মাসের কয় তারিখ আজ? পূর্ণিমা নিশ্চয় নয়। আলো আঁধারি পরিবেশ চারপাশে। হটাৎ বিপ বিপ শব্দে বেজে উঠলো বিছানার উপর মোবাইলটা। ঋদ্ধ কে মোবাইলটা আনতে বলল দীপান্বিতা। ঋদ্ধ বিছানা থেকে মোবাইলটা এনে মার হাতে দিল। মোবাইলটা হাতে নিয়ে ঋদ্ধ কে ঘরে যেতে বলল দীপান্বিতা। ঋদ্ধ ঘরে চলে গেল। মেসেজটা পড়তে শুরু করলো সে। মেসেজে লেখা আছে... কিছুক্ষণ আগেই তোমার শহর ছেড়ে আমার শহরের দিকে যাত্রা করেছে ট্রেনটা। এখন প্রায় মধ্যরাত, বাইরে কেমন অস্পষ্ট জ্যোৎস্না। তোমার কথা খুব মনে পড়ছে। একটি ফলন্ত ফসলের মাঠের বুক চিরে আমাদের ট্রেনটি ছুটে চলেছে তার গন্তব্যের দিকে। আমদের দুজনের কি কোন গন্তব্য আছে, দীপা...

কলিং বেল বেজে উঠল। কেবিনের দরজা খুলে দিল ঋদ্ধ। ঘরে ঢুকল ঋদ্ধর বাবা। চারপাশে চোখ বুলিয়ে দীপাকে বারান্দায় দেখে, শিরিষ কাগজের মত শুষ্ক ও ধারালো কণ্ঠে বলে উঠলো, ওখানে কি করছ দীপা, ঘরে এসো শরীর খারাপ করবে। চোখ মুছে ফের বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড়াবার জন্য ঘুরে দাঁড়ালো দীপান্বিতা ঢুকে পড়ল রুমে।

ছোটগল্প - সর্বজিৎ সরকার

1 কমেন্টস্


অদ্ভুদ মৃত্যুর পর
সর্বজিৎ সরকার


পাড়ার প্রতিবেশী অমলেশ চাটুজ্জ্যের মৃত্যুটা কিভাবে হল সেটা জানে না কেউ।কিন্তু মৃত্যুটা যে স্বাভাবিক নয়,তা বোঝা গেছিল মৃতের শরীরে কিছু অদ্ভুদ দাগ দেখার পর।সেদিন রাত বারোটা চল্লিশ নাগাদ সারা পাড়াজুড়ে একটা প্রবল ভয় মিশ্রিত চিৎকার ঘুরে ফিরে যায়।অমাবস্যার সেই রাত্রে যখন সবাই তার দেহ নিয়ে রওনা দিল শ্মশানের পথে,তখন এক ভয়াবহ ঝড়ের মুখোমুখি হল তারা।সেি বিশাল ঝড়ে শ্মশানের সব লন্ডভন্ড হয়ে যায়...দেহ ফেলে পালায় শ্মশানযাত্রীরা!আল্লারাখা শুধু সেই দেহ ফেলে যায়নি কোথাও!কিন্তু তারপর দিন থেকে আর কেউ আল্লারাখার খোঁজ পায়নি!দেহটার ও কোনোরকম হদিশ মেলেনি।

রোজ রাত্রে অমলেশ বাবুর বাড়িতে গেলাসের ঠোকাঠুকি শোনা যায়।ঠুমরীর সুর আসে ভেসে ওই বাড়িটা থেকে।বাড়িটা ফাঁকাই পড়ে আছে কিছুদিন...সন্ধ্যে হলে ওই বাড়ির সামনে কেউ পা বাড়ায় না!যেদিন আল্লারাখা নিরুদ্দেশ হ্ল,সেই সময়টা চলছিল রমজান মাস।এই পাড়াতেই বাড়ি আল্লারাখার।অমলেশ বাবুর সাথে ভালই সখ্যতা ছিল তার।মাঝে টাকা পয়সা নিয়ে একটু বচসা অবশ্য হয়েছিল তাদের!অমলেশ বাবুর ধারদেনা ছিল প্রচুর...কিন্তু তার মৃত্যুর কোনোরকম কিনারা করা গেল না,আল্লারাখার নিরুদ্দেশ হওয়ার ও!

আজ সেই বাড়ি পাড়ার অন্যতম ভূতবাড়ি নামেই পরিচিত।রাত্তিরে নাকি বাড়ির আশেপাশে আতরের গন্ধ ছড়ায়।ভোরের দিকে আজান শোনা যায়,আবার নানারকম নবাবী সুর ভাসে বাড়ির আনাচে কানাচে!কেউ বুঝে উঠতে পারে না এই অদ্ভুদ ধরনের ঘটনার পেছনের রহস্যটার কথা।কেন ঘটছে এসব হিন্দুবাড়িতে!ঠাওর করতে পারে না কেউ!

পাড়ার কিছু মানুষ ঠিক করে ওঝা এনে ভূত তাড়াবার।অমাবস্যার রাতে যখন যজ্ঞে ঝাঁড়ফুক শুরু হ্য়,তখন সে উন্মত্ততা যেন বেড়ে দ্বিগুন হয়েছে!কোনো লাভ হয়নি এসব তন্ত্রসাধনায়!কিন্তু পাড়ার সবাইকেই আল্লারাখার নিরুদ্দেশ বড় ভাবিয়ে তোলে!এরকমভাবেই চলতে থাকে ভূতবাড়ির অন্দরমহলের নানা ঘটনা,যার টুকরো উচ্ছিষ্ট পাড়ার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে!

একদিন সবে সন্ধ্যে হয়েছে!হঠাৎ লোডশেডিং এ সারা পাড়া অন্ধকার হয়ে যায়।পূর্ণিমার আলো পড়ে ভূতবাড়ি বেশ আলোময় হয়ে উঠেছে।পাড়ার কিছু মানুষ দেখতে পেল আল্লারাখার মতো কেউ বাড়িটা থেকে বেরিয়ে এসে শ্মশানের রাস্তা বরাবর হাঁটা শুরু করেছে!পাড়াপড়শি অনেকবার ডাক দিলেও কোনো সাড়া মেলেনি।কেউ সামনে এগিয়ে তার সম্মুখে দাঁড়াবার সাহসটুকুও দেখায় নি।এইভাবে হাঁটতে হাঁটতে শ্মশানের কাছে গিয়ে সে যেন কোথাও মিলিয়ে গেল!সবাই বেশ ভয়,আতঙ্ক নিয়ে বাড়ি ফিরেছে;চারিদিকে গুঞ্জন শুরু হয়ে গেছে ততক্ষণে!

কিছুদিন হল ভূতবাড়ির উগ্রতা বেশ ম্লান,প্রায় থেমেই গেছে বলা চলে।একদিন সকালে কিছু মানুষ সাহস নিয়ে সেই বাড়ির ভেতর গিয়ে ঢোকে।চারদিক খুঁজে কিছু না পেয়ে যখন সিঁড়িঘরের সামনে আসে,তখন হঠাৎ তাকিয়ে দেখে অমলেশ বাবুর দেহটা পড়ে আছে মাটিতে!অদ্ভুদভাবে কোনো পচন ধরেনি...সেদিনের মতোই নিথর!চমকে ওঠে সকলে...বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থকে কিছুক্ষণ!অবশেষে তারা ঠিক করে দেহটা কবর দিয়ে দেবে ওই বাড়িতেই।কথামতো সব ব্যবস্হা হয়...কাজটাও সুষ্ঠভাবে সম্পন্ন হয়!

তারপর থেকে সব শান্ত...কিন্তু আল্লারাখার সেই সন্ধ্যেবেলা হঠাৎ করে উদয় হওয়া,আর তারপরেই শ্মশানের দিকে গিয়ে কর্পূরের মতো উবে যাওয়ার কারণ কেউ খুঁজে পায়নি!কেবল তার গলার লকেটটা অদ্ভুদভাবে মিলেছিল অমলেশ বাবুর বাড়ির উঠোনে!
...আজও রাত্তির হলেই গা ছমছম করে সেই বাড়ির আশেপাশে...সেই বাড়ি আজ এত শান্ত..নিস্তব্ধ..চুপচাপ বলেই!

ছোটগল্প - অলভ্য ঘোষ

0 কমেন্টস্
স্বপ্ন
অলভ্য ঘোষ


একটা কাঠঠোকরা পাখি সাত রঙ্গের ডানা ঝাপটিয়ে উড়ে গেল সায়ক গাছটার কাছে যেতেই ; তার ডানা থেকে একটা পালক খসে পড়ে তখনো হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে সায়কের মুখের সামনে থেকে পড়লো মাটিতে । সায়ক সেটা হাতে তুলে চোখ বন্ধকরে গালে বুলল । চোখ বন্ধ অবস্থায় সায়কের মনে হল আকাশে রামধনু আকাশ ছেড়ে তার পায়ের কাছে যেন এক মহাসমুদ্র নির্মাণ করেছে । তার পর সেই রং ধার করে বৃহৎ-সুন্দরী গাছটার আশেপাশের চাতাল জুড়ে অপরিচিত সব অপূর্ব ফুলের বাগিচায় ঢেকে গেল মুহূর্তে । হরেক রংয়ের প্রজাপতিদের ঢল নামলো নিমিষে । বৃষ্টির মতো তারা ফুলের ওপর ঝরে পড়লো । কয়েকটা সায়কের মাথায় বুকে উড়ে এসে বসতে ভুল করলো না । সায়কের একবার হৃদপিণ্ডের কাছাকাছি বসা প্রজাপতিটাকে হাত দিয়ে স্পর্শ করার ইচ্ছে হল ; পরক্ষনেই মনে হল যে তার মনের এত কাছাকাছি এসে ধরা দিয়েছে হাত দিয়ে ধরতে গিয়ে যদি সে উড়ে যায় ।ওরা জানে মানুষ ফুল ছেরে গাছ কাটে , পশুদের কাছে এমন ভয় নেই । লোভ সংবরণ করে প্রাপ্তি টুকুতেই যখন আনন্দ পাচ্ছিল সায়ক ; হটাৎ একটা ঠাণ্ডা নরম স্পর্শ সে তার পায়ের ওপর অনুভব করে । সাপের গা ঠাণ্ডা হয় ; আর বাগানে সেটি থাকা কিছু অসম্ভব নয় । সাপ অনুমানেই সায়ক চোখ খুলে দেখল ওটা একটা গিরগিটি ।করাতের খাঁজ কাটা পিট , ডায়নোসার মতো দেখতে বড় গিরগিটিটা শুকনো পাতার ওপর থেকে করমর শব্দ তুলে ঘার ঘুরিয়ে সায়কের দিকে দেখতে দেখতে গাছটার আড়ালে পালায় । সায়ক চোখ খুলে কিছুটা হতাশ হয়ে ছিল ফুলের বাগিচার বদলে শুকনো পাতার আবর্জনায় প্রজাপতিদের সমারোহের বদলে এই গিরগিটিটাকে আবিষ্কার করে । তবে সে রুক্ষতা কাটিয়ে পরিবেশের সাথে রং মিলিয়ে মিলিয়ে সায়ক আর প্রকৃতির সাথে লুকোচুরি খেলা বহুরূপী গিরগিটি টাকে সায়কের এবার বেশ ভাল লাগে । গিরগিটি টাকে যখন আর গাছের পেছনে লুকিয়ে পড়ায় দেখা যাচ্ছিলো না তখন সায়ক সেখানে গিয়ে উপস্থিত হতে গেলে একটা কাঠবেরালি তার সামনে দিয়ে ছুটে পালায় । সেযেন বলে ;
- বাঁচতে চাও তো পালাও এখান দিয়ে ।
সায়কের মনে হল এ তার শোনার ভুল । সে জানে ডারউইনের তথ্য ; বাঁচতে হলে এ পৃথিবীতে পালানো চলেনা লড়তে হয় ।যে লড়ে সেই বাঁচে । যে লড়তে জানে না সে বাঁচতেও জানেনা । মৃত্যু এখানে ছায়ার মতো মানুষের পিছু ধাওয়া করে আর মানুষ সম্মুখ সমরে তাকে বারবার পরাস্ত করে জীবনকে রাজ মুকুট পড়ায় । পিছু পালালেও যখন মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই নেই বুদ্ধিমানের কাজ মৃত্যুকে বরন করে তার মোকাবিলা করা । মাথায় চড়িয়ে তাকে শাসন করতে না দিয়ে পোষা কুকুরের মতো বস করা ।গাছের পেছনে গিয়ে সে দেখল গাছের গায়ে একটা বিশাল গর্ত আর সেই গর্তের গা বেয়ে সাড়ি সাড়ি লাল কাঠ পিঁপড়ে মুখে করে ডিম নিয়ে উদ্বাস্তুদের মতো দেশান্তরিত হচ্ছে । সায়ক মনে মনে যেন তাদের জিজ্ঞেস করলো ;
- কোথায় চললে তোমরা ?
তারা যেন চি চি করে বলল ;
- এক স্বপ্ন-পুরীতে । ভারি সুন্দর স্বপ্নের মত সে জায়গা ।
সায়ক বলল ;
- সেখানে কী কী রং আছে ?
তারা বলল ;
- হরেক । শুধু দেখার মতো চোখ চাই ।
সায়কের মনে হল পিঁপড়ের সাথে কথোপকথন শোনার কান ও অনেকের থাকে না । তারা চেনা বন্ধুদের
অনেকের মুখ তার মনে পড়লো ; বধির আড়ষ্ট সেই পাথরের মতো মুখ গুলোর ওপর সায়ক দেখল
ঝলসে চলেছে নানা ভি ডি ও গেমের আলো আঁধারি । যখন মেশিন গানের আওয়াজ ; বাইকের রেস ;
থ্রিলার মিউজিকের ককটেল সায়কের শিরা উপশিরা বেয়ে চৈতন্যকে তার বন্ধুদের মতো বসকরে নিচ্ছিল ;
সায়ক কানে হাত চাপাদিয়ে চোখ বন্ধ করেনিল । সমস্ত আওয়াজ ঢাকা পড়ে গিয়ে একটা নিস্তব্ধতা
নেমে এলো সমস্ত চরাচরে । ধীর স্থির ধ্যান ভাঙ্গা ঋষির মতো সায়ক চোখ খুলে তাকাল বুড় গাছটার
প্রকাণ্ড কাণ্ডের গায়ে ক্ষোদিত বিশাল আকার গর্তটার দিকে । সে দেখল পিঁপড়েদের মিছিল শেষ হয়ে
গিয়েছে । হরেক রং - হরেক সাদ সায়কও পেতে চায় স্পর্শ ,গন্ধ , অনুভবে হৃদয়ের চোখ দিয়ে ; মস্তিষ্কের
বুদ্ধি-দিয়ে ; এই মহাবিশ্বের তিলবৎ সৌন্দর্য ও যেন তার দৃষ্টির অগোচরে গিয়ে চেতনাকে অভিষিক্ত করতে ভুলে
না যায় । তাই সায়ক স্বপ্ন-পুরি এক স্বপ্নের রাজত্বে যাবার উদ্দেশ্যে বড় গর্তটার কাছে এগিয়ে গেল । সায়ক দেখতে পেল বড় গর্তটার গা বেয়ে বৃহৎ গাছটার কাণ্ডের ভেতর একটা সিঁড়ি পথ অন্ধকার গুহার প্রবেশ দারের মতো এগিয়ে চলেছে ভূপৃষ্ঠের কেন্দ্রের দিকে । মশালের মতো জোনাকির আলো তাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল । পথে সায়ক দেখতে পেল সিঁড়ির অনেকটা দূরে সেই গিরগিটি টাকে । তার কিছু পেছনে পিঁপড়ের মিছিল টা এগিয়ে চলেছে সায়ক বুঝল সকলেই চলেছে ওই স্বপ্নের রাজ্যের দিকে । হটাৎ অন্ধকারে ওৎপেতে বসে থাকা একটা পেঁচা উড়ে এসে গিরগিটি টায় ছোঁ মারে ; ধরে নিয়ে চলে যায় । কয়েক টা বাদুর ফরফর করে উড়ে চলে যায় সায়কের মাথার ওপর দিয়ে বিকট আওয়াজ করে । পিঁপড়ে গুলো মিছিল ভেঙ্গে ছোটা ছুটি করে । সায়ক প্রথমে কিছুটা ভয় পেলেও নিজেকে সংযত করে। সে জানে ভয়কে প্রশ্রয় না দিয়ে জয় করতে হয় । না হলে ভয়ের আসংখ্যায় জীবের অনেক মূল্যবান কার্য অধরা থেকে যায় ।দূরে সিঁড়ির শেষে সায়ক দেখতে পেল আলোক সাগরের ঢেউ । অসম্ভব রোমাঞ্চ নিয়ে যখন সায়ক সিঁড়ির কিনারায় গিয়ে পৌঁছল
সিঁড়ির ওপর বসে আকাশ থেকে পৃথিবী দেখার মতো দেখল একটা নতুন দেশকে মাকড়সার জালে বেষ্টিত সিঁড়ির শেষ প্রান্তের গহ্বর মুখ থেকে।
এখানে নাগরিক সভ্যতার ধূয়া -গ্যাস ,গাড়ি- ঘোড়া , বড় বড় বিল্ডিং , লাইট পোস্ট ,ফ্লাইওভার, কারখানার চিমনি কিংবা ওয়ারলেস-টি.ভি অথবা টেলিফোনের টাওয়ার নিদেন পক্ষে খাবার জলের উঁচু ট্যাঙ্ক কিছুই দেখা গেল না । দেখা গেল শুধু একটা সমুদ্র আর রাশি রাশি ফুল আর ফলের বাগান সমুদ্র তটে । সে সব বাগানে কাজকরা মানুষ গুলোকে ওপর থেকে পিঁপড়ের মতো দেখাল সায়কের চোখে । এদিকে
সেই মিছিলের লাল কাট পিঁপড়ে গুলো সিঁড়ির শেষের এই মাকড়সার জালে আটকে চটপট করছিল বেশির ভাগের মুখ থেকে ডিম গুলো খসে পড়েছিল সমুদ্রের জলে । এটুকু ভেবে পিঁপড়েরা আস্বস্হ ছিল তারা সে সুন্দর দেশে পৌঁছাতে না পাড়লেও তার ছানারা পাবে এক সুন্দর পৃথিবীর সাদ । সায়ক ভাবে যে জাল থেকে একটা পিঁপড়েও গলতে পারেনা সেই মিহি জাল টপকে সেও বা সে দেশে যাবে কিকরে । মাকড়সার
জালের ফাঁক থেকে সে আবার দেশটাকে দেখে ; সমুদ্রের বুকে বড় বড় জাহাজ ভাসছে না । ছোট একটা ডিঙ্গির ও দেখা মেলা ভার । শুধু রূপোর মতো চিকচিক করা কূল কিনারা হীন জলরাশি যেন জ্ঞান গর্ভ গভীরতা বুকে ধরে অপেক্ষা করছে কোন এক দেব দূতের যে এসে ডুব সাতরে তার গভীরতায় পৌঁছে সঞ্চয় করবে জ্ঞানের মণিমাণিক্য । কিন্তু সে দেবদূত কোথায় ? অনেক টা ঝুঁকে অনেক ওপর থেকে সায়ক সেই দেব দূতের সন্ধান করতে করতে হটাৎ হরকে পড়লো মাকড়সার জালে । বোধয় সায়ক কে দেখেই মাকড়সা টা কোথাও কাছাকাছি লুকিয়ে পরেছিল । সে জালে জড়িয়ে পড়তেই লোমশ বড় বড় ঠ্যাং গুলো নিয়ে সে জাল বেয়ে সায়কের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো । মুখ দিয়ে জাল বুনে সায়কের হাত পা বেঁধে ফেলার চেষ্টা করলো সায়ক যখন হাতপা ছুড়ে তাকে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করছিল সহায় হল সরবো হারা পিঁপড়ে গুলো । তারা মরণকামড় দিয়ে বসলো মাকড়সার সারা দেহে । সায়ক সুযোগ বুঝে হাতদিয়ে মাকড়সার জাল ছিঁড়তে লাগলো সে জাল এতো মজবুত আর মায়াবী কষ্ট করে ছিঁড়লেও সাথে সাথে জোড়া লেগে যায় । অনেক কষ্টে জালে একটা বড় ছিদ্র বানিয়ে সেখান থেকে সায়ক মহাকাশচারীর পৃথিবীতে ফিরে আসার মতো টুপ করে ঝরে পরে সমুদ্রের জলে । অনেক ওপর থেকে পড়ায় সমুদ্রের অনেকটা গভীরে চলে যায় সায়ক । সমুদ্রের তলায় কোরালের নগরের ওপরে মাছদের ঝাঁক যুদ্ধের এরোপ্লেনের মতো পাক খাচ্ছিল । সায়ককে দেখে একটা অক্টোপাস সড়ে গেলে কোরালের ওপর রাখা তার পেটের তলায় একটা নীল জ্ঞান নীলায় সূর্যের আলো পরে নীল শিখায় জলের ওপর প্রতিফলিত হয়ে পড়ে । ডুবুরির মতো ডুবসাঁতারে সেটার কাছে গিয়ে সায়ক সেটা সংগ্রহ করে । নীলা টা হাতে তুলে নেবার সময় জেলির মতো একটা চটচটে পদার্থ কোরালের গা থেকে তার হাতে সে অনুভব করে ।
তার তালু বদ্ধ নীলা টা সায়কের যেন মনে হল কথা বলছে ।
- আমায় সঞ্চয় করে তোমার কী লাভ ?
সায়ক বলে ;
- বা জ্ঞান অর্জন করতে কে না চায় ।
নীলা বলে ;
- সে তুমি করেছো । অনুসন্ধান করতে করতে তুমি আমার এতো কাছে পৌঁছে আমার সম্পর্কে সমস্ত কিছু জেনে নিয়েছ । আমার বাহ্যিক নীল শরীর টা সঞ্চয় না করলেই নয় । জ্ঞান তো মগজে সঞ্চিত ;টেকে সম্পদ সঞ্চয় করে কী লাভ । আমার জন্য ; চোরে সিঁদ কাটবে , ডাকাতে তোমায় লুট করবে ,
লোভী প্রতিবেশী বা নিকট আত্মীয় তোমাকে ঠকাবে , প্রিয় বন্ধু বিশ্বাস ঘাতকতা করবে । এই সবকিছুই যখন একটা পাথরের টুকরোর জন্য তা হলে সেটা বর্জন করনা কেন বাপু । যে সম্পদ মানুষে মানুষের সম্পর্ক নষ্ট করে জানি না তোমরা মানুষের সে সম্পদ অধিকারে কী লাভ পাও ।তোমার অন্তরে সিঁদকাটার
কিংবা মস্তিষ্কে ডাকাতি করার সাধ্যি কার নেই । চুরি ডাকাতি দুরের কথা তোমার মনের মনি মাণিক্য যদি বিশ্বাস ঘাতকতা করেও কেউ নিতে চায় ধরা পরে যাবে । সায়কের মনে হল সে নতুন কত কিছু শিখল । যা তার পড়ার বইয়ের কোথাও লেখানেই । নীলাকে ধন্যবাদ জানাবে বলে সে যেই না হাতের মুঠো খুলল
দেখল শুধু তার হাতের মধ্যে একরাশ বুজ-বুজ সমুদ্রের ফেনার মতো মিলিয়ে যাচ্ছে । সায়ক হতাশ হল না বুঝল কোনকিছুর প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির চেয়ে বড় ভেবে দেখা সেটা আদপে কতটা জীবনের প্রয়োজনীয় । সে ডুবুরির মতো যখন ওপরে ভেসে উটতে লাগলো দীর্ঘায়ু একটা কচ্ছপ তার পাশ থেকে ভেসে গেল । খরগোসের
সাথে দৌড় প্রতিযোগিতায় কচ্ছপের জেতার গল্প সকলে জানে ; কচ্ছপের মন্থরতা সম্পর্কে অভিযোগ সর্বজন অবিদিত । তবে এই উভয় চর টি এখন তার সম্পর্কিত সমস্ত অভিযোগ খণ্ডন করে সাঁ সাঁ করে সায়কের সামনে থেকে ডাঙ্গার দিকে ভেসে চলল । যাবার সময় সে যেন সায়কের কানে কানে বলে গেল ;
-সময়ের সাথে তাল-মিলিয়ে গতিশীল হয়েছি আমরা । বলতে পারো এটা আমাদের অভিযোজন ।
সায়ক বলে ;ধীরে কিন্তু দৃঢ়তার সাথে সে চলে । লম্বা দৌড় জিততে হলে দম সঞ্চয় করা খুব জরুরি ।
সায়ক যে অভ্রান্ত প্রমাণিত হল মাঝপথে কচ্ছপকে হাঁপিয়ে হাবুডুবু খেতে দেখে । লুকিয়ে পড়া লাল ক্যাঁকরা দের গর্তের পাশে সায়ক যখন পারে উঠে বালুকা তটে এক বুক নিঃশ্বাস নিয়ে বেশ কিছুটা সতেজ হয়ে উঠে সে দেশ দেখতে যাবার উপক্রম করছিল । কচ্ছপ টা পারে পৌঁছায় ।
সায়ক বলে ;
- জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই কিন্তু জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়ার ; তোমার আয়ু তিনশো বছরের কতকিছু শিখবে বলো দেখি ।
এমুহূর্তে সেই কচ্ছপ যে কি শিক্ষা পেল হাঁপিয়ে উঠে সে কিছুই বলতে পারলো না ; হা করে শুধু সমুদ্র পারের বাতাস নিতে থাকলো । তখনি একটা অতভূত বাঁশির সুর দূরে কোথায় বেজে উঠলো । সেই বাঁশির সুরের মূর্ছনায় মোহিত হয়ে শরীরের সমস্ত ক্লান্তি ভুলে সায়ক এগিয়ে চলল নতুন দেশের সুর সাগরের দিকে । সাগর য়ই বটে ; সমুদ্রের চড়ার বড় বাঁকটা পেরতেই বাঁশির সুরটা অসংখ্য বাদ্যযন্ত্রের কনসাটে রূপান্তরিত হয়ে উঠেছিল । যা সে আগে কোন দিন শোনেনি । সায়ক যখন বিচিত্র সুরের বাদ্য যন্ত্রের উৎস স্থলে গিয়ে পৌঁছল দেখল সে এক মহা মিলন সমারোহ । আমাদের দোতারা , বীণা , সন্তুর তো আছেই; সাথে আছে প্যরাগুয়ান বীণা , জাপানি কোটো ,ত্রিনিদাদের ইস্পাত চাটু ,চীনা ইয়ানজিকিন , অস্ট্রেলিয়ান ডিডজেরিডোও আর কতকি ।বিভিন্ন বর্ণের ; বিভিন্ন পোশাকের ; নানা রকম বাদ্যযন্ত্র ধারী একদল লোক ছোট ছোট গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে এই মিলন মেলায় তাদের ভাবের আদান প্রদান করছে সুরের মাধ্যমে । আনন্দের সুরে প্রত্যেকে নাচছে ; আবার করুন সুরে সকলে কেমন যেন গম্ভীর হয়ে উঠছে । বিষণ্ণতা হতাশার সুর কার কাছে আশার হতে পারে না । সায়ক এই প্রথম বুঝল একমাত্র সুরের একটা সার্বজনীন ভাষা আছে । যেমন চিত্র
দেখে আমার চিত্রকারের মনের ভাব বুঝি আমাদের সাথে চিত্রকারের মনের সংযোগ ও জারণে সংমিশ্রণ হয় । সঙ্গীতেও এ শক্তি বিদ্যমান । সঙ্গীতে যদি বিদেশী ভাষার ব্যাবহার থাকে আর আমরা যদি সে ভাষা নাও জানি এটুকু বুঝতে অসুবিধা হয় না সেটা আমার কোন ভাবকে জাগিয়ে তুলছে ভালবাসার না ঘৃণার । আসলে মানুষের কয়েক টি মৌলিক বৈশিষ্ট্য জাতি -ধর্ম-বর্ণ ; দেশ -কাল-পাত্র নির্বিশেষে এক । যেমন জাতীয়তা বোধ বা দেশপ্রেম । আর সেই বৈশিষ্ট্য গুলোই মনে অধিক আলোড়ন ঘটালে সুরের মূর্ছনায় তার বহি প্রকাশ ঘটে । সঙ্গীত হয়ে ওঠে সকলের । অতি বড় নিষ্ঠুর ব্যক্তিও গান শুনে কানে হাত চাপা দেয়না । সায়ক যখন সুরের মূর্ছনায় আপ্লুত হয়ে উঠেছিল সুযোগ পেয়ে বাঁশিওলা আবার বাজাতে শুরু করলে সমারোহের মাঝখানে সায়ক তাকে আবিষ্কার করে । কাঁধে তার ঝোলা ব্যাগ আর ব্যাগ ভর্তি বাঁশি । সায়কের মনে হল অমন বাঁশি তার যদি থাকতো হৃদয় মিলিয়ে পৃথিবীর সবার সাথে ইংরাজি , ফার্সি, আরবি না শিখেও ভাবের আদান প্রদান করতে পারতো অনায়াসে । নানা বর্ণের মানুষের ভিড় ঠেলে সায়ক যখন বাঁশি আলার দিকে এগিয়ে চলল সে তখন অন্য কোন সমারোহে প্রদীপ প্রজ্বলনের উদ্দেশ্যে চলল ।
সায়ক কে সে লক্ষও করল না ; ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল । ভিড় পেছনে ফেলে ছুটে সমুদ্র তটের আর কিছুটা এগিয়ে গেলে সায়ক আবার শুনতে পায় সেই বাঁশিওলার সুর । সায়ক ছুটে চলল দুই একবার সমুদ্র পাড়ের বালির ওপর পড়ে গেলেও সে থামল না । সমুদ্রের পাড়ের নতুন বাঁকটায় এসে দিগন্ত
বিস্তৃত পটে আর কাউকে দেখতে পেল না সে । সা সা করে বয়ে আসা দমকা হাওয়ায় সমুদ্রের গর্জনের সাথে একখণ্ড বাঁশির সুর তখনো লেগে । সুরটা যেন সায়ক কে কানে কানে অনন্তের পথের মোরে বাঁশিওলার ঠিকানা দেয় । সায়ক ঊর্ধ্বশ্বাসে ছোটে । আর একটা বাঁকের পর সে দূরে বাঁশিওলা কে দেখতে পায় ।
অনন্তের পথে আপনমনে বাঁশি বাজিয়ে পায়ে পায়ে এগিয়ে চলেছে সে ; কোন অচেনা রঙ্গের সন্ধানে অপর কোন অচেনা স্বপ্নরাজ্যে । সায়ক ছুটেগিয়ে যখন তার ঝোলা টেনে ধরল ;একটা বিভেদ , বৈষম্য, বিচ্ছিন্নতা হীন ব্যাপ্ত সুরের বাঁশির জন্য । সায়কের কক্ষচ্যুতি ঘটলো । মা রান্না ঘর থেকে এসে পটাস করে আটা মাখা হাতেই
স্কেলের বাড়ি বসাল সায়কের পিঠে । ডেক্সের ওপর থেকে চোখ মুছতে মুছতে মায়ের দিকে তাকিয়ে দেখল চক্ষু তার রক্ত বর্ণ ।
- হোম-ওয়ার্ক করতে বসলেই ঘুমপায় না । তারা তারি কমপ্লিট কর আমি রান্না সেড়ে এসে দেখবো । আবার আঁকা স্কুলে যেতে হবে । কাল পাড়ায় আঁকা প্রতিযোগিতা
আছে । গত বার যা এঁকেছিলি আমি কার কাছে মুখ দেখাতে পারি না ।

পরের দিন যেমন খুশি আঁক প্রতিযোগিতায় সায়ক মনে করেকরে তার স্বপ্নের ফেরি-ওলার ছবি আঁকতে আঁকতে সময় পেরিয়ে গেল । ছবি টি আর সম্পূর্ণ হল না ।
গত বছরের মতো এবার টুবলু প্রথম হওয়ায় তার মা বেস ভিজিয়ে ভিজিয়ে ছেলের গুণকীর্তন করলো । সায়কের মা মনমরা হয়ে বাড়ি ফিরে সায়ক কে আবার ঠেঙ্গাল ।
- গাধা টা তোর দারা কিছুই হবে না ।
সায়ক কাঁদতে কাঁদতে বললো ;
- হবে কী করে স্বপ্ন টা পুরপুরি দেখতে দিলে ।
আবার স্বপ্নের কথা শুনে সায়কের মা আর চোটে গেল । কান ধরে টানতে টানতে নিয়ে চলল বেডরুমে ;
- রাত দিন সুযোগ পেলেই শুধু ঘুম আর হাবি যাবি স্বপ্ন ।
সায়ক যন্ত্রনায় কাতরে উঠে বললো
- কান ছার লাগছে ; আজ পর্যন্ত আমার কোন স্বপ্নই তুমি পুর পুরি দেখতে দাওনি ।
সায়কের মা আর চেঁচিয়ে ওঠে ;
- তুই ক্লাসে ফাস্ট হবি ; আঁকায় distinction পাবি ; কম্পিউটারে তোর দখল থাকবে সকলের থেকে ভাল ; তোর সাথে জেনারেল নলেজে কেউ পরবে না । এ গুলো আমার
স্বপ্ন । আমার কোন স্বপ্ন টা তুই পুড়ন করছিস বল দেখি ?
সায়ক বিরক্ত হয়ে বলে ;
- তোমার স্বপ্ন তুমি দেখ ; আমার স্বপ্ন আমাকে দেখতে দাও ।
এবার সায়কের মা আরো রেগে গিয়ে তার পিটে কিল মারতে মারতে তাকে বেডরুমে আটকে দরজা বন্ধ করে দেয় ।
- আজ থেকে তোর খাওয়া দাওয়া সবকিছু বন্ধ ।

রাতে কাজ থেকে ফিরে বাবা সে ঘরের শিকল খুলে ঘরে ঢুকে দেখল সায়ক অঘোরে ঘুমিয়ে কি যেন বির বির করে । সায়কের আর কাছে গেলে সে পরিষ্কার শুনতে পেল
সায়ক বলছে ;
- ফেরি-ওলা তুমি তোমার বাঁশি বন্ধকরো এখান থেকে যাও । আমার মা তোমার সাথে আমায় দেখলে কষ্ট-পাবে । আমি মা কে কষ্ট দিতে চাইনা ।
সায়কের মা রাতের রান্না সেড়ে হন্তদন্ত হয়ে এসে বলে;
- ওকে ডেকে দাও । না খেয়ে শুলে আবার শরীর খারাপ করবে ।
সায়কের বাবা বলেন :
- আস্তে কথাবলো ; এক দিন না খেয়ে শুলে কিছুই হবে না l
সায়কের বাবার কাছে সায়কের ঘুমন্ত প্রলাপ শুনে সায়কের মার চক্ষু ভিজে যায় ।
রাতে বিছানায় শুয়ে সায়কের বাব যখন তার মায়ের কাছ থেকে সংসারের খুঁটি নাটি খবর নিচ্ছিল সে শোনে সায়কের আঁকা সেই ফেরি ওলার কথা গ্রামের বাড়ির রথের মেলায় এমনি একটা ফেরি-ওলার কাছথেকে সায়কের বাবা একটা আড় বাঁশি কিনেছিল শখকরে । বাঁশি বাজানোর তার ছিল খুব ইচ্ছে ; কিন্তু তার বাবা সায়কের ঠাকুর দা রাগ করতেন ; বলতেন '' শেষ মেষ যাত্রা দলে গিয়ে ভিড়বে । " তার আর বাঁশি বাজানো হয়নি । সে এখন সরকারি দপ্তরের ক্লার্ক । অথচ তার বাড়িতে এক সময় রবীন্দ্র নজরুলের ছড়াছড়ি ছিল । বাবা মহা মনবের উদাহরণ দিলে এদের কেই সামনে দাঁড় করাতেন । অথচ কোন দিনও বলেননি ; দুক্ষু-মিয়া যদি যাত্রাদলে বাঁশি বাজিয়ে কাজি নজরুল হতে পারে '' আমাগো পোলা বাজাইলে জাত জাইবো কেন ? '' অনেক রাত অব্ধি সায়কের বাবার আর ঘুম এলো না । বাল্য স্মৃতি সংরক্ষিত একটা টিনের বাক্সর মধ্যের
লাট্টু , লেত্তি , লাটাই , গুলি কতকিছু সে উলটে পালটে দেখে শেষমেশ তার সেই মেলায় কেনা আড় বাঁশিটা হাতে তুলে নিল ।

পরের দিন সকালে সায়কের বালিশের তলায় সায়ক আবিষ্কার করলো তার স্বপ্নের ফেরি-ওলার সেই বাঁশি । সেটা স্বপ্ন না সত্যি; বোঝার জন্য সায়ক নিজেকে চিমটি-কাটে ।

২০ জুল, ২০১৩

ছোটগল্প - অশোক কুমার লোধ

0 কমেন্টস্
সমর্পিতা
অশোক কুমার লোধ


নিন্ম-মধ্যবিত্ত পরিবারের মেধাবী ছাত্র সায়ন ।

অনেক না-পাওয়ার যন্ত্রণা সে মেনে নিয়েছিল অনায়াসে ।

ভালো ছাত্র হওয়া ছাড়াও বলার মতো গুন ছিল তার গানের গলা এবং তুমুল রসবোধ । অশিক্ষিত কন্থেও সুরের অভাব ছিল না কোনও । চরম অভাবের মাঝেও মুখের হাসিটি ছিল অমলিন । এই দুটি কারনেই তার সঙ্গ উপভোগ্য ছিল তার প্রায় সমস্ত বন্ধু এবং তাদের পরিবারের কাছেও ।

কৈশোর ও যৌবনের সন্ধিক্ষণে যখন উড়ু উড়ু ভাব তার প্রায় সমস্ত বন্ধু বান্ধবীদের , তখনও সে নির্বিকার ভালোবাসাবাসিতে । ওসব যেন ঠিক ওর জন্যে নয় ! আসলে , ঝালমুড়ি , ফুচকা , বাদাম ভাজা সহযোগে সিনেমা দেখার বা পার্কে বসার খরচও তো নেহাত কম নয় ! নিজের পড়ার খরচ জোগাতেই তাকে একগুচ্ছ প্রাইভেট পড়াতে হয় মাধ্যমিকের পর থেকেই ।

আগুনে যৌবনের একটা জ্বালা তো থাকেই , নারীর প্রতি আকর্ষণও স্বাভাবিক । তবুও তার বেলেল্লা প্রকাশ অদ্ভুত মনে হতো সায়নের । সমবয়েসি বন্ধু বান্ধবীদের সাথে এখানেই তার মস্ত অমিল । অমিল ভালো লাগার ক্ষেত্রেও । আদুরে ন্যাকামি সর্বস্ব সুন্দরী নয় , তাকে অনেক বেশী টানত পরিনত নারীর স্নিগ্ধ সৌন্দর্য ।

তেমনই একজন ছিলেন সায়নের খুবই কাছের এক বান্ধবী সমর্পিতার মা , সম্বোধনে কাকিমা । সেই কাকিমা , যে মাত্র ২৫ বছর বয়েসেই স্বামীহারা হয়ে জীবনের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন একমাত্র মেয়েকে সাথী করে । কাকিমার জন্য অদ্ভুত একটা কষ্ট হত , আর ভীষণ ভালো লাগতো নানা বিষয়ে কাকিমার সাথে আড্ডা দিতে , গান শোনাতে , কাকিমার হাতের চায়ের স্বাদটিও ছিল অপূর্ব ।

সমর্পিতার খুব অভিমান হতো , আলাদা ঘরে সায়নকে বারবার ডেকে নিতে চাইত পড়াশোনার আছিলায় । কাকিমাও বলতেন , “ যা , এবার তোরা পড়ার ঘরে যা । ’’

পড়ার ঘরে গেলেও সমর্পিতার চোখের ভাষা পড়ার সাধ সায়নের হয়নি কোনও দিনও ! মেয়েটি শেষমেশ অকপটে জানিয়েও ছিল তার ভালোবাসার কথা । সায়ন ভেবে দেখেছে অনেকবার , “ ইস্‌ , ও যদি কাকিমার মতো হ’তো !”

প্রায় ১৫ বছর পড়ে হঠাৎ দেখা সদ্য বিধবা সমর্পিতার সাথে , বিস্মিত সায়ন বলেই ফেললো , “ তোকে আজ ঠিক কাকিমার মতো স্নিগ্ধ লাগছে রে ! ’’

সমর্পিতার দুটি চোখ থেকে গড়িয়ে নেমে এলো আজন্ম সমর্পণ ।