ধারাবাহিক লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ধারাবাহিক লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

৩০ ডিসে, ২০১৩

ধারাবাহিক উপন্যাস - অলভ্য ঘোষ

0 কমেন্টস্
পর্ণমোচী
অলভ্য ঘোষ



(তিন)


মিতা আর রুমা হেঁটে-চলেছে । কলেজ থেকে বাড়ির এই পনের মিনিটের রাস্তা গল্প করতে করতে অতিক্রম করে তারা ।গল্পের বিষয়বস্তু সাংসারিক কিংবা পড়াশোনা সংক্রান্ত যাই হয়ে থাকনা কেন;এ জগতের আর দশটা মেয়ের মত তারা সিনেমার নায়ক নায়িকার কুষ্ঠী বিচার কিংবা কোন লাস্যময় ছেলের রূপে আসক্ত প্রেমাক্রান্ত বাক্যালাপ করেনা । এ গ্রহে বসবাস করেও তারা যেন ভিন গ্রহের জীব ।

এখন তাদের আলোচনার বিষয় পূর্বরাগ । চতুর্থ পিরিয়ডে কমপালসারি বাংলা ক্লাসে অধ্যাপিকা সাথীলেখা রায় চৌধুরী যখন পূর্বরাগের অতিরঞ্জিত ব্যাখ্যা দিয়ে ছাত্র ছাত্রীদের চিত্র জয় করছিলেন । মিতার মনে হয়েছে বড় বেশি মানব মানবির প্রেম কে তুলে ধরেছেন অধ্যাপিকা । দিদুনের মুখে চণ্ডীদাসের মুখস্থ কলি গুলোর সরল ব্যাখ্যাতে আজ পর্যন্ত দেহস্থ প্রেমের আভাস খুঁজে পায়নি মিতা । সেগুলো বারবার ভক্তি প্রেমের আধারে ভগবানের প্রতি প্রেমের ইঙ্গিত বহন করেছে ।

"রজকিনী-রূপ কিশোরী স্বরূপ কাম-গন্ধ নাহি তায়

রজকিনী প্রেম নিকষিত হেম বড়ুচন্ডীদাস গায় ।।"

রজকিনী রামী বাঁশুলি মন্দিরের দেবদাসী । প্রতিদিন সকালে জল তুলে মন্দির ঝাঁট দেয়; বিদ্যুতলতার মত তনুশ্রী অপূর্ব মুখাবয়ব

রজকিনীর। একদিন মন্দিরের ভোগ নিতে এসে চণ্ডীদাসের সাথে আলাপ হয় তার । নানুরের অদূরে তেহাই গ্রামে ছিল এই রজক তনয়ার বাস । চতুর্দশ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি ঊষাকালে অজয় নদের পাড়ে যজ্ঞিডুমুর গাছের তলায় নানুর গ্রামের মধ্যবয়স্ক পুরোহিত চণ্ডীদাস বুকে প্রেমনিয়ে বসে থাকতেন পিতৃ-মাতৃহীনা এই রামীণির জন্য । চণ্ডীদাসের আশ মেটেনা কিছুতেই এই রজকিনী রামীকে দেখে ।

এক এক সময় মিতার মনে হয় । আর জন্মে সে চণ্ডীদাসের রজকিনী ছিল । রুপম কি ছিল চণ্ডীদাস ? না ভাবনাটাকে পশ্রয় দেয়না মিতা ।

চণ্ডীদাস ছিলেন গ্রামের এক মন্দিরের পুরোহিত। গ্রামের এক নিচু জাতের অস্পৃশ্য মেয়েকে ভালোবেসে পা ধোয়া জল খেয়েছিল । পুরোহিত থেকে কবিতে পরিণত হয়েছিলেন চণ্ডীদাস ।

কখনো এই নারীমূর্তিকে তাঁর মনে হয় তাঁর বৈষ্ণব কাব্যের শ্রীরাধিকা আবার কখনো তাকে মনে হয় বাঁশুলি দেবীর প্রতিমূর্তি । একদিন রাতে স্বপ্ন দেখে তীব্র কাম-পিপাসা জাগে চণ্ডীদাসের শরীরে । সতীলক্ষ্মী স্ত্রী পদ্মজা মনের দুঃখে চলে গেছে তাকে ছেড়ে । একঘেয়ে নারী সঙ্গ বিবর্জিত জীবন কাটছিল চণ্ডীদাসের । কিন্তু তখন পূর্ণ যৌবন তাকে ছেড়ে যায়নি । স্বপ্নে চণ্ডীদাস একবার দেখেন রামী কে একবার দেখেন দেবী বাঁশুলির মুখাবয়ব । উথলপাথল মন । ভোর হতেই ঝাঁটা হাতে রামীণি আসে । রজকিনীর কাছে আসে চণ্ডীদাস। রামীর রাই-অঙ্গের ছটায় পুলকিত শ্যাম !দুহাত বাড়িয়ে রামীর বাহু ছুঁতে-গেলে কুণ্ঠিত,লজ্জিত রজকিনী দূরে সড়ে যায় ।

-কি করছেন গোঁসাই?

বাঁশুলি দেবীর বেদী স্পর্শের,দেবী-বিগ্রহকে ছোবার,ভোগ নিবেদন করার মন্দিরের সব অধিকার চণ্ডীদাস সফেদিতে চায় পরাজিত সৈনিকের মত নিচু জাতের মেয়ে রামীণিকে ।পাড়ার লোকে যদি একঘরে করে দেয় চণ্ডীদাসকে !দিক । জনঅরণ্যে একা বাঁচার চাইতে অরণ্যে প্রিয় সখ্যতায় বাঁচা অধিক শ্রেয় ।

রুপম ও কি ভালবাসার আগুনে পুরে এই ভেদবমির শ্রেণী বৈষম্য ময় সমাজ টাতে সত্য সুন্দরের প্রাকৃতিক তাড়নায় আজকের চণ্ডীদাস হতে চাইছে । মিতা যত ভাবে প্রশ্রয় দেবেনা ;মিতার ভাবনার জমিন ফুঁড়ে স্থানে অস্থানে ম্যানগোভ অরণ্যের মত মাথা উচুকরে দাঁড়ায় রুপম ।

মিতার মনে হয় রামীণি কি পড়েছিল দোটানায় !পুরুষের চোখে যে কামের আগুন জ্বলে প্রকৃত ভালোবাসা তা নয় । কেবল শরীরের আকর্ষণ । শরীর ফুরলে ভালবাসাও ফুরায় ।

রুমা বলে;
- "এখন কার চন্ডীদাসেদের এখন আর বার বছর ছিপ ফেলে বসে থাকার ধৈর্য নেই ।পাখি উড়ে-যাবে । একটা নয় ভিন্ন ভিন্ন ঘাটে একসাথে ছিপ ফেলে । আর রজকিনীরাও হাজার ঘাটে ঘুরে টোপ গেলে যখন তখন। গেলার সময় ও ভাবে না;ভাবে না উগরোবার ও সময়। দুই তিন মাস প্রেম টিকলে সেঞ্চুরি । টেস্ট-পালটে গেছে টেস্ট-ম্যাচ উঠে-গেছে;সবাই টোয়েনটি টোয়েনটি খেলছে । "

মিতা বলে:
- "আসলে এখন মাল্টিটাস্কিং,মাল্টিথ্রেডিং এর যুগ। তাল মিলায়ে না চলতে পারলে লোকে লজ্জা পায়। "

রুমা পারেনা মিতার অনেক কথা বুঝতে;তাদের দুজনার আলোচনায় অনেক সময় এঁটে ওঠেনা রুমা । হটাৎ উলটো ফুটপাতে চোখে পড়লো রুপম কে । ওপারের ফুটপাত থেকে তাদের ফলো করছে সে । রাস্তার লোকজন গাড়ি ঘোড়া কোন কিছুতেই তার ভ্রুক্ষেপ নেই । রুমা ফিস ফিস করে কথাটা কানে তোলে মিতার ।

মিতা আড় চোখে দেখে রুপম কে । রুপমের চোখ দুটো এখন করুন ভাবে বর্ষার অপেক্ষমাণ চাতকের মত তাকিয়ে আছে মিতার দিকে । সব টাই কি নাটক !মিতা তলিয়ে দেখেনা ।

মেনরাস্তা ফেলে রুমা আর মিতা প্রবেশ করে পাড়ার গলি রাস্তায় । ছেলেটা এখনো অনুসরণ করে-চলেছে তাদের ।

-"নতুন কোন বদ মতলব আঁটে-নিতো । পাড়া পর্যন্ত চলে এলো বাড়ি টা চিনতে চাইছে বোধয় ।"

-"সব সময় মানুষ কে সন্দেহের চোখে দেখাটা ঠিকনয় মিতা ।"

-"সন্দেহভাজন হলে তাকে সন্দেহ না করাটা বুদ্ধিমানের কাজ নয় ;এরা সবপারে ..."

-"বিশ্বাস,ভালবাসা এ গুলো কি শুধুই কেতাবি..."

-"টি ভি খুব দেখছিস মনে-হচ্ছে । সিনেমা না সিরিয়ালের ডায়লগ এটা ।জীবন টা সিনেমা নয়;নায়ক নায়িকার দেখাহল অমনি প্রেমে পড়ে গেল ;যেন প্রেমে পড়বে বলেই পা বাড়িয়েছিল ;পরিচালক সুযোগ করে দিলেন । তারপর ধেই ধেই করে নাচো । সিনেমা তিন ঘণ্টার বেশি হয় না । জীবন কয়েক কোটি ঘণ্টার ; মামুলি কিছু ভুলের জন্য এতটা সময় নষ্ট-করবো কেন । চানাচুর ভাজা খেতে খেতে প্রেমে পড়লে চানাচুর শেষ হলে ঢোঙা টাই পড়ে থাকবে ; প্রেম থাকবে না । আমাকে যদি রুপম ভালবাসে;কেন ভালবাসল ?"

-"সব কেনর কোন উত্তর হয়না মিতা । আমি একটা মেয়ে ছেলেদের চোখের ভাষা বোঝার ক্ষমতা আমার আছে ।"

-"পাঁচ-মিনিটের জন্যেও যার সাথে আমার কোনদিনও কথা হয়নি;আমার ভালমন্দ কোনকিছুয়ই হদিস যে জানেনা । কয়েক দিনের চোখের দেখায় ভাল লাগতে পারে ;ভালবাসা জন্মাতে পারেনা ।Love at first Sight হতেই পারেনা । এক নজরেই ভালো লাগা শারীরিক।এখানে আবেগের চেয়ে শারীরিক আকর্ষণ বেশি কাজ করে। ভালবাসা লাউ কুমড়ো গাছ নয় পুঁতলাম আর ফল ফলল । সত্যিকার ভালবাসা বটবৃক্ষের মত যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকে উৎসের সন্ধান হারিয়ে যায় উৎসেচকে । তাছাড়া আমার একটা ভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান আছে যা কোন দিনও রুপম দের সাথে মিশ খেতে পারেনা ।"

-"ভালবাসা এত হিসেব নিকেশ করে হয় নাকি !"

-"তোর ফিল্মে হয় না ।"

-" বাস্তবে অহরহ তাই হয় । আকাশের মেঘ পথের ধুলোর সাথে লুকোচুরি খেলতে পারে কিন্তু কখনো আকাশ ছেড়ে নেমে আসেনা পথের ধুলয় ।"

-"কে বলেছে নেমে আসেনা ;তুই শুধু চিনতে পারিস নি মিতা । আকাশে মেঘ জমতে জমতে বৃষ্টি হয়ে নেমে আসে ধুলোর বুকে । ধুলকি তখন পারে বৃষ্টিতে না ভিজে থাকতে ।"

পূর্বরাগের পূর্বানুভূতি এখন মনে-হচ্ছে মিতার চাইতে রুমার অবগত হয়েছে ভাল ।রুমার কাছে পরাভব টা ধরা পরে-গেল মিতার ছলছলে চোখ দুটতে । আর একটাও কথা না বাড়িয়ে সে বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়লো । আজ প্রথম রুমার কাছে মিতার পরাজয় ; অন্তঃকরণে হয়ত এ হার টাই চাইছিল সে নিজে ।

রাত বারটা আলো নিভান । বারান্দার ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে বসে রুপম । ভবানিপুরের বারে আজ বন্ধুদের ছাড়াই গিয়েছিল সে। মথাটা এখনো চিনচিন করছে তার । গভীর নিস্তব্ধতাকে বার বার ভেঙে চলা দেওয়াল ঘড়ির টিকটিক আওয়াজটা মাথার ভেতর যেন দুরমুশ পেটাচ্ছে রুপমের । দিনের বেলা ওটার অস্তিত্ব টের পাওয়া যায় না রাত যত বারে ঘড়িটার বাহাদুরি বারে ততো। মাথার চুলগুলো দুই হাতে মুঠো করে ধরে সে । তার ইচ্ছে করে ওগুলো উপরিয়ে ফেলতে। এই ইট কাট লোহালক্কড়ের পৃথিবীতে নিজেকে ভীষণ অসহায় মনে হচ্ছে ;একা মনে হচ্ছে তার ।

সহসা গাড়ীর আওয়াজ ঘড়ির আওয়াজ ঢেকে রুপমের মাথার ভেতর যেন শেল হানলো । কান দুটোকে দুইহাতে মুঠো করে ধরেও কিছুতেই যখন রুখতে পারল না শব্দ ব্রহ্ম । ইজিচেয়ার ছেড়ে রুপম উঠে দাঁড়ালো গাড়ীর হেডলাইট সার্চ লাইটের মতো তার মুখের ওপর থেকে দেওয়ালে মিলিয়ে যাবার পূর্বে ;তিক্ত বিরক্তিতায় কি করবে কিছু ভেবে না পেয়ে সব রাগ উগরে দেয় সময়ের ওপর । দেওয়াল থেকে ঘড়িটা নামিয়ে বারান্দা থেকে বাইরে ছুড়ে ফেলেদেয় রুপম । কাঁচ ভাঙ্গার ঝনঝনানি আওয়াজের সাথে গাড়ীর ঘরঘরানি বন্ধ হয় ;নেভে হেট লাইট। দরজাটা সজোরে খোলে ; দু জোড়া পা শব্দ করে ছুটে আসে রুপমের দিকে । সুইজ কট করে অন্ হতেই সমস্ত ঘরটা আলোকিত হয়ে ওঠে ।

-" What's happened !"

কথাটা বলতে বলতে পেছন থেকে রুপমের গলা জড়িয়ে ধরে তার মাম । মামের perfume এর ঝাঁজাল গন্ধটা নাকে যেতেই রুপমের সমস্ত গা টা গুলিয়ে ওঠে । মামের হাতটা গলা থেকে ছাড়িয়ে বারান্দার রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়ায় রুপম ।

প্রণব এতক্ষণ কাঁধে ঝোলান কোটটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়েছিল সুইজ বোডের সামনে । কোটটা সোফার ওপর ছুড়ে ফেলে;বে-সামাল পায়ে ধপ করে বসে পড়ে সোফায় । ম্যাক-ডেলের গন্ধে সমস্ত ঘর টা রি রি করে ওঠে ।

-"তুমি রাগ করেছ রুপ।আমরা তোমার জন্য কিন্তু অনেকক্ষণ ওয়েট করেছিলাম । সেল টা সুইচ অফ করে রেখেছিলে কেন । কতবার ট্রাই করলাম....."

মাম ইজিচেয়ার টা ধরে দাঁড়িয়েছিল । আবার এগিয়ে আসে রুপমের কাছে ।

-"আমি ভেবেছিলাম তুমি পরে যাবে;রামঅবতার কে দিয়ে গাড়ী বাড়ি তেও পাঠিয়ে ছিলাম । রাই তোমার জন্য অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর কেক কাটে । "

-"সুইট গাল্ । দারুণ দেখতে হয়েছে মেয়েটাকে । "

প্রণব দুইহাতে মাথার ওপর তুলে হাই তুলতে তুলতে বলে ফেলে কথাগুলো ।

রুপের কাঁধে হাত রাখে মাম ।

-"আমার ছেলেও কমকিসে ।"

আবার কিছুটা দূরে সোরে যায় রুপম ।

-"Mom ; please leave me alone."

চোখ কপালে ওঠে তনুশ্রীর । হতাশ ভাবে ঘুরে তাকায় প্রণবের দিকে । হাত তুলে ইশারায় তনুশ্রীকে শান্ত হতে বলে ;সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় সে । মুখের মালবোরা সিগারেট থেকে ফুর ফুর করে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে হাতের লাইটার টা সোফার সামনের টেবিলে ছুঁড়ে রাখে প্রণব । এটা তার একটা অভ্যাস।প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে সে আর কোনকিছুর মূল্য-দেয় না । আবার প্রয়োজনে খোঁজে ।

-"মিস্টার সেন-গুপ্ত আজ প্রকাশ্য পাটিতে অ্যানাউন্স করে বসলো রাই এর সাথে তোমার অ্যানগেজম্যান্টের কথাটা । প্রপোজালটা অবশ্য অনেক আগেই আমি প্রপোজ করেছিলাম । "

-"engagement!"

তনুশ্রী তার চড়া মেকআপ স্বত্বেও বিবর্ণ মুখে একটা চেষ্টা-কৃত হাসি ধরে রেখে প্রণবের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।

-"ভেবেছিলাম আমরা তোমায় সারপ্রাইজ দেব ।"

-"What stupid thinking.প্রতিটা সম্পর্ক তোমাদের কাছে খেলনা না !"

ছেলের এইরকম বিরূপ মন্তব্যে মা বাপের মুখের যেমন জ্যামিতিক অভিব্যক্তি হওয়া সম্ভব ঠিক তেমন কিছু প্রণব তনুশ্রীর মুখে প্রকাশ পেল না । মনে মনে তারা যেন এমন প্রলাপের আসংখ্যা করে বসে আছেন । প্রতিষেধকের আয়োজন করতে চাইছেন রুপমের জন্য । টেবিলের অ্যাস ট্রেতে অবাঞ্ছিত সিগারেটের ছাইটা অবহেলায় ঝাড়তে-গিয়ে মেঝেয় পড়ে যায়; পাখার হাওযায় সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়ে ঘর নোংরা করে।অন্য সময় তনুশ্রী খেঁচ খেঁচ করে নোংরা বলে প্রণব কে । এখন পাকেচক্রে ভগবান ভূত । প্রণব মুখ খোলে ।

-"ছোট থেকে রাই এর সাথে তোমার ঘনিষ্ঠতা একে অপরকে খুব ভাল করে চেন-জান,পছন্দকর ।"

-"রাই এর সাথে সম্পর্কটা নিছক বন্ধুত্বের । আমি এর অতিরিক্ত কিছু কোনদিন ভাবিওনি ভাবতেও পারবো না ।"

তনুশ্রীর ধৈর্যর বাঁধ ভাঙছিল;

-"জানতে পারি রাই এর মধ্যে কমতি কি আছে ।She is sophisticated girl."

-"মাম আমার জীবন টা বাজার নয় মাপজোপ করে সম্পর্ক...."

তনুশ্রী থামিয়ে দেয় রুপমকে ।

-"Vagabond দের মত কথা বোলনা রুপ ।"

উত্তপ্ত পরিবেশে প্রণব জলপট্টি দেবার চেষ্টা করে ।

-"দেখ রুপ মিস্টার সেন-গুপ্ত আমাদের কোম্পানির ফিপটি পার-সেন্ট শেয়ার হোল্ডার ।এরকম কত কোম্পানি যে ওনার হাতের মুঠয় তার হিসেব নেই । ওনাদের সাথে আত্মীয়তা হলে তোমার স্ট্যাটাস কমে-যাবে না রুপ;বাড়বে । রাই একমাত্র সন্তান মিস্টার সেন-গুপ্তর অবর্তমানে ধরে নিতে পার সমস্ত প্রপাটি তোমার ।"

-"জীবন টাকি Algebra এক্স ধরে মিলিয়ে নেব । আমার জীবন টা নিয়ে প্লিজ বিজনেস করনা ডেড । প্রপাটির সাথে বিয়ে করার কোন রকম ইন্টারেস্ট আমার নেই । আর যদি স্ট্যাটাস এর কথাই বল আমার জানতে ইচ্ছেকরে মামকে বিয়ে করার পর তোমার স্ট্যাটাস কতটা বেড়েছে ।"

তনুশ্রীর মেকআপ করা লাবণ্য ময় মুখ খানাতে ; রুক্ষতার বাতাবরণ ছেয়ে বসেছিল অনেকক্ষণ । এবার তার ফরসা গাল দুটো লাল হয়ে উঠলো । রুপম যেন সপাটে থাপ্পড় বসিয়ে দিয়েছে তার গালে । রুপমের ঔধত্ব তনুশ্রীর ধৈর্যর সীমা লঙ্ঘন করায় রাগে অপমানে থর থর করে কাঁপছিল তনুশ্রী । ভুরু কুচকে চোখ দুটো কপালে তুলে বলে;

-"তোমার ইন্টারেস্ট কোথায় ;কলেজের ঐ গাঁইয়া মেয়েটার ওপর ?সে তো তোমাকে পাত্তাই দেয়না ।"

-"ও তোমরা তাহলে সবি-জান ।"

তনুশ্রী ঝংকার দিয়ে ওঠে;

-"এও জানি সকলের সামনে ওর হাতে তুমি থাপ্পড় খেয়েছ । কলেজ থেকে তোমাকে ঘার ধাক্কা-দিয়ে বার করে দেওয়া হয়েছে । তোমার জন্য আমাদের মাথা ধুলয় মিশে-যাচ্ছে । "

রুপমের চোখ থেকে কয়েক ফোটা জল গড়িয়ে পড়ে । কিছুক্ষণ মাথানিচু করে থাকার পর আস্তে আস্তে মাথা তোলে সে।

-"Mom try to understand me ."

-"তোমার বলতে লজ্জা করছেনা রুপ । আমাদের বাড়ির চাকরেরও একটা সম্মান আছে । ওই বস্তির below standard মেয়েটা কোন ভাবেই এ বাড়ির যোগ্য নয় । "

রুপম বাইরের দিকে তাকাল । দিনের আলোয় ঝকঝকে প্রাণবন্ত লম্বা ইউক্যালিপটাস গাছ গুলকে এখন এক একটা কালো বৃহৎ আকার ডায়নোসারের মত দেখাচ্ছে । তার তলায় ছোট ইউক্যালিপটাস চারা গুলো যেন ডায়নোসারের বাচ্চা । জুরাসিক যুগ অতিক্রম করে এ যুগের মাটি স্পর্শ করেছে । রুপমের মনে হয় এ বাড়ির বাহ্যিক গম্ভীরতা তাকে গোগ্রাসে গিলে খেতে আসছে ।

মায়ের কথার জের টেনে আবার মুখ খোলে রুপম ।

-"একবার ভেবে দেখেছ মাম তোমার যোগ্যতা কতটা । রুপমের যোগ্য মা হয়ে উঠতে কোনদিন তুমি পেরেছ কিনা । পাটি,স্ট্যাটাস,ক্লাব,সোসাইটি ছোটবেলা-দিয়ে কথাগুলো শুনতে শুনতে কান পচে গেল । আয়া মার হাতে আমাকে দিয়ে তুমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা দিনের পরদিন বাড়ির বাইরে কাটিয়েছ ।

কোন কোন দিন রাতে ফিরে জ্বর ছেলের মাথায় হাত রেখে আয়া-মাকে জিঞ্জেস করেছ টনিক টা ওকে খাইয়ে ছিলে । দেখেছ জ্বরটা কত ? তার পর হয়তো তোমার ভালবাসার প্রাপ্তি স্বরূপ ঘুমতে যাবার আগে এক গালে কিস্ করেছ । কত দিন তোমার কাছে ঘুমতে চেয়েছি তুমি বলেছ কাল ঘুমিও আজ আমি ভীষণ টায়াট ;কাল আর ফিরে আসত না । আমরা বেড়াতে গেলেও তোমায় সম্পূর্ণ ভাবে পেতাম না । আমি থাকতাম আয়া মায়ের ঘরে । জান মাম জ্বরে কাঁতরে ঘুম ভেঙ্গে যাওয়া রাত গুলতে ;আমি যখন স্নেহ খুঁজতাম আশ্রয় খুঁজতাম আমার মুখের সামনে ভেসে উঠতো পয়সা দিয়ে কেনা আমার আয়া মায়ের ঘুমে ঢুলু ঢুলু চোখ দুটো ।"

তনুশ্রী চিৎকার করে ওঠে ।

-"What do you mean ?"

-"আমি আর নতুন করে এই ভালবাসা চাইছিনা মাম । মিতা আমাকে রিফিউজ করার পর বুঝেছি তোমাদের থেকে শেখা ভালবাসা কতটা পোশাকি Formal। Hi; Hello; Bye বললেই

তোমাদের ভালবাসা ; তোমাদের আবেগ উচ্ছ্বাস সম্পর্ক সব কিছু শেষ হয়ে যায় । সোজা সস্তা । রাই খুব ভাল মেয়ে । But she is also part of the damned culture and society. ভালবাসি বলে ওকে আমি ঠকাতে পারবো না ।I hate this culture , society , love & relation ."

কথাগুলো বলা শেষ হতেই রুপ তার বেড রুমে ঢুকে সজোরে দরজা বন্ধকরে দেয় । প্রণব অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে শুন ছিল মা ছেলের ঝগড়া । সে রুপমের দরজার কাছে এগিয়ে যায় ।

-"রুপ....রুপ....শোন.....দরজা খোল । তুমি ডিনার করেছো । "

দরজার ওপাড় থেকে কোন উত্তর আসেনা ।

প্রণবের বুকে মুখ গুজে রুপমের ধারালো কথা গুলোর হৃদয় অনুরণনে কেঁদে ওঠে তনুশ্রী । প্রণব সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করে।

-"Upset হয়ে পড় না;সব ঠিক হয়ে যাবে ।"

(চলবে)

২৯ অক্টো, ২০১৩

ধারাবাহিক উপন্যাস - অলভ্য ঘোষ

0 কমেন্টস্
পর্ণমোচী
অলভ্য ঘোষ



প্রথম পর্বের পর……..


কামাল কে ধাক্কা মেরে দু পা পেছনে সড়ে দাঁড়িয়ে ছিল মালতী । -"হাতে চুড়ি পড়ো গে । পুরুষ হয়ে জন্মেছো একটা মাইয়া মানষের রক্ষা করনের ক্ষমতা নাই । তবে জেনেরাই-খ তোমারে নাপাইলে আমি বিষ খাব । "

কামালকে ঝাঁকিয়ে কামালের শত-ছিদ্র জামাটা মুঠ থেকে মুক্ত করে কাঁদতে কাঁদতে দ্রুতগতিতে ছুটে পালিয়ে ছিল মালতী। পেছনে পুকুর ঘাটে পড়েছিল মালতীর কৈশোর;কামাল আর তার গ্রাম । দিনের শেষে সন্ধে রাতের অন্ধকারের আধিপত্য বিস্তার করে বসছিল তিলে তিলে ।

সানাই এর সুর তখনো অনুরণিত হয়ে চলেছিল মালতীর কর্ণ গহ্বরে । দুই হাতে কান চেপে অভিজাত বনেদি একটি গৃহের সুসজ্জিত ফুলাচ্ছাদিত বিছানার এক পাশে বসেছিল মালতী । পরনে লাল বেনারসি । চোখ দুটো অশ্রু প্লাবনে ফোলা । দরজার কপাটের আঘাত হল । বাইরে থেকে প্রায় ধাক্কা খেয়েই ঘরে প্রবেশ করেছিল বিপিন । বিপিন মালতীর বর । একদিন আগে সবে এদের নব দাম্পত্য জীবনের শুভ সূচনা হয়েছে । সোহাগ রাত ;মালতী সঙ্কুচিত । সে কামালের কথা ভাবছিল । হটাৎ তার ভাবনার প্লাবন ভেঙে হয়েছিল বিপিনের সে ঘরে প্রবেশ ; দরজায় খিলের আওয়াজ টা বুকে বেজেছিল বাজ পড়ার মত। মালতীর বুক ধড়পড় করছিল । তার খুব কাছে এসে বসেছিল বিপিন । বিপিন যত চাইছিল দূরত্ব কমাতে । মালতীর ততো ইচ্ছে করছিল মৃত্যু তার সহসা উপস্থিত হোক । এক মাত্র মৃত্যুই কার নিমন্ত্রণ রক্ষা করে না । আত্মহনন করতে গেলেও মানুষ ব্যর্থ হয় । যদি মৃত্যু না স্বেচ্ছায় হননকে উপসর্গ করে আসে । বিপিনের হাতে অপসারিত ঘোমটার আড়ালে মালতীর লক্ষ্মী মূর্তির মত মুখ খানা উন্মোচিত হতেই ; মালতীর সারা শরীর কেঁপে উঠেছিল ;হাতের মুঠো আলগা হয়ে সবুজ তুঁতের ডেলাটা খসে পড়েছিল বিছানায় । মালতী চোখ বুজে নিলে রাঙ্গা ঠোঁট দুটো তার আড়ষ্ট হয়ে উঠেছিল ভয়ে । শিকারির করপুটে বন্দি কবুতরের মত তার বুক ধড়পড় করছিল তখনো ।

-"আমারে দেইখো ।" প্রথমটা লজ্জা পেলেও ;প্রস্ফুটিত কুড়ির মত চোখ মেলে তাকাতে হয়েছিল মালতীকে । কৃষ্ণবর্ণ বছর পঁচিশের বলিষ্ঠ যুবক বিপিন সোহাগ রাতের প্রেমালাপের বাইরে বেড়িয়ে ছোট্ট মেয়ে মালতীকে সংসারে তার অবশ্য পালনীয় কর্তব্য গুলো সম্পর্কে মাস্টারের মত জ্ঞান দিয়ে চলেছিল। আর কোনে বৌ মালতী বাধ্য ছাত্রের মত মাথা নেড়ে সায় দিতে দিতে এক সময় ঘুমে ঢুলছিল । গার্হস্থ্য জীবনের মালতী তখন কিছুই বোঝে না । বোঝার কথাও না । তবে এটুকু বুঝেছিল তার স্বামী বাবাজীবনটি কামালদার মত গোবেচারা নয় রাশভারী গম্ভীর ।বাবা মায়ের কনিষ্ঠ পুত্র বিপিন । সে চাইছিল যে সুখ,স্বাচ্ছন্দ্য,সেবা তার বাবা মা তাদের পুত্রবধূর কাছে প্রত্যাশা করে বসে আছেন তা থেকে যেন বঞ্চিত না হন । সংসারের নিয়ম কানুন ;নীলের বাতি,শিবরাত্রি, বিপদ তারিণী একের পর এক শৃঙ্খলে সেদিন থেকেই আবদ্ধ হয়েছিল মালতী । লক্ষ্মী ; লক্ষ্মী প্রতিমা । কুমোরপাড়ায় অর্ডার দিয়ে যেমন টি মনগড়া মেলে । মালতীকে ঠিক তেমনটি হতে হয়েছিল । পান থেকে চুন খসলেই ছিল শাশুড়ির মুখ ঝামটা । রাতে তার লোকটা আদর করতো খুব ;ঘাসের গায়ে ভোরের শিশির যেমন সূর্যের প্রকটতায় উবে যায় তেমনি কামালের প্রেম উবে যাচ্ছিল মালতীর জীবনে বিপিনের উষ্ণতায়।

সমস্ত ঘরটা অন্ধকার । ঘর ঠিক বলা যায় না ঝুপড়ি । চেঁচাড়ি,বাঁকারি,টিন,টালি,ইট বহুবিধ উপকরণের সমন্বয়ে নির্মিত মাথা ছাওয়ার জায়গা । একটা ছোট্ট তক্তপোশ ,কয়েকটা বড় বড় পুটলি ,একটা টিনের বাক্স ,দেওয়ালে ঝুলানো ক্যালেন্ডার ,ঘরের এক কোনে রাখা কালো পোড়া মাটির ছোট্ট একটা খাবার জলের কুঁজো । ঘরে আসবাবপত্র কম হলেও সব কিছু বেশ পরিকল্পনা মাফিক রাখাছিল ।শিশু কন্যা সহ মালতী ঘুমচ্ছিল তক্ত পোষের ওপর । কোয়া বিন্যস্ত কাঁঠালের গন্ধে মাছি যেমন ভনভন করতে করতে ছুটে আসে ;তেমনি ফিসফিস কথোপকথনে ;ক্যাঁচ ক্যাঁচ আওয়াজে পিচের ড্রামের তৈরি বন্ধ দরজা ফাঁক করে ;মোমবাতি হাতে অন্ধকার ঘরে প্রবেশ করেছিল স্ফীত কায় মাঝ বয়সী এক ভদ্রমহিলা সহ গিলেকরা পাঞ্জাবী পরিহিত এক বাবু গোচের ভদ্রলোক । মেয়ের গায়ের ওপর থেকে মালতীর অবশ হাত সরিয়ে ঘুমাচ্ছন্ন তার মেয়েকে মোমবাতি মাঝেতে রেখে ঝুঁকে পোড়ে কোলে তুলে নিয়েছিল মাঝবয়সী ভদ্রমহিলা । মালতী বিন্দু মাত্র বুঝতে না পেরে পাশ ফিরে শুয়েছিল । আঁচল টা বুক থেকে খসে পড়ায় রংচংয়ে গাজনের সং এর মতো বাবুটি একদৃষ্টি সে দিকে বিষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল । বাচ্চা কোলে সেদিকে তাকিয়ে গলা খাঁকড়ানি দিয়ে স্ফীত মহিলা টি বলেছিল; -"কই টাহাটা দাও দেখি । " লোকটা গেঁটের থেকে টাকা বাড় করেদিলে ;ভদ্রমহিলাটি অদ্ভুত এক নিপুণ ভঙ্গিতে বাচ্চা কোলে টাকা গুনে কমতি অনুভব করায় আর দশ টাকা বকশিস না ঘর ভাড়া দাবি করেছিল। মুখের সামনে কাবাব ; বাবুটি দরাদরিতে না গিয়ে আর দশ টাকা বারকরে দিলে ;তুষ্ট হয়ে টাকা আঁচলে বেঁধে মেঝে থেকে মোমবাতি টা তুলে বাচ্চা কোলে ঘরের বাইরে বেড়িয়ে গিয়েছিল মহিলা টি । বিছানার ওপর ছিল শিকার । টিনের দরজায় ছিটকানি এঁটে বাবুটি ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ক্ষুধার্ত হায়েনার মত মালতীর ওপরে । ঘুম ভাঙ্গা মালতী অন্ধকারে কিছু বুঝে ওঠার আগেই লোকটা ছোবল মারতে শুরু করেছিল । ঘন নিশ্বাসের আওয়াজের সাথে তক্তপোষের ক্যাচ ক্যাচ ভেঙ্গে পড়ার সঙ্গত যখন ঘরের নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করেছিল বাবুটির গ্রাস থেকে নিজেকে মুক্ত করতে বাবুর শরীরের কোন নরম স্থানে কামর বসিয়ে দিয়েছিল মালতী ।

অর্ধ অবচেতন ;অনাবৃত বস্ত্র,এলোমেলো চুল,রক্তাক্ত শরীর মালতী হেঁটে চলেছিল নিস্তব্ধ গ্যাস পোস্টের আলোছায়া ঘন বড় রাস্তা ধরে । দিশেহারা !কোথায় কোনদিকে কেন হাঁটছে কিছুই বুঝে উঠতে পারছিল না মালতী । সহসা একরাশি আলো তার মুখ স্পর্শকরে ;মালতী মাথা ঘুরে লুটিয়ে পড়েছিল রাস্তায় । একটা মোটর কার সবেগে ব্রেক চেপে দাঁড়িয়ে ছিল তার সামনে । কার থেকে নেমে এসেছিল এক বয়স্ক ভদ্রলোক চোখে চশমা,মুখে কাঁচা পাকা এক রাশ দাঁড়ি । -"কে মা তুমি ?" লোকটা মালতীর বাঁ হাত তুলে হৃদস্পন্দন খুঁজেছিল । মারা যায় নি মালতী তখন জ্ঞানশূন্য । জনশূন্য রাতের রাস্তায় লোকের অনুসন্ধান করে ব্যর্থ হলে উপায়ন্তর না দেখে ভদ্রলোক মালতী কে চাগিয়ে তুলেছিল নিজের মোটরে ।

ভোরের আলো সবে মাত্র ফুটেছিল । রাতের বড় রাস্তার মোটর গাড়ী টা এসে থেমেছিল কালীঘাটের এক বস্তি পাড়ার মুখে। কার থেকে সেই বুড় ভদ্রলোকটির সাথে নেমে দাঁড়িয়ে ছিল মালতী । চোখ মুখ তখনো উসকো খুসকো কেবল পোশাকের পরিবর্তন হয়েছিল তার । গায়ে ছিল একটা দামী শাড়ি । যা কেনার ক্ষমতা তার ছিলনা; ভাবার ও অবকাশ ছিলনা সেটা তাকে মানাচ্ছে কিনা । মালতীর সাথের ভদ্রলোক চারিদিকে চেয়ে বুঝে গিয়েছিল যে আচরণ মালতীর ওপর করা হয়েছিল তা সে পাড়ায় ছিল খুবই স্বাভাবিক । নিষিদ্ধ পল্লীটির আনাচে কানাচে সেই সকালেও কয়েকটা মেয়ে তীর্থের কাকের মত ছিল দাঁড়িয়ে । রাস্তার কলে স্নান করা অর্ধ-নগ্ন পুরুষদের ভিড়ে কোন কোন মেয়ে মুখে দাঁতন নিয়ে অপেক্ষা করছিল মুখ ধোবার জন্য । মালতী আগে আগেই যাচ্ছিল । তার পেছনের বাবুটির দিকে দেখছিল সকলে । একটা ঝুপড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়ে পরেছিল মালতী । বালতি হাতে মেদপূর্ন বেঁটে গোছের গত দিনের রাতের দালাল মহিলাটি এগিয়ে এলে মালতী বলেছিল ; -"আমার পোলাপান কই ।"

মালতীর সাথের ভদ্রলোকটির দিকে রহস্যপূর্ণ ভাবে তাকিয়ে মহিলাটি জিজ্ঞেস করেছিল ।

-"ইনি কেডা । বাবু নাকি ?" –

- "আমি ডক্টর চিন্তামণি সরকার । আপনি নিশ্চয়ই মেঘমায়া দেবী ?" –

"আপনার চিন্তে ভুল হয় নাই চিন্তামণি বাবু । তবে আপনার সঙ্গের মাইয়াটারে কতটা চেনেন ?" -"কাল রাতে একটা পেসেন্ট দেখে ফেরার পথে এই মেয়েটা আমার গাড়ীর সামনে পড়ে ;প্রথমটা আন্দাজ করেছিলাম পরে ওর কাছ থেকে বুঝেছি ওর ওপর নির্যাতন করা হয়েছে । "

মালতীর চিবুক বেয়ে চোখের জল গড়িয়ে পড়েছিল । কত মেয়ের অশ্রু রাশিতে সিক্ত এ পাড়া তার খবর কোন দিনই জানতে পারেনা মালতীর মত মেয়েরা ।বাঁকা চাউনিতে চেয়ে মেঘমায়া বলেছিল ।

-"আর কী জানেন । "

কয়েক ঘণ্টার পরিচয়ে চিন্তামণি সরকার মালতী সম্পর্কে যা জেনেছিল এক এক করে বলে যাচ্ছিলেন । ওপার বাংলা থেকে পাঁচ বছরের ছেলে ও ছয় মাসের শিশু কন্যাকে নিয়ে সবে মাত্র কলকাতার মাটি ছুঁয়েছিল মালতী । তার স্বামীর ;মালতীর কন্যা সন্তান জন্মাবার কয়েক দিন আগেই দাঙ্গায় প্রাণ যায় । বাড়ি ঘর পুড়িয়ে দিয়েছিল দাঙ্গাবাজরা । লুট করেছিল ধানের গোলা । প্রাণের তাড়নায় এদিক সেদিক ঘুরতে ঘুরতে;কাঁটাতার টপকে মালতী ইন্ডিয়াতে ঢুকেছে চোরের মত । দূরসম্পর্কের মাসি মেঘমায়া দাসের বাড়ি কলকাতায় ছুটে এসেছিল একটু আস্তানার অভিলাষে । চিন্তামণি গড় গড় করে বলে যাচ্ছিলেন ।

-"আর আপনি তাকে দিয়ে......"

মেঘমায়া বলেছিল; -"ব্যবসা করায়েছি । " –

"আপনার লজ্জা করছেনা বলতে ।" –

"লজ্জা করনের তো কিছুনাই । এইডা ভদ্র পাড়া নয় । এইহানে মাইয়ারা দেহ বেইচাই গ্যালনের জোগাড় করে । ওর মত মাগী এইহানে অনেক আছে কেউ পালায় নাই সতী হতি । "

রাগে চিন্ময় সরকারের ফরসা মুখটা লাল হয়ে উঠেছিল । -

"জানেন আপনাকে আমি পুলিশে দিতে পারি । " –

"ওটি কইরবেন না লাভ হইব না । " –

"ওর ছেলে আর মেয়েটাকে দিন । আমি এখান থেকে নিয়ে যাব ওদের ।" –

"দেহেন চিন্তামণি বাবু রাগ করেন কেন । মাথা ঠাণ্ডা করেন । " ঠোঁট টাকে দাঁতে চেপে মেঘ মায়া দেবী স্বভাব সিদ্ধ ঢংয়ে ফিস ফিস করে বলেছিলেন ; -"সাদ লওয়ার বাসনা জাগিসে তা নেন না । মাইয়াটারে ভাগায়ে আমার ব্যবসা ডোবান কেন। "

প্রবল বজ্রবেগে ধমক দিয়ে উঠেছিল ডাক্তার চিন্তামণি । মহিলা না হলে চর কষিয়ে দিতেও হয়ত দ্বিধা করতেন না । মেঘমায়ার মেদাক্ত কপালে ঘাম জমতে শুরু করেছিল ;এটুকু বুঝতে তার আর অসুবিধা ছিলনা যে এ বাবু টি এ পড়ায় দেহের সওদা করতে আসেনি । এসেছে এক প্রবল মানবিক টানে । চিৎকার চেঁচামেচি তে আসে পাশে বেস কিছু লোক জমে গিয়েছিল । মেঘ মায়া বোধয় বিপদের আসংখ্যা করছিলেন । ভয় পাচ্ছিলেন শেষ মেষ মেয়ে পাচারের দায়ে বুড়ো বয়সে হাজত বাসের । তাই হাঁক পেড়েছিলেন;

-" মেনকা ....ও মেনকা ও দুটারে লইয়া আন । "

মেনকা আবির্ভূত হয়েছিল তার কোলে মালতীর ছয়-সাত মাসের শিশু কন্যাটি মায়ের অনুপস্থিতি তে নির্দ্বিধায় পুপসি বোতলে দুধ খাচ্ছিল । মেনকার আঁচল ধরে দাঁড়িয়ে ফেল ফেল করে সবার মুখের দিকে দেখ ছিল মালতীর হাড় জিরজিরে নাক থেকে সিকনি ঝরে চলা ছেলে টা । মালতী দ্রুত এগিয়ে গিয়ে প্রায় ছো মেরে ছিনিয়ে নিয়েছিল মেয়েটাকে ;বিশ্বাস , আস্থা ,ভালবাসা,স্নেহ ,মমতা বাংলাদেশের দাঙ্গাবাজ লোক গুলোর মত মালতীর মাসির হৃদয়ে ছিটে ফোটা নেই ;এক রাত্রির ব্যবধানে মালতী বুঝে গিয়েছিল । সদ্যজাত বাছুর কে গাই যেমন চেটে চেটে মাতৃত্বের স্নেহে সুরক্ষার অনুভূতি প্রদান করেন ;তেমনি মেনকার অসুরক্ষিত আঁচল ছাড়িয়ে বসে পড়ে বাঁ হাতে নিজের ছেলেকে বুকে চেপে ধরে তার শুষ্ক মুখে চোখের জল আর চুম্বনের রেখায় মালতী মাতৃত্বের স্পর্শ তুলে দিচ্ছিল। চির মাতৃত্বের পূজারী ভারত বর্ষ যে খবরের পাতায় পাতায় ধর্ষণ আর নারী নির্যাতনের আখরা হয়ে উঠেছে সে কথা ভেবে শিউরে উঠছিল চিন্তামণি । ভোগ যত বাড়বে ;মানুষ ততোই পণ্য হবে ; হবে বিপন্ন । বুঝতে পেরেছিলেন তিনি । যে প্রগাঢ় তীব্র স্নেহ মালতী তার সন্তান দ্বয় কে প্রদান করছিল তা অনেক কঠিন হৃদয় কেই গলিয়ে দেয় চক্ষু সজল হয়ে ওঠে । কিন্তু মেঘ মায়ার মায়া বর্জিত কসাই হৃদয়ে মালতীর এই সন্তান প্রীতি বিন্দু মাত্র মমতার সঞ্চার করতে পারছিল না । তার বাঁকা হাসি টি এ সব কিছুকেই ঢং বলে চিহ্নিত করে চলেছিল ।

মালতীর শেষ সম্বল হয়েছিল ডাক্তার চিন্তামণি কর । দেবদূতের মত এগিয়ে এসে মালতীর মাথায় হাত রেখে নিজের বাবার মত মালতী কে বলেছিলেন ; -"চল মা । "

এ হাত সকলের কপালে জোটে না । জুটলে এ পৃথিবীর অনেক অসহায় মানুষের সাহারা জুটে যেত ;অনেক বেদনার ভার হতো লাঘব ।

চারটের ঘণ্টাটা ঢং ঢং করে বেজে উঠলো । দূরে নামাজ পাটের আওয়াজ দিদুন কে নিত্যদিনের মত বিছানা ছাড়ার নির্দেশ দিচ্ছে। দিদুন চোখ মেলে তাকাল । ভেন্টিলেটর থেকে কয়েক ফোটা আলো চুইয়ে ঢুকছে ঘরে। ক্ষীণ হলেও দিনের আভাস টুকু প্রদানের ক্ষমতা এর যথেষ্ট । দিদুনের দুচোখ ভেজা । কাল রাতে মিতার প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে পুড়ন অ্যালবামের ঘোলাটে ছবি গুল স্মৃতির পৃষ্ঠা উলটে পালটে দেখেছে সে । বিছানায় পিঠ রাখার আর উপায় নেই । দেরি হয়ে যাবে । জল তুলে দুধ আনতে যেতে হবে দিদুন কে । বাজার টা ছেলেই করে । বৌমার রান্নার যোগার করে স্নান সেরে ঠাকুরের জল বাতাসা দিয়ে আহ্নিক করে কাজে বেড়য় দিদুন। একটা প্রাইমারী স্কুলে বাচ্চা দেখা শোনার কাজ করে সে। স্কুল থেকে ফেরার পথে সেলাই । টালিগঞ্জের এই দোতলা বাড়ির ছাদ আর স্কুলের কাজটা ডাক্তার চিন্তামণির দৌলতেই দিদুনের পাওয়া । চিন্তামণি সরকার আজ আর এ পৃথিবীতে নেই । বছর কুড়ি হল মারা গেছেন । দিদুনের মাথার ওপর তার সাদা কালো আবছা অস্পষ্ট ছবিটা বাঁধাই ফটো ফ্রেমে ঝুলছে । ছবিটাকে রোজকার মত ঘুম থেকে উঠে প্রণাম করেন দিদুন । নিজের বাবার মত শ্রদ্ধা করতেন দিদুন চিন্তামণি সরকারকে । ছবির ওপর শুকনো একটা রজনীগন্ধার মালা রূপ-রস ,যৌলশ হারিয়ে মাকড়সার সাম্রাজ্য দ্বারা আক্রান্ত । দিদুন বিছানা ছেড়ে ঘরের দরজা খোলে । ভোরের আলো দ্বারস্থ অতিথির মত অভ্যর্থনা পেয়েই আসন গেড়ে বসল । অস্পষ্ট ছবিটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে । দিদুন এগিয়ে যায় ছবিটার দিকে । কত চড়াই উতরাই পেড়িয়ে সেদিনের গ্রাম্য মেয়ে মালতী আজ মিতার দিদুন হয়েছে । শুকনো মালাটার মত সে শুকিয়েছে । তবু ঝড়ে পড়েনি । মাকড়সার জালের মত তাঁকে ধরে রেখেছে ছেলে ,মেয়ে ,বৌমা ,নাতনি এ সংসারের জটিল জটলাগুলো ।

গভীর দৃষ্টিতে দিদুন ছবিটার দিকে চেয়ে থাকে । একটা সুখ স্মৃতি জেগে ওঠে । - সর্বহারা মালতীর মাথায় হাত রেখে ছবির মধ্যকার ভদ্রলোকটি । তার স্নেহ আপ্লুত কথায় পিতৃ প্রেমের আভাস ।

-" তুই নাই বা হোলি আমার ঔরসজাত । তবু-তো আমি তোর নব জন্মদাতা । আমাকে তুই বাবা বলে ডাকতে পারবিনা-মা ! "

মালতী চোখের জল আর সামলে রাখতে পারেনি । -"বাবা..." বলে কাঁদতে কাঁদতে নব পিতার দু পা জড়িয়ে ধরেছিল ।

ভগবান তাকে ধন ঐশ্বর্য কিছুই দেননি দিয়েছেন চোখের জল । সুখে দুখে মনি মাণিক্যের মত তাই মালতী ও গুলোই খরচা করে । অন্যের কাছে তার চোখের জল সামান্য হতে পারে তুচ্ছ হতে পারে ;তবে মালতীর কাছে তা হৃদয় নিংড়ানো এক মাত্র সম্বল ।

দিদুনের ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজে মিতার ঘুম ভেঙ্গে যায় । বিছানা ছেড়ে পিছন থেকে দিদুনের কাঁধ স্পর্শ করে সে । ঠিক সেই সময় শিয়ালদাগামী প্রথম লোকালটা রেফারির মতো হুইসেল বাজাল । মিতার দিকে ঘুরে তাকায় দিদুন । সে বুঝতে পারে বেলা হয়েছে ;আর সময় নষ্ট করলে দেরি হয়ে যাবে স্কুলে ।

(চলবে)

১ অক্টো, ২০১৩

ধারাবাহিক - অলভ্য ঘোষ

0 কমেন্টস্
পর্নমোচী
অলভ্য ঘোষ



(এক)

কলেজ গেটের সামনে দাঁড়িয়ে রোগা ছিপছিপে এক যুবক । পরনে চুস জিন্সের প্যান্ট , গায়ে বাদামী সাট , চোখে গোল্ডেন গোল ফ্রেমের চশমা ।হাতে ডাইঅ্যারি । উদাসিন চোখ চেয়ে আছে সিঁড়ির দিকে । যেন খরাগ্রস্হ ভূমি বুক পেতে চোখ উনমুক্ত করে আকাশের পানে ।



বেল বেজে উঠলো । সহসা একদল ছেলে মেয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসে । তাদের পেছনে সাদা সালোয়ার কামিজ আর নীল ওড়না বেষ্টিত বহু আকাক্ষ্মীত সেই বৃষ্টির বিন্দু । যার একহাতে মুঠকরা ছোট্ট এক টুকরো কাগজ । অন্যহাতটা কাঁধে ঝোলানো ব্যাগের হ্যান্ডেল টা শক্তকরে আঁকরে ধরে । চোখ দুটো রক্তবর্ন ।

এতো বৃষ্টিনয় । ঝঞ্জা অথবা সক্রিয় আগ্নেয় গিরি । এক মহা প্রলয়ের পূর্বাভাষ !

মোহনার কাছে এসে পড়া ক্লান্ত নদীর মত যুবক সোজা হয়ে দাঁড়ালো । দৃষ্টি অপরিবর্তিত । হৃদয় প্লাবন যেন বিস্তৃন্ন সমুদ্র বক্ষের আস্বাদ গ্রহনে অধিক মাত্রয় উৎসুখ ।

কিন্তু এ সাধ যে মিষ্টি নয় লবনাক্ত । সে যাইহোক ছোঁকরাটি যে এ লবনেই জাড়িত এ কথা বলবার আর বোধয় প্রয়জন পড়েনা । একটা দলাকরা কগজের টুকরো প্রত্যাখিত হয়ে এসে পড়লো তার মুখের ওপর । তার পর একটা চর । নদীর অভিমুখে যে বাঁধ সদম্ভে দন্ডায়িত হলো তা আকাক্ষ্মীত না হলেও অসহেষ্ণু নয় । কারন ছেলেটি অতলান্ত গভীরতার মোহাক্রান্ত । তাই এ বাঁধ ভাংতে তাকে হবেই । Geotropism এর প্রভাবে উদ্ভীদ মূলের মাটি ছোঁয়ার মতো ছেলেটি নতজানু হয়ে দাঁড়িয়ে রোইল ।

হটাৎ করে কলেজ গেটের ব্যাস্ত পরিবেশে নেমেএল আপেক্ষিক স্তব্ধতা । যে ঝঞ্জা এতোখন এগিয়ে আসছিল তা আছড়ে পড়ে তরীৎ গতীতে প্রস্হান করেছে । তার এই আগমন ভূকম্পন এবং প্রস্হান ছেলেটার হৃদয়ে কতটা ঘা দিয়েগেল বুঝে ওঠার আগেই ব্যপারটা অবগত করার জন্য সবাই ছোট কাগজের টুকরো টার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো লুটের বাতাসা কুড়বার মতো ।

অপ্রত্যাসিত হলেও অধ্যাপক পি.কে পাল সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসে । হাতে এটেনডেন্স খাতা চক ডাস্টার । কন্ঠো গমম্ভীর ।

- " দেখি কাগজ টা । "

আবার স্তব্ধতা । কারও কারও মুখে মিচকি হাঁসি । কাগজের টুকরোটায় কি লেখা আছে ; কারও অনুমান করতে অসুবিধা হয় না । নিশ্চীৎ ওটা প্রেম পত্র । প্রেমিক মহাশয় রূপম বাঘিনী নামে

কলেজ খ্যাত মিতা কে অর্পন করে ছিল এবং মিতা তা সক্রোধে প্রত্যাখ্যান করেছে । প্রেম পত্রের আদান প্রদান এ কলেজে নতুন নয় তব প্রত্যাখ্যান পর্বটি অভিনব ।

প্রত্যাখ্যান পর্বের সমস্ত দৃশ্যটাই ওপর থেকে লক্ষ করেছেন অধ্যাপক পি কে পাল । তাই ছাত্রদের রসভজ্ঞন করে এগিয়ে এসে মন্টুর হাত থেকে কেড়ে নিলেন চিঠি টা ।

মন্টু মাথা চুলকাতে লাগলো । সবাই চেয়ে রইলো একে অপরের মুখের দিকে ।

পি কে পাল চশমার ওপরের ফাঁকা থেকে চোখ বাড়ালো কাগজের টুকরো টার ওপর । অতি পরিচিত ইংরেজী তিনটে ভালভাসার শব্দ প্রত্যেক মানুষোই কোননা কোন বয়সে কার না কার উদ্দেশ্যে তা উচ্ছারন করে । সোনালী কালিতে লেখা শব্দগুলো অভ্র আর জরীর ভেতর উজ্জবল ;পি কে পাল দেখলেন তার নিচে রূপমের নাম টা লেখা । চিঠি টা থেকে ফুরফুর করে মিষ্টি একটা সেন্টের গন্ধ বেড়চ্ছিল । সে গন্ধ অ্যাপক ছাড়াও পাচ্ছিল আসপাশের ছেলে মেয়েরা । চিঠি টা হাতের মুঠোয় সবুত প্রমান হিসাবে কড়ায়ত্ব হতেই । রূপমের দিকে আবর্তিত হলো মোটা কাঁচের পেছনের বড় দেখান পি কে পালের ডেবা ডেবা চোখ দুটো ।

-" তোমাকে ভাল ছেলে বলেই জানতাম । প্রিন্সিপাল মহাশয় তো তোমার প্রসংসায় পঞ্চমুখ । তুমি নাকি গোবরে পদ্ম্যফুল । এত দেখছি পদ্মও নয় শ্যাপলাও নয় জলার পানা কচুরী । কলেজ টাকে বিন্দাবন বানিয়ে ছেড়েচ । "

সবাই হোহোকরে হেসে উঠলো রূপম আগের মতোই দাঁড়িয়ে রইলো অবনত ভাবে ।

পি কে পাল পা বাড়ালেন টিচার্স রুমের দিকে ;যাবার সময় শেষ কথাটি বললেন ;

-" রসায়নের বদলে এবার আমি তোমাদের রোমান্সের ক্লাস নেব ।"

প্রিন্সিপাল রুমের দরজার কাছে এসে মিতা থেমে গেল । রুমের ভেতর যেন বাজ পড়ছে । যার এদিক ওদিক ছিটকে পড়া শব্দ গুলো মিতাকেও কাঁপিয়ে তুললো ।

_" তোমাকে নিয়ে আমার আনেক আশাছিল সব আশা মাটিতে মিশিয়ে দিলে । তোমার মতো ছেলেকে রাস্টিকেট করে কলেজ থেকে তাঁড়িয়ে দেওয়া উচিত দিতাম ও তাই । নেহাত সব প্রফেসারেরা আমার কাছে আবেদন করেছে তোমাকে যেন একটা সুযোগ দেওয়া হয় ; তাই এ যাত্রায় বেঁচে গেলে । পারলে নিজেকে সুধরে নিও না হলে ভবিষ্যতে বিপদে পড়বে।"

একটু থেমে দীর্ঘ নিশ্বাসের সাথে সাসপেন্ট লেটার টা রুপমের দিকে এগিয়ে দেন প্রিন্সিপাল ।

-"তিন মাস এ কলেজের ক্লাসরুম ,লাইব্যেরি ,কমোনরূম কোনকিছুই তুমি ব্যবহার করতে পারবে না । "

মিতা এবার এগিয়ে আসে ;

-"মে আই কামিন স্যার ? "

প্রিন্সিপল তার বাজখাই গলায় বললেন ;

-" ইয়েস কামিন ।"

প্রিন্সিপাল মহাশয়ের টেবিলের কাছে গিয়ে দাঁড়াল মিতা । টেবিলের অপর প্রান্তে এখন আসামীর মতো মাথা নিচুকরে দাঁড়িয়ে রুপম । চোখ দুটো তার লাল ; এসব ছেলেদের অপমান লজ্জা স্পর্শ করে কিনা জানানেই মিতার ।

প্রিন্সিপাল এবার রুপমের দিকে তাকালেন :

-"তোমার কিছু বলার আছে ?"

ইঙ্গিতটা এমন এবার তুমি আসতে পার ।

হলকা মাথা নেড়ে রুপম জানালো -"না ।"

তারপর প্রন্সিপাল মহাশয়ের টেবিলের ওপর থেকে প্রিন্সিপালের চিঠি খানানিয়ে মেঝের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে বেড়িয়ে যায় । এক বারো সে তাকায় না মিতার দিকে ।

মিতার দৃষ্টি এতখোন আবদ্ধছিল টেবিলের এক কোনায় অপমান বোধ তাকেও যেন ছুঁয়ে যাচ্ছে । কলেজ ময় তাকে নিয়ে হোইহট্টোগোলের অন্তনেই । নিজেকে ভীষন ছোট মনেহচ্ছে তার । একটা সামান্য চিঠি নিয়ে এতটা বাড়াবাড়ি না করলেই বোধয় ভালহতো । কত মেয়েকেই তো মিতা দেখেছে এমন চিঠির শিকার হতে । এইতো সেদিন বিকাশের প্রানবন্ত সেন্টদেওয়া একখানা চিঠি মিতার ডেক্সের পাশদিয়ে ক্লাস চলাকালিন পৌঁছাল মৌসুমীর ডেক্সে । মিতা বড় বড় চোখে তাকিয়েছে । কিন্তু মৌসুমি কে সে দেখেছে ব্যাপার টা বেস উপভোগ করছে সে । মিতা পারেনা ওদের মতো নিজেকে মেলে ধরতে ।

প্রিন্সিপল বললেন ;

- "কলেজের কোন ছেলের গায়ে অমন করে হাত তোলা তোমার ঠিক হয়নি । চিঠি টা নিয়ে আমার কাছে আসা উচিৎ ছিল। "

মিতা চুপ করে থাকে । চিঠি টা পাবার পর কিযে হলো মাথা ঠিক রাখতে পারেনি সে । একটা অবগ্যা অপমান ছিল চিঠিটার অন্তকরনে । কিসের অপমান মিতাও ঠিক ভালভাবে জানেনা চিঠির কোন শব্দটা তাকে অপমান করছিল । তবে ভালবাসা সম্পর্কে মিতার ব্যাক্তিগত মত হল এটি মেকি ,জোচুরি ,নোংরা অভিসন্ধী ।

প্রিন্সপল রুমের দরজা অতিক্রম করার পূর্বে প্রিন্সিপল বললেন;

-" কলেজের আনাচে কানাচে কমোন রুমে এখন অনেকে অনেক কথা বলবে কান দিয়না ওসবে । "

ক্লাশ শুরু হয়নি ছড়িয়ে ছিটিয়ে জটলা বেঁধে আলোচনার ঝড় বইছিল ক্লাশ রুমে । মিতাকে দেখে কে যেন ফিস ফিস করে বলে উঠলো

_"ঐ যে বাঘিনী এসেগেছে ।"

ছাত্র ছাত্রীরা আড়ালে আপডালে তাকে এ নামেই ডেকে থাকে । মিতার গম্ভীর ভাবমূর্তিই এ নামকরনের উৎস । রুমা মিতার একমাত্রী বান্ধবী । স্কুল থেকে সে তার সহপাঠিনি । একি পাড়ায় থাকে সে । ক্লাস রুমে রোজকার মতো সেই একান্ত বান্ধবী টির পাশে এসে বসলো মিতা ।

রুমা বলল ;

-"কিরে আসার পথে আজ আমার জন্য দাঁড়ালি না । "

মিতা বলে;

-"দিদুন বলল তোর শরীর খারাপ । তাই ভাবলাম তুই বুঝি কলেজে আসবি না । "

ক্লাসরুমের ছোট ছোট জটলা গুলো তখন এক হয়ে গিয়েছিল । প্রিয়ঙ্কা গুছিয়ে বসল ডেক্সের ওপর । মিতাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলল :

-" না এমন সুযোগ পেলে আমি লাইন মারতে ছাড়তাম না । কলেজের সমস্ত মেয়ে যার জন্য পাগল ;তাকে পেয়ে refuse; impossible ......!"

কাকলি কর্কোস কন্ঠ্যে আরো সংযোজন করল ;

-"বেশী সতী পানা । "

দেবু হাসতে হাসতে বলল ;

-"ছেলেটাও কি মাইরী ;বাপের এত টাকা ইচ্ছে করলে হাজার টা মেয়ে চড়াতে পারে । শেষে কিনা প্রেমে পড়লো একটা unsocial শাকচুর্নীর ।"

বিকাশ এই যঞ্জে ঘি ছিটালো ।

-"প্রেম কী আর যে সে প্রেম । দেবদাসের মত ঘন্টার পর ঘন্ট্যা ক্লাসের পর ক্লাস নায়ক নায়িকার দিকে চেয়ে বসে আছে । নায়িকার সে দিকে ভুরুক্ষেপ ও নেই । "

মন্টু বলল তার গুঠকা খাওয়া লাল দাঁত বাড়করে ।

-"শেষ পর্যন্ত মনের কথাটা ছোট্ট কাগজের টুকরোয় ট্রান্সফার হল নায়িকার ডায়েরিতে । "

রিন্টু চেঁচিয়ে ওঠে ;

-"বেশ কেলেঙ্কারী । "

সবাই হো হো করে হেসে উঠলো ।

মিতার মুখের চারিপাশে ঘন ঘামের বিন্দ্যু জমতে শুরু করেছিল । অশান্তির আসংখা অনুভব করে মিতা বলে ;

-"আজ আর ক্লাস করতে হবে না । চল বাড়ি যাই । "

রুমা যে কটাক্ষ করে বুঝিয়ে দিল যতসব বাজে ছেলে মেয়ে এ কলেজে জুটেছে । এটা আর কার বুঝতে অসুবিধা হলো না । বেঞ্চ ছেড়ে উঠে পড়তেই কোন একটি ছেলে মেয়েলি গলা করে বলল:

-"বাবা বাঘিনীর সাথে থেকে ছ্যুচটাও গর্জন করছে রে ।"

মিতা থমকে ওদের দিকে ঘুরে দাঁড়ালে তার হাত ধরে ক্লাস রুমের বাইরে নিয়ে যায় রুমা ।



(দুই)

কিছুক্ষন আগে বজবজগামী শেষ লোকাল টা রাতের নিশতব্দতাকে ভঙ্গকরে সবকিছু কাঁপিয়ে সাসা বেগে চলেগেল । অন্ধকারে ডুবে থাকা দূরের বস্তির ঝুপরি গুলো থেকে যৎসামান্য আলো ফাঁক ফোঁকর ফুরে উকি মারছে । লাইনের ওপাড়ে একটা ব্যালকনিতে কারা যেন দাঁড়িয়ে । পুতুলের মত দেখাচ্ছে তাদের । সমস্ত পাড়া নিশতব্ধ । শীতের আমেজ রাত বারটাকে যেন আর গভির করে তুলেছে । মিতার মামি এঁটোবাসন বাইরে গুছিয়ে রেখে ; স্বামী কন্যাকে নিয়ে সুখনির্দাচ্ছন্ন । দিদুন এখন বাড়ি ফেরেনি । মিতার পড়ার খরচ চালাবার জন্য সেলাই করে সে । মিতার মা চিলেকোটার ঘরে বিড়াল বাচ্ছা গুলকে কাঁকেনিয়ে গুটিসুটি মেরে ঘুমচ্ছে ।

মিতা মায়ের কাছে গিয়েছিল ;দিদুনের একটা ছেঁড়া শাড়ি আর কিছু টুকরো বাতিল কাপড় দিয়ে মায়ের জন্য একটা কাঁথা বানিয়েছে সে । মায়ের গায়ে ঢেকে দিয়েছে সেটা । হাত বুলিয়েছে মায়ের মাথায় । ঘুমন্ত মায়ের হাতটা নিজের মাথায় রেখে বলেছে ;

-" আমাকে আদর করবে মা । "

ওরবড় ইচ্ছেকরে ঐ বেড়াল বাচ্ছাগুলোর মতো মায়ের কোলে মাকে জড়িয়ে ঘুমাতে । মা হাত টেনে নিয়েচে ঘুমের ঘোরে । আশ্রয়হিনতার যন্ত্রনায় মিতার চোখ বেয়ে এসেছে জল । রোজ রাতে সবার চোখের অলক্ষে সে তার মাকে দেখতে আসে ; অন্ধকার এই চিলেকোটার সরু পায়রার খোপের মত ঘর টায় । এখানে কুকুর বিড়ালের মত তার মা বেঁচে আছে । সারা দিনে এই ক্ষুদ্র সময় টুকুর জন্য সে তার মাকে কাছে পায় ।

এমনি এক রাতে বিছানা থেকে উঠে মাকে আদর করতে এসেছিল মিতা । বুঝতে পারেনি মা জেগে ;গলা চেপে ধরেছিল তার । দমআটকে আসছিল ; চিৎকার করে কেঁদে ফেলেছিল মিতা !দিদুন,মামা,মামি বাড়ি শুদ্ধু সবার ঘুম যায় ভেঁঙে । মায়ের হাত থেকে মামা মিতাকে ছাড়িয়ে সজোরে চর কষিয়ে ছিল ।

-" রাতের বেলা এই পাগলিটার কাছে আদিখ্যেতা করতে এসেছিস । "

দিদুন কে গালিগালাজ করে বলেছিল ;

-" তুমি মেয়েটার মাথা চিবিয়ে খাচ্ছ । "

অবশেষে সারা রাত বিছানায় দিদুনকে আঁকরে ধরে কেঁদেছিল মিতা । ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বার বার বলেছিল -"ঐ পাগলী টা আমার মা দিদুন । আমার মা......."

ফাঁকা ছাদের রেলিংয়ে চিবুক রেখে মিতা চেয়ে আছে দূরে রেল লাইনের অবিচলিত স্হীর ল্যাম্প পোস্ট গুলোর দিকে । ঝড়-বৃষ্টি,শীত-গ্রীষ্ম সকল দূর্যোগ মাথায় নিয়ে ও গুলো কেমন ভাবলেস ভাবে দাঁড়িয়ে থাকে । মিতা চায় ঠিক অমনি ভাবে তার দুঃক্ষ -কষ্ট ,অবগ্যা -আবহেলা,প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি সব কিছুকে উপেক্ষা করে ওদের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে । অসমতল,অস্বচ্ছ এই জীবন পথে চির অটল অনড় ভাবে।

কখনো কখনো তার দৃঢ়তায় ভাঁঙ্গন চলে । মিতা অসহায় বোধ করে । কৈসর কেটে গেছে মামির ফাইফরমাইস খেটে । সদ্য প্রাপ্ত যৌবনেও তার জীবনে কোন রসসিক্ত পরিবর্তন আসেনি । তার একাকিত্বতা আরো চেপে ধরেছে তাকে । হোই হুল্লর ,সিনেমা সিরিয়াল,গান বাজনা কিছুই ভাল লাগে না তার । মা বাপের স্নেহের দুলালী হয়ে উঠতে পারেনি সে আর দশজনের মতো । দিদুন ছাড়া কাছের বলতে তার আর কেউ নেই । দিদুনের কিছু হয়েগেলে একদম একা হয়ে যাবে মিতা । কথটা ভাবলেই ভাড়ি হয়ে ওঠে মিতার মোন ।

মিতার মাথায় তেল মাখানোর সময় ;দিদুন সমস্ত আশির্বাদ ভালবাসার প্রলেপের সাথে ঢেলেদিয়ে বলে ;-"তোমারে বড় হতে হইব । মানুষ হতে হইব । কেডা কয় তোমার কেউনাই !তোমার মা আসেনা ;তারে তোমারে দেখতে হইব । আমি আর কদিন ।"

-"না দিদুন ও কথা বলনা । "

দিদুনের গালে চুমু খেয়ে এ কথাটা বললেই ছোটবেলা থেকে গলা জড়িয়ে ধরে মিতা । আদর করার ও আদর পাবার তার একমাত্র সম্বল এই দিদুন ।

পাড়ার রাস্তার আবছা অন্ধকার ভেদকরে খয়েরি চাদরে মোড়া সেই বুড়িটা এগিয়ে আসছে এই বাড়িটার দিকে । কিছু ক্ষন পরে ছাদের ভেজান দরজাটা সানডে সাসপেন্সর ভুতের বাড়ির সদর দরজার মত কেঁচকেঁচ আওয়াজে খুলে গেল । মিতা শুনতে পেল অতিপরিচিত দিদুনের আদুরে গলার ডাক ;

-"কেডারে ওহানে ? মিতু ? "

-"হ্যাঁ দিদুন ।"

চাঁপা বসাগলায় উত্তর দিল মিতা ।

-"গলাটা এমন বসলো কি কইরা ? ঠান্ডা লাগায়েছস । কি দরকার ঠান্ডায় ছাদে দাঁড়ায়ে থাকনের ?"

রোজয়ি দিদুন প্রশ্নটা ছুড়েদেয় মিতা কে । কিন্তু সে কোন উত্তর না করে দিদুনের হাত ধরে ঘরে ঢোকে। তারপর ঢেকে রাখা রাতের খাবার খেয়ে ঘুমতে যায় ।

আজ মিতার নিয়মানুবর্তিতায় দিদুন ফরাক অনুভব করল । তেমন প্রানোচ্ছল অব্যরথনা ছিলনা তার ব্যবহারে । দিদুনের খাবার বেড়ে চৌকির ওপর উঠে মোশারির কোনগুলো টাঙাতে ব্যাস্ত হয়ে উঠলো সে । ছাদে ধুয়ে আসা ভিজে হাত খানা গামছায় মুছতে মুছতে এ সমস্ত কিছু দেখে দিদুন বুঝতে পারে মিতার মন টা ভাল নেই । মিতার জীবনের সব কম্পন;সব অনুভূতি দিদুনের সদা সহানুভূতিশীল হৃদয়ের রিক্টার স্কেলে ধরাপরে ছোটবেলা থেকে নিজের হাতে নেড়েচেড়ে মানুষ করেছে তাকে ।

- "কি হইছে ;তোরে কেউ কিছু কইছে ? "

মিতা মশারি গুজতে গুজতে থেমে যায় । মাথা নেড়ে ইঙ্গিতে না বলে ।

দিদুন আবার প্রশ্ন করে ।

-"মায়ের শরীর খারাপ করছে । "

মিতা আবার মাথা নেড়ে না বলে বালিশের ওয়ার ঠিক করতে থাকে ।

দিদুন তবুও মিতার কথায় আশ্বস্ত হতে পারেন না ।

-"তোরে এমন মন মরা দেখাইতেছে কেন ?"

মিতা ম্লান মুখটায় একটা চেষ্টাকৃত হাসি আনার চেষ্টাকরে বলে ;

-"কই কিছু হয়নিতো । "

এই সামান্য কথাটুকু বলতে গিয়ে তার গলা ধরে আসে ।

দিদুন বিছানায় বসে মিতাকে বুকে টেনে মাথায় হাত বুলিয়ে দেন । মিতাকে হালকা করার এ প্রন্হা সতের বছর ধরে অবলম্বন করে চলেছে সে । এ ভালবাসায় যেন লোহাও গলে জল হয়ে যায় ।

-" আমারে লুকাস ক সোইনামনি কে তোরে আঘাত কইরেছে !"

অতিরিক্ত আদরের সময় মিতাকে দিদুন সোনামনি বলে । কেঁদে ফেলে মিতা ।

দিদুনের বুকে মুখ গোঁজে ।

-"আচ্ছা দিদুন আমি কারো সাথে মিশতে পারি না কেন বলত !"

দিদুন আর যত্নকরে মিতার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলে ;

-"কেডা কয় এ সব ;তার মুহে ঝাঁটার বাড়ি । আহলে তুই গায়ে ঢলাঢলি পিরিত পছন্দ করোস না তাই ওরা হিংসায় মরে । চতো খেয়ে নিবি চ । "

গ্রাস আর ওঠে না মিতার মুখে । একটা প্রশ্ন মিতা কে তোলপাড় করছে । তার কঠিন রূঢ় দৃঢ় যে আদর্শ যে চেহারা তার তলায় কী চাপা পড়েনেই এক কোমল সরল সাদাসিদে মেয়ে !আর দশটা মেয়ের মতো যে জীবনের রূপ , রস ,গন্ধ্য প্রকৃতির রোদ্রুরে মেলে ধরে সালোকসংশ্লেষের মত উপলব্ধী করতে চায় জীবন কে । মিতা বুঝতে পারে ;তার দূর্ভেদ্য আদর্শের জটলা গুলো বিধাতা স্হাপন করেছেন নিপুন ভঙ্গীমায় । এক দগ্ধ মায়ের জীবনচরিত মেয়ের জীবনের রন্ধে রন্ধে পৌঁছে সদ্য বিকশিত কিশোরী হৃদয়কে করে তুলেছে পৌড়া । সকলের চোখের অলক্ষে তাই তার মোন কাঁদে যৌবন ফিরে পেতে ।

রাতের উচ্ছিষ্ট খাবার বিড়াল দের ভোগ্য করে এঁটো বাসন ধুয়ে গুছিয়ে দরজা বন্ধ করে বিছানায় প্রবেশ করে মিতা । হাত জড়ো করে ভগবানের কাছে তার নিত্য নৈমিত্যের গুরু প্রর্থনা সেড়ে ততোখনে দিদুন ও বিছানায় পিঠ ঠেঁকিয়ে ছিল । তার চোখে দিন ক্লান্তিতে ছেয়ে আসছিল ঘুমের কোঁয়াসা । মিতার মনে তোলপাড় করছিল জিঞ্জাসার ঢেউ । হৃদয় ভেদকরে মুখমন্ডল থেকে পিছলে এবার সেই ঢেউয়ের একফালি স্পর্শকরে দিদুন কে ।

- "আচ্ছা দিদুন তুমি কখন কাউকে ভালবেসেছো ?"

দিদুনের অবসন্ন ঘুমাচ্ছন্ন চোখ দুটিতে ; মিতার প্রশ্নটা সরষের তেলের ঝাঁজের মতো ঘুম কেড়ে নিল । কিছুক্ষন স্তব্ধ হয়ে থেকে বিছানা থেকে হাত বাড়িয়ে প্রতিদিন কার মত বেড সুইচ টিপে লাইট অফ্ করে সে । তারপর মিতার কথাটা এড়িয়ে যাবার ভঙ্গীতে সে বলে ;

-" ঘুমিয়ে পড় । "

দিদুন তখন ভাসছে স্মৃতির ভেলায় ।

গ্রামের সান বাঁধান পুকুর ঘাটে বসে বছর চৌদ্দর একটি মেয়ে । সূর্য লাল বর্নের হয়ে পশ্চিমের পুকুড় পাড়ের হিজল , তেঁতুল গাছ গুলোর মাথা চুইয়ে দূরে কোথায় লুকিয়ে পড়ছে কেউ জানে না । লজ্জায় রাঙা নব বধূর মতো সূর্যটার আলতা রঙ্গে ; পুকুড়ের জল ও রক্তিম হয়ে উঠেছে । পাখিরা বাসায় ফিরছে সাড়ি বেঁধে । ঘাটে বসা মেয়েটার লাল ডোরা শারীর কোঁচরে বাঁধা একরাশ নুড়ি থেকে একটা একটা করে ছূড়ে মারছে সে । নুড়ি জলো স্পর্শ করে তলিয়ে যাবার আগে সৃষ্টি করে যাচ্ছে তরঙ্গ । একটা তরঙ্গ মিলতে না মিলতে আর একটা তরঙ্গের সৃষ্টি করে মেয়ে টা । বিন্দু থেকে তরঙ্গ গুলো ছড়িয়ে পরছে পর্যায় ক্রমে কতগুলো চক্রে ।

সহসা একটা ছেলে পা টিপে টিপে এগিয়ে আসে । পেছন থেকে চোখ চেপে ধরে মেয়েটার ।

এ স্পর্শানুভূতি মেয়েটার অপরিচিত ছিল না । নিজের চোখ দুটোকে স্বাধীন করে তরিৎ গতীতে অভিমানের ভঙ্গীতে দুধাপ সিঁড়ি ভেঙ্গে ঘাটের পাড়ের দিকে ওঠে মেয়ে টা ।

-"তোমার লগে আমার কোন কথা নাই কামাল দা । সেই দুপুর থেইকা বয়ে আছি তোমার আয়নের সময় হয় না । "

কামাল সহানুভূতির ভঙ্গীতে মেয়েটির কাছে এগিয়ে এলে চোখ থেকে ফোটা ফোটা জল গড়িয়ে পড়ে মেয়েটার ।

-"কাল ফরিদ পুরের মামা বাবু আইসেন । আমারে ফরিদপুর লয়ে যাইবে । ওহানে মামার বাসায় আমার বিয়া দেবে। পাত্রর ইস্কুল মাস্টার । মামাগো গ্রেরামেই থাহে । জোয়ান মদ্দ তুমি দাঁড়ায়ে দাঁড়ায়ে দেহ খালি । "

মেয়েটির হাত চেপে ধরে কামাল । এবার আর চোখের জল বারন শোনেনি । কামালের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে কেঁদতে কাঁদতে মেয়েটা বলেছিল ।

- "তোমারে না পাইলে আমি বিষ খাইয়া নেব । "

মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে কামাল বলেছিল ;

-" অমন কথা কইতে নাই মালতী । "

চোখের জল মুছতে মুছতে মালতী মুখ তুলে তাকিয়ে ছিল কামালের দিকে ।

-"কামাল দা চল আমরা কোহাও পালায়ে যাই । "

কামাল খুব শান্ত ভাবে বলেছিল ;

-"কোহায় পালামু । শেষমেষ কি শেয়াল কুকুরের ভোগ্য করুম তোরে । "

কামালের কয়েক সপ্তা না কাচা শতো তাপ্পি মারা সুতির জামাটা মালতী চেপে ধরে ছিল গায়ের জোড়ে ।

-"যদি বাসাই না দিতে পারবা কেন বাসা বাঁধনের স্বপ্ন দেখাইছিলে । "

কামাল ম্লান মুখে মাথা নিচু করে নিয়েছিল ।

-"আব্বা গো ধইরে বসে আছেন হিদুর মেয়ে কাফের । আব্বারে আমার ডর নাই ;ডর গ্রাম ছাড়নের কোহায় যামু কেমনে তোরে রাখুম । "

কামাল কে ধাক্কা মেরে দু পা পেছনে সড়ে দাঁড়িয়ে ছিল মালতী ।

-"হাতে চুড়ি পড়ো গে । পুরুষ হয়ে জন্মেছো একটা মাইয়া মানষের রক্ষা করনের ক্ষমতা নাই ।


(চলবে)