রবীন্দ্রশ্রদ্ধার্ঘ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
রবীন্দ্রশ্রদ্ধার্ঘ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

১৪ মে, ২০১৩

রবীন্দ্রশ্রদ্ধার্ঘ - সর্বজিৎ সরকার

0 কমেন্টস্
জীবনসঙ্গী
সর্বজিৎ সরকার


আমার ঘরে-বাইরে তোমার নিত্য যাওয়া-আসা,
তোমার জন্য রাজা সাজা আজ;
তোমার কথায় রক্তকরবী কে -
একটু একটু করে ভালোবাসা!
জন্মের শুভক্ষণ-কে চিনিয়েছিলে তুমি,
ঝড়-কে মিথ্যে সাজিয়ে সোনার তরী তে ভাসিয়েছিলে আমায়;
আমি মারের সাগর পাড়ি দিয়েছিলাম।
তোমার চোখ দিয়ে অন্ধকারের রূপ দেখেছিলাম,
হিয়ার মাঝে লুকানো প্রেমকে এক নিমেষে অনুভব-
তাও তো শুধু তোমার প্রেরনা-তেই!
আমার ছোট-বড়ো 'আমি'গুলো তোমার পথেই হেঁটে চলে,
আমার পরাণ তোমার ভাষাতেই তার প্রেমের কথা বলে।
আমার নিঃস্তব্ধতার মাঝে সঙ্গী কেবল ই তুমি,
আমার আনন্দ কে ভাগ করে নাও সেই তুমি!
তোমার নির্দেশনার মঞ্চে-
আমি যেন নাটক করে চলেছি তোমার সৄষ্ট চরিত্রে!
তুমি থেকো আমার সাথেই;
তোমার সাথেই বেঁধেছি সূত্র জীবনের সুরেতেই,
হে মোর দেবতা,তুমি থেকো আমার সাথেই।

রবীন্দ্রশ্রদ্ধার্ঘ - সায়ান দে

0 কমেন্টস্
"হে মহামানব"
সায়ান দে



সময়ের হাত ধরে বদলের যন্ত্র-দুনিয়ায়
তুমি আজও সবুজ গ্রামের মেঠো গন্ধ আর পল্লীর সরলতা নিয়ে-
ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছো
                              হে বিশ্বকবি !
হানাহানি ভরা এই অনিয়ম-পরিবেশে
            এক মুঠো প্রান দিয়েছো
                              হে প্রানের ঠাকুর !
শুধুই কি মহামানবের ছায়া তুমি?
তুমি তো এক ছুটে এই পৃথিবীর অভিজ্ঞতা,
এক লহমায় মহাকাশ ভার,
            দীর্ঘ চেতনার সুতীব্র গভীরতা ।
কতকি পেয়েছি প্রতি পলে
কতকি দিয়েছো তুমি যুগে যুগে ভাবনার তলে ।
            তবু কি ফুরিয়ে যায়,
            তবু কি ফেরানো যায়-
হৃদয়ের অক্ষরেখা তটে তোমার প্রখর তাপ
                              হে চির রবি ?

তুমি মৃত কোন সভ্যতার নতুন করে জেগে ওঠা সত্য-
      কোন গৃহস্থ সন্ধ্যাপ্রদীপ দ্যুতি,
      আরও বেদনায়, আরও আবেগে, আরও মননে
      বারে বারে চাই তোমার উপস্থিতি ।
যেটুকু লিখেছি এতদিনে,
সব কলমের ভরবেগে ছিলে তুমি,
তোমাকে ভেবেছি বলে ভুলেছি ধর্ম- বর্ণ -জাত,
তাই মানবের জয়গান গাই...
এভাবেই পাশে থেকো
                            হে রবীন্দ্রনাথ । 


রবীন্দ্রশ্রদ্ধার্ঘ - লাভলী ভট্টাচার্য্য

0 কমেন্টস্
কোলাজে রবীন্দ্রনাথ
লাভলী ভট্টাচার্য্য



(১)
কৈশোর, যৌবন, পেরিয়ে জীবনের ঠিক শেষ প্রান্তে
কেটে যাওয়া সুখ দুঃখের দিনান্তে, অরুণিমার ম্লান অবশেষে
আবেশটুকু ভুলিয়ে, সুস্পষ্টের মত জেগে ওঠা আমার ভোর
স্মৃতিবিস্মৃতির নানা বর্ণে রঞ্জিত, এক অব্যক্ত সৌরভ
একটু রোদ আর একটু ছায়ায় মোড়া বদ্ধ জীবনের ,দিলাম ছুটি
লক্ষ্যহীন পথে,সহজে দেখবো সব দেখা, স্তব্ধ আমার দিবারাত্রি
কোলাহলের পথ ছাড়িয়ে ,হারাবো ,সুদূরবিস্তীর্ণ বৈরাগ্যে
পুরাতন প্রাণের সব মায়া নিয়ে ,এই সহজ প্রবাহ,মৃদুতালের ছন্দে
দিনান্তের অবসানে, আজ অলস মনে, আকণ্ঠ ডুব দেবো,নিস্তরঙ্গ জলে
মৃত্যু হবে চেতনার, মুক্তি পাবে প্রাণ, নতুন একটি নবজাতকের ক্রন্দনে
সার্থক কবিগুরুর বাণী ,চিন্তাহীন তর্কহীন শাস্ত্রহীন মৃত্যু-মহাসাগরসংগমে।

(২)
কথায় কথায় দ্বন্দ বেড়ে যায়,অকারনে মিছে শুধু কলহ
একতারাতে সুর বেঁধে গাই, রাত জেগে থাকে নিয়ে বিরহ।

দেখতে আসিস সেই-যে বীণা বাজে কিনা আজও হৃদয়ে
তারগুলি তার ধুলায় ধুলায় গেছে কি ঢেকে বিনা কারনে?

অধরা মাধুরী ধরি তখন ,আকাশ ও যে জানে, আমি সেই রাতের তারা
খানিক বাদে অশ্রু মুছে বলিস হেসে, আমি সেই তোমারই খুব চেনা ।

পথ-হারানোর লাগলো নেশা,অচিন দেশে এবার আমার যাবার পালা
তিন মাথার মোড়ে তখন, এক পলকের দেখা,চোখে চোখ রাখা।

আবার দেখি রাগ ধরিস,আর একটু বেশী হলে ক্ষতি কি, বোলোতো ?
ফেরার পথে গুন গুনিয়ে ,আবার হবে গো দেখা এ দেখাই শেষ দেখা নয়তো।

সে বীণা আজি উঠিল বাজি আবার হৃদয়মাঝে,ভুবন আমার ভরিল সুরে
বিরহ মিলন মিলে গেল আজ নয়নে আমার সমান সকল সাজে ।।

সে যেন মোর চিরদিনের চাওয়া ,সেইটুকুতেই জাগায় দখিন হাওয়া
তার সাথে তো সেই কবের দেখা , সে যে আমার প্রথম যুগের চেনা ।

রবীন্দ্রশ্রদ্ধার্ঘ - ডা.সুরাইয়া হেলেন

0 কমেন্টস্
এসো আমার ঘরে এসো
(২২শে শ্রাবণ,কবিগুরুর প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য )
ডা.সুরাইয়া হেলেন


রবীন্দ্রনাথ,ওগো কবিগুরু ,
আবার তোমায় সমাপ্তি থেকে করবো শুরু !
শেষ হইয়া হইল না শেষ,
তোমার কাব্য,গল্প,গানের আবেশ !

“আমার সোনার হরিণ চাই,
আমার সোনার হরিণ চাই ।”
তাড়া কোরোনা সোনার হরিণের পেছনে,
দিক হারিয়ে,দিশা হারিয়ে,হারাবে গভীর বনে!
সূর্পনখা আসবে তেড়ে ,
নেবে তোমার সবই কেড়ে !
তুমি আর যেওনা সোনার হরিণের পেছনে !

“ভেঙে মোর ঘরের চাবি,নিয়ে যাবি কে আমারে?”
ওগো চাবিওয়ালা,এসো আমার ঘরের দ্বারে ।
ভাষার তালা,কাব্য তালা,গানের তালা,
খুলে দাও এসে,ওগো রবি চাবিওয়ালা!
“এসো আমার ঘরে এসো,আমার ঘরে…!

“ওগো নদী আপন বেগে পাগলপারা…”
আমি স্তব্ধ হতে চাই না গো চাঁপা তরু,
তোমার মতো হবো আজ তন্দ্রাহারা !
আমি নদী হতে চাই বেগবতী,নই শীর্ণা নদী,
ভাষার নদী,লেখনী নদী,আশার নদী !

ওগো কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ,তাই তোমায়
আকুল হয়েই ডাকি আবার এতোদিন পরে,
“এসো আমার ঘরে এসো,আমার ঘরে !”



রবীন্দ্রশ্রদ্ধার্ঘ - চৌধুরী ফাহাদ

0 কমেন্টস্
কবিগুরু
চৌধুরী ফাহাদ


তুমি শাশ্বত সুধার শুভ্র বাগান
মানব ধর্মের চির তরুণ আহ্বান
সত্যকে করেছ অমৃতে ভাস্বর
কলুষতাকে দণ্ড, জীবন যাযাবর।
তুমি সবুজের উপর অনাবিল ভোর
এক মাটির আকাশে বন্ধন ঘোর
তোমাতেই সাজে উৎসব রব
ধন্য নাতিশীতোষ্ণের ঋতু-সব।

তুমি কোটি প্রাণে এক গান
এক সূরে বেজে উঠা সত্যস্নান
বিপন্ন মানবতায় তুমি বিজয় কেতন
বিপদমুখে দাঁড়িয়ে হাসে হৃদয় চেতন।
তুমি কচিকাঁচায়, যৌবনেও দিয়েছ নাড়া
শ্যামল কোমল সবুজ বুকে ফেলেছ সাড়া
মাটি জল অবিরল, আকাশেও তুমি
ক্ষুদ্রবিন্দু থেকে বিশালসিন্ধু গিয়েছ চুমি।

তুমি প্রিয়প্রাণ, প্রিয় সুরে বাজা বংশী
কবিতায় বুনা স্বপ্নজালে মায়া পড়শি
তুমি মঙ্গলমায়া, হৃদয়ের সুললিত সুধা
তোমাতেই রঙ হাসে তোমাতেই মনবাঁধা।
তুমি শাশ্বত প্রেমের ধ্রুপদী গান
ভালোবাসাবাসি তোমাতেই পেয়েছে প্রাণ
মনজুড়ে মনোহরে ভরা সাম্যের সুর
তোমারই কণ্ঠে উড়ে শান্তির বানি সুমধুর।

তুমি স্বতন্ত্র মহাকাশে অমরতারা
স্বকীয়তায় গড়েছ সাহিত্যের ধারা
সব পথে পদধূলি পড়েছে কার?
বঙ্গভাষা তোমাতেই পেয়েছে অহংকার।
তুমি মহাকাল বুকে চিরন্তন শোভা
পৃথিবীর শেষেও জেগে থাকা আভা
তুমি বাংলার আকাশে জাগ্রত সূর্য
তুমি বাংলার অধিরাজ, কাব্যঅর্ঘ্য।

রবীন্দ্রশ্রদ্ধার্ঘ - রাজর্ষি ঘোষ

0 কমেন্টস্


বিষয় রবীন্দ্রনাথ – একটি প্রবন্ধ
রাজর্ষি ঘোষ


নিঃশব্দ যা কিছু ঝর্‌ঝরে ঝরা পাতা যাক উড়ে যাক।
তবে বৈশাখ, তবে শিহরণ হোক একান্ত গোপন...
       গোপন যেমন শিমূলের বীজ নিরালা হাওয়ায়;
গোপন সেই গোপনীয়তাকে বলে দিও রাজি আছি আমি,
       রাজি আছি নিঃসঙ্গ হতে।

রাজি আছি কারণ যে ক্লান্ত নির্ঝর থেমে যায় মুক্তধারার পথে
       বাঁকে বাঁকে সে ভাঙে পাখির হৃদয়।
       ঝোরো পাখি, ঝুরো পাখি,
                         যে পাখি গুঁড়ো গুঁড়ো উড়ে এল বৈশাখ বিকেলে
       আমার ছায়াঘেরা বারান্দার কোলে
       তাকে চিনতে পারিনি হীরামন।

একটু আলো আলো কিছু রেলিঙের ধার
       রাজর্ষি জানে ছায়াপথ ইতিকথা...
       নীহারিকা, গ্রহরাজি, কিংবা কালবৈশাখী
                         অথবা এলোকেশী নারীর কাহিনী।
       তবে সে উপাখ্যানও আলমারির ধুলোমাখা তাকে
       খুঁজে পায় ধ্রুবতারা গোপন আঁতাতে।
ওই তাকে চুপি চুপি লেখা আছে ভাসা মেঘ মলিন মলাটে
রোদজল চিলেকোঠা জানে সে বিষণ্ণ ঈশ্বর
       আর জানে চুপকথা,
       রূপকথা ঘেরা সে আঠারো খন্ড
                        একান্তে নীরব রবীন্দ্রনাথ।




বস্তুত ক্লান্ত,
রাজর্ষি বিশ্রাম নেবে এইবার।
প্রবাহিনী যা যা ভেসে এল
        সে নয় শুধু আমার মেলাঙ্কলিয়া।
হয়ত সত্যি কথা,
        তবে যে হৃদয় খুঁজেছিল কোপাইয়ের তীর
        ভিড় ভেঙে তারা পেল
                        তারা তারা রাতে।

রবীন্দ্রশ্রদ্ধার্ঘ - বৈজয়ন্ত রাহা

1 কমেন্টস্
বারণ--বারণ--বারণ--বেঁচে থাকাই বারণ
বৈজয়ন্ত রাহা


কবি
এখন তোমার আগুন-হাসি -- বারণ
এখন তোমার কান্না পাওয়া -- বারণ
বারণ তোমার জ্যোতির্বলয় খোঁজ
কষ্ট-বিকেল খাক নামচা-রোজ

কবি তোমার কথা বলাও বারণ
বারণ তোমার জীবন ভাল লাগা
বারণ তোমার মরসুমি অভিমান
তোমার শুধু সিংহ-দুয়ার খোলা...

পিছনপানে অনেকগুলো ঘর
সময় নিয়ে বিছানা বদলায়
অজান্তে সব গোপন নিশাচর
পদ্মফুলে ছাপ লাগিয়ে যায়...

চাঁদ লেগেছে চাঁদের ঘরবদল
চাঁদ ভেঙ্গেছে গোপন বাসর সাজ
চাঁদ চেয়েছে ভিন্ন ঠিকানা
কবি তুমি বন্ধ করো চোখ

তোমার এখন গর্জে ওঠাও বারণ
পাথর চাপা পাঁজর ভাঙ্গা স্বর
খোলা চোখে দেখতে পেলেও দাগ
বুঝবে তুমি প্রেমের স্বয়ম্বর...

কবি তোমার ভালবাসাও বারণ
কুড়িয়ে নিতে আদুরে মৌসুমি
রাত উড়েছে রাতের পাখা বেয়ে
পূর্বাদি, এখনও গাইছ তুমি...

"তোমার সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রাণ......"

রবীন্দ্রশ্রদ্ধার্ঘ - অশোক কুমার লোধ

0 কমেন্টস্
নষ্টনীড়
অশোক কুমার লোধ


প্রতি রাতে তুমি রমণীয় উপপাদ্য
চারুলতা জানে জীবনের মানে সন্ধি
কাকভোরে তুমি কান্না লুকোনো স্নানঘর
ভোরের সূর্য সিঁদুরের টিপে বন্দী !

অমল আলোয় জীবনের খোলা মঞ্চে
ঘেরাটোপে সাজো মিথ্যে সাজানো সংসার
নীরব দুপুরে বোবা কান্নারা সঙ্গী
বাতাস গুনেছে নৈশব্দের হাহাকার ।

নিস্ফল ডানা ঝাপটায় চারু নিঃস্ব
শিরা ধমনীতে অমল , চেতনা কাব্যে
মুক্তির আলো খুঁজে ফিরে তুমি শ্রান্ত
অষ্টপ্রহর কষ্ট কাজল নষ্ট যে বৈরাগ্যে ।।

রবীন্দ্রশ্রদ্ধার্ঘ - কাজী এনামুল হক

0 কমেন্টস্
রবি স্মরণে
কাজী এনামুল হক


‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ গড়ে বিশ্ব কবি
লেবুর পাতায় শিশির কণা; তপন-
কিরনে ঝিলিক মারে প্রভাতী নয়ন,
বাতায়নে অবাক দেখে কিশোর রবী।

সহসা কলম ধরি রচিল কি ভাবি,
চারটি শব্দে মোটে একটিই চরন।
রয়ে গেল স্মৃতি হয়ে কবির সূচন,
জোড়া সাঁকোর জমিদার তনয় রবী।

এরপর দিন যায় লেখনী দূর্বার,
থামেনি রচনা তার কোন অপঘাতে!
অকাল প্রয়াতা কন্যা শোকে কাঁদে প্রাণ।

কলম থামেনি , নিন্দা শুনি বারবার,
নোবেল বিজয়ী রবী ধন্য প্রশংসাতে-
সাহিত্যে প্রতি ক্ষেত্রে দান তার সমান।

রবীন্দ্রশ্রদ্ধার্ঘ - ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়

0 কমেন্টস্
তোমার সুরের ধারা
ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়


রবীন্দ্রনাথের বয়স ১৫২ বছর, রবীন্দ্রনাথের গানের বয়স ১৪০ বছর, কিন্তু ‘রবীন্দ্র সঙ্গীত’এর বয়স খুব বেশি হলে ৬০ বছর । কথাটার মধ্যে একটা হেঁয়ালি আছে তাহ’ল রবীন্দ্রনাথের গানে আম বাঙালির মজে যাওয়ার শুর কম বেশি ৬০ বছরের বেশি নয় – অন্তত আজকের মত সর্বপ্লাবী ছিলনা তাঁর গান । আমার বেশ মনে আছে চল্লিশের শেষ দিকে কিংবা পঞ্চাশের শুরুতেও রেডিওতে ‘এবার রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইছেন...’ ঘোষণা হওয়া মাত্রই বাড়ির গুরুজন কারো নির্দেশ আসতো রেডিওটা বন্ধ করে দেবার । তো সেই দৃশ্য থেকে আজ, পথ চলতি মানুষের পাশের বাড়ি থেকে ভেসে আসা গানের সুর শুনে থমকে দাঁড়িয়ে যাওয়া । রবীন্দ্রনাথের গানের সর্বপ্লাবী হয়ে ওঠার ইতিহাসের সূত্রপাত কবির জীবদ্দশায় হয়নি । কেন হয়নি সে অন্য প্রসঙ্গ । আমাদের সে এক দুর্ভাগ্য এটুকুই বলা যায়।

সতেরো বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ ইংল্যান্ডে পড়তে যান । সেখানে তাঁর পাশ্চাত্য সংগীত সম্পর্কে ধারণা হয় । সেখান থেকে কয়েকটি আইরিশ লোক সংগীতের সুর সংগ্রহ করেন । বিলেত থেকে ফিরে তিনি গীতিনাট্য ‘বাল্মীকি প্রতীভা’ ও ‘কালমৃগয়া’ রচনা করেন । জীবন স্মৃতিতে রবীন্দ্রনাথ জানিয়েছেন “এই দেশী ও বিলিতি সুরের চর্চার মধ্যে বাল্মীকি প্রতীভার জন্ম হইল”। সুতরাং বলা যায় বিলাত থেকে প্রত্যাগমনের পরই রবীন্দ্রনাথের সংগীত রচনার ইতিহাসের সূত্রপাত । তারপরই একুশ বছর বয়সে ‘ভারতী’ পত্রিকায় ‘সঙ্গীত ও ভাব’ রচনায় মেলে ধরলেন তাঁর সঙ্গীত রচনার মূল সূত্রটি ।

এদেশে কলের গান বা গ্রামফোন রেকর্ড চালু (১৯০২) হবার প্রথম দিকেই রবীন্দ্রনাথ নিজকন্ঠে গান রেকর্ড করেছিলেন (১৯০৮), শান্তিনিকেতনের আশ্রমিকরাও তাঁর গান রেকর্ড করতে শুরু করলেন । কিন্তু তখন আম বাঙালির গান শোনার কান তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়ায় রবীন্দ্রগান ছিলনা । তখন ছিল ‘রবিবাবুর গান’ । এই রবিবাবুর গান থেকে সর্বপ্লাবী ‘রবীন্দ্র সঙ্গীত’ হয়ে উঠতে কেটে গেছে অনেকগুলি বছর ।

‘রবিবাবুর গান’ থেকে সর্বপ্লাবী ‘রবীন্দ্র সঙ্গীত’ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটি বুঝতে চাইলে বাংলা গানের বিবর্তন প্রক্রিয়াটিও বুঝে নেওয়া দরকার, অন্তত তাঁর সময় কালের বাংলা গানের চেহারাটা । পাশাপাশি বুঝে নেওয়া দরকার বাঙালির সাংগীতিক রুচির বিবর্তনের ধারাটিকে । পাঁচালি গানের জনক দাশরথী রায়ের মৃত্যুর পরের বছর জন্ম রবীন্দ্রনাথের । তাঁর শৈশব কালে বিনোদন মূলক সঙ্গীত বলতে ছিল পাঁচালি, কবিগান, যাত্রা থিয়েটারের গান আর সম্পন্ন পরিবারে ওস্তাদি গান । গান তখনও বিপননযোগ্য সামগ্রী হয়ে ওঠেনি । ১৯০২এ এদেশে কলের গান বা গ্রামফোন রেকর্ডে গান শোনার পদ্ধতি চালু হ’ল ।

গানের বিপনন শুরু হলেও গানের কথায় আধুনিক কাব্যের লাবণ্য,পরিশীলিত গায়ন শৈলি ও শিষ্ট গায়ন রুচি তৈরি হতে কেটে গিয়েছিল আরো ১৫/২০ বছর । যদিও ১৯০৮এই রবীন্দ্রনাথ নিজকন্ঠে রেকর্ডে গান গেয়েছেন , শান্তিনিকেতনের আশ্রমিকদের দিয়েও কয়েকটি গান রেকর্ড করেছেন । ইতিমধ্যে ১৯০৫এর বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে উত্তাল দিনগুলোতে পথে নামলেন রবীন্দ্রনাথ – লিখলেন ২২টি দেশাত্মবোধক গান । বাঙালির বিনোদন মূলক সাঙ্গীতিক রুচি তখন কীর্তনাঙ্গের গান, প্রেম ও ছোলনামূলক প্রণয় সঙ্গীত কিংবা মোটা দাগের হাসির গান । কলের গান পৌছেছিল মাত্র কিছু সম্পন্ন মানুষের ঘরে ।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পরের বিশ বছরে আমাদের গান শোনার ক্ষেত্রে দুটি যুগান্তকারী ঘটনা ঘটে যায় । ১৯২৪এ কলকাতা বেতার কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা ও ১৯৩২এ বাংলা চলচ্চিত্রের সবাক হওয়া । এই দুটি মাধ্যম উন্মুক্ত হয়ে যাওয়ায় আমাদের সান্নগীতিক রুচিরও বড় রকমের পরিবর্তন হ’ল । ্পঙ্কজ কুমার মল্লিক, কুন্দনলাল সায়গল, কৃষ্ণ চন্দ্র দে, কানন দেবীর শিষ্ট গায়ন শৈলির গুনে বাংলা গান আধুনিক হতে শুরু করলো । শান্তি নিকেতন ঘরানার বাইরে পঙ্কজ কুমার মল্লিক, সায়গল, কানন দেবী রবীন্দ্রনাথের গান গাইলেন । বস্তুত, রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় তাঁর গানকে লোকপ্রিয় করার কাজে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন পঙ্কজ কুমার মল্লিক এবং স্বাধীনতার পর হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও দেবব্রত বিশ্বাস।

১৯৩২এ বাংলা চলচ্চিত্র সবাক হ’ল আর ১৯৩৫এ পঙ্কজ কুমার মল্লিকের সঙ্গীত পরিচালনায় মুক্তি ছায়াছবিতে রবীন্দ্রনাথের গান ব্যবহৃত হ’ল । রবীন্দ্রকাহিনি নয় এমন চলচ্চিত্রে রবীন্দ্রনাথের গানের প্রয়োগ সেই প্রথম । তারপর ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৪এর মধ্যে দশবারোটি রবীন্দ্র কাহিনি নয় এমন চলচ্চিত্রে রবীন্দ গানের সার্থক প্রয়োগ হয় । ছায়াছবিতে ববহৃত হবার ফলে তাঁর গান সমাদৃত হতে শুরু করল । ত্রিশের দশক থেকেই বাঙালি বিদ্যোৎ সমাজে তাঁর গানের সার্বজনীনতা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘ শুরু হয় । বিদগ্ধ সঙ্গীতবেত্তা দিলীপ কুমার রায় ও ধুর্জটি প্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে দীর্ঘ পত্র বিনিময় থেকে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গীত ভাবনার সারসত্যটাও আমরা জেনে যাই ।

ইতিমধ্যে একদল দক্ষ রবীন্দ্রগানের গায়ক গায়িকা ও প্রশিক্ষক তৈরি হয়ে গেছেন শান্তিনিকেতন সঙ্গীত ভবনের প্রয়াসে । তাঁদের আন্তরিক প্রয়াসে পতিষ্ঠিত সঙ্গীত শিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলি রবীন্দ্রগানের প্রসারে মুখ্য ভুমিকা নিয়েছিল তার প্রয়াণ-পরবর্তী কালে । রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণের পরের বছর প্রতিষ্ঠিত হয় ‘গীতবিতান’ (১৯৪২) , তারপর ‘রবিতীর্থ’(১৯৪৬), ‘দক্ষিণী(‘ (১৯৪৮) ও ‘সুরঙ্গমা’ (১৮৫৭) । শোইলজা রঞ্জন মজুমদার, শুভ গুহঠাকুরতা, নীহারবিন্দু সেন, সুবিনয় রায় প্রমুখ এই প্রতিষ্ঠানগুলির সঙ্গে যুক্ত থেকে পরবর্তী প্রজন্মকে দীক্ষিত করেছেন রবীন্দ্র গানে । । একদিকে বিশ্বভারতী সঙ্গীত ভবন অন্যদিকে এইসব শিক্ষণ প্রতিষ্ঠাঙ্গুলি থেকে উঠে এলেন কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, মায়া সেন, সুচিত্রা মিত্র, গীতা ঘটক, সাগর সেন, অশোকতরু বন্দ্যোপাধ্যায়, ঋতু গুহ প্রমুখ । ১৯৬১তে পৌছে তাঁর গানের যে সর্বগ্রাসী প্রভাব দেখা দিল তা সম্ভব হয়েছিল এঁদের কন্ঠ লাবণ্য ও গায়ন শৈলীর গুনে । কণক দাশ, পঙ্কজ মল্লিক, সায়গল। কানন দেবী হেমন্ত, দেবব্রত পরবর্তী প্রজন্মের এঁরাই রবীন্দ্রগানের চাহিদা মিটিয়েছেন অসামান্য দক্ষতায় ।

একথা ঠিক রবীন্দ্রনাথের গানের অন্তর্দীপ্তিতে আকর্ষিত হতে বাঙালির অনেক সময় লেগেছে। রবীন্দ্রনাথ সেকথা জানতেননা তেমন নয় । কিন্তু তিনি স্থির প্রত্যয়ী ছিলেন যে বাঙালিকে তাঁর গান গাইতেই হবে । তিনি বলেছিলেন “বাংলাদেশকে আমার গান গাওয়াবোই । আমি সব যোগান দিয়ে গেলুম ; ফাঁক নেই । আমার গান গাইতেই হবে – সব কিছুতেই” । কোথা থেকে তাঁর এই প্রত্যয় ? বাংলা গানের শিকড় সন্ধান করেই তিনি এই নিশ্চিত বিশ্বাস অর্জন করেছিলেন । তিনি বুঝেছিলেন বাঙালি কোন দিনই শাস্ত্রীয় গান বা তার গায়নরীতিকে আপন করে নেয়নি । তাই কীর্তনের মধ্যেই বাঙালি তার নিজের গান নিজে তৈরি করেছিল । হ্যা, ওস্তাদি গানের সঙ্গে সম্পর্কহীন ‘কীর্তন’ই বাঙ্গালির প্রথম নিজস্ব গান । কীর্তন , রায়গুণাকর ভরত চন্দ্র, রামপ্রসাদ সেন, নিধুবাবু , দাশরথী রায়’এর পাঁচালি গান- বাংলা গানের যে নিজস্ব ধারা , সেই ধারা থেকেই তিনি বাংলা গানের উত্তরণ ঘটালেন আধুনিকতায় । তাঁর হাত ধরেই বাংলাগান আধুনিক হয়ে উঠল কাব্যের লাবণ্য আর সুরের মেল বন্ধনে । বললেন “আমার গানের মধ্যে সঞ্চিত হয়েছে দিনে দিনে সৃষ্টির শেষ রহস্য , ভালোবাসার অমৃত” । “গানের সুরে আমার মুক্তি ঊর্ধে ভাসে” এ উচ্চারণ শুধুমাত্র তাঁর গানের একটি কলি মাত্র নয়, আমাদের মনের মুক্তির মহামন্ত্র । তাই তাঁর জন্মের দেড়শ’ বছর পরেও আমাদের সব জিজ্ঞাসা, সব-দুক্ষ-দুঃখ, বিষাদ-বেদনা থেকে উত্তরণের ঠিকানা লেখা আছে গীতবিতান’এর ২২৩২টি গানের মধ্যে ।

একুশ শতকের এই বৈদ্যুতিন বিশ্বে এখন একজন গ্রামীণ মানুষ তার কানে ভেসে আশা কোন গানকে অনায়াসে সনাক্ত করতে পারেন ‘রবীন্দ্র সঙ্গীত’ বলে । কোথায় এর রহস্য ? কেনই বা রবীন্দ্রনাথ বলতে পেরেছিলেন বাঙালি সুখে দুঃখে তাঁর গানই গাইবে । যে মানুষ রবীন্দ্রনাথের কবিতার একটা পংক্তিও পড়েননি তিনিও কোন রহস্যে রবীন্দ্রগানে অবগাহন করতে পারেন ? পারেন, কারণ ঐ যে রবীন্দ্রনাথই বলেছেন তাঁর গানে সঞ্চিত হয়েছে সৃষ্টির শেষ রহস্য , ভালোবাসার অমৃত ।

কি করে তাঁর গান এমন সর্বপ্লাবী হয়ে উঠল, তার অনুসন্ধান করতে আমি বুঝতে চাইব – বাংলা গান নিয়ে তাঁর মৌলিক ভাবনা আর গানের জন্য তাঁর আকুলতা । । প্রয়াত অশোকতরু বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর এক স্মৃতিচারণে আচার্য ক্ষিতিমোহন সেনের সঙ্গে তাঁর আলাপচারিতার উদ্ধৃতি দিয়েছেন এইভাবে । “তাঁর কাব্যই বলো আর নাটকই বলো বা যেকোন গদ্য রচনাই বলো, সুকিছুর মধ্য দিয়েই ক্ষণে ক্ষণে হয়তো দেখবে তাঁর সেই দাড়ি জোব্বা উঁকি মারছে । তিনি যে রবীন্দ্রনাথ একথা তিনি ভুলতে পারতেননা । কিন্তু তাঁর গান রচনার সময়, আমি কাছ থেকে দেখেছি –তাঁর আত্ম সচেতনতা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হ’ত, তখন দেখতে পেতাম সত্যিকারের রবীন্দ্রনাথকে যেন একেবারে খোলস ছাড়ানো ন্যাংটো মানুষ”। অর্থাৎ সঙ্গীত রচনার ক্ষেত্রে সবকিছু ভুলে যাওয়া এক বিভোর মানুষ ।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর তাবৎ সৃজন কর্মের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন সঙ্গীত সৃজনকে সবচেয়ে বেশি মমতাও ছিল গানের প্রতি । সঙ্গীত রচনা তাঁর কাব্য রচনার সমন্তরাল রূপেই বিকশিত হয়েছিল – আমরা জেনেছি তাঁর নিজের কথা থেকে । কিন্তু সঙ্গীত রচনা সম্পর্কে, সঙ্গীত বিষয়ে তাঁর মৌলিক ভাবনা সম্পর্কে তিনি যত বিস্তারে লিখে গেছেন, বোধ করি কাব্য রচনা সম্পর্কে ততটা নয় । জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে সাঙ্গীতিক পরিমন্ডল ছিল , অস্তাদি গানের চর্চা হ’ত, দাদা জ্যোতিরীন্দ্রনাথের ব্রহ্ম সঙ্গীতের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল বাল্যেই । সেকালের প্রখ্যাত বাঙালি সঙ্গীতজ্ঞ যদুভট্ট ছিলেন তাঁর বাল্যের সঙ্গীত শিক্ষক । বিদ্যালয় শিক্ষার ক্ষেত্রে যেমন, প্রথাগত সঙ্গীত শিক্ষার ক্ষেত্রেও তেমন তিনি আটকে থাকেননি । শাস্ত্রীয় গানের মধ্যে তিনি বাংলাগানের ভাবসৌন্দর্য খুঁজে পেলেননা । সঙ্গীত রচনা তাঁর কবিতা রচনার সমান্তরাল রূপেই বিকশিত হয়েছে – একথা রবীন্দ্রনাথ নিজেই বলে গেছেন । কবিতার মত সঙ্গীত রচনার ক্ষেত্রেও ‘ভাব সৌন্দর্য’র অন্বেষণই তার সংগীত দর্শনের মূল সূত্র । ২১ বছর বয়সে ভারতী পত্রিকায় ‘সংগীত ও ভাব’ নিবন্ধে লিখলেন “ আমাদের সংস্কৃত ভাষা যেরূপ মৃত ভাষা, আমাদের সংগীত শাস্ত্রও সেইরূপ মৃত শাস্ত্র । ইহাদের প্রাণ বিয়ওগ হইয়াছে কেবল দেহ মাত্র অবশিষ্ট আছে । এই নিবন্ধে যুবক রবীন্দ্রনাথ স্পষ্ট করে জানালেন (শাস্ত্রীয় সংগীতের) “ গায়করা সংগীতকে যে আসন দেন আমি সংগীতকে তদপেক্ষা উচ্চ আসন দিই । তাঁহারা সংগীতকে কতকগুলো চৈতন্যহীন জড় সুরের উপর স্থাপন করেন, আমি তাহাকে জীবন্ত অমর ভাবের উপর স্থাপন করি । তাহারা গানের কথার উপরে সুরকে দাঁড় করাইতে চান, আমি কথাগুলিকে সুরের উপর দাঁড় করাইতে চাই”। এটাই রবীন্দ্রনাথের গানের সার কথা ।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর একক প্রচেষ্টায় বাংলা গানকে আধুনিক করে তুললেন । কবিতা ও গদ্য সাহিত্যের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার পেয়েছিলেন । উনিশ শততকের নবজাগরণের উত্তরাধিকার – রামমোহন থেকে মাইকেল মধুসূদন দত্ত । কিন্তু সংগীত রচনার ক্ষেত্রে তেমন কোন শিষ্ট আদর্শ তাঁর সামনে ছিলনা । তাঁর সমকালে একদিকে কলকার বাবু বিলাসের চটুল ছলনা মূলক প্রণয় সঙ্গীত, হিন্দুস্থানি ওস্তাদি গানের আসর অন্যদিকে বৃহত্তর বাংলায় কীর্তন, বাউল, রামপ্রসাদী , আখড়াই, কবিগান, পাঁচালি। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতজ্ঞরা মনে করতেননা বাংলা ভাষায় যে গান লেখা হতে পারে সেটাই তারা মনে করতেননা , যেহেতু বাংলা গানের শিকড় কোনদিনই শাস্ত্রীয় গানের মধ্যে ছিলনা । বাঙালির আদি ও নিজস্ব গান কীর্তনএর উল্লেখ তাই আমাদের সঙ্গীত শাস্ত্রের কোথাও নেই । এই সাঙ্গীতিক প্রতিবেশে বাংলাগানকে আধুনিক করে তোলার দায় একা নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ । তাঁর জন্মের দশ / পনেরো বছর আগে ও পরে বৃহত্তর বাংলার গানেই ধারাটি রুদ্ধস্রোত হয়ে গিয়েছিল । প্রয়াত হয়েছেন পাঁচালি গানের জনক দাশরথী রায় , এইগানের সুযোগ্য উত্তরাধিকারী কৃষ্ণকমল গোস্বামী, কীর্তন গানের গোবিন্দ অধিকারী, হাসির গানের রূপচাদ পক্ষী প্রমুখ । রবীন্দ্রনাথ অতয়েব শূণ্য থেকে শুরু করলেন এবং বাংলা গানের মুক্তি ঘটালেন ।

রবীন্দ্রনাথের গানে আধুনিকতার যে নির্মিতি তার মূলে ছিল বাঙালির মনন, তার যাপন সম্পর্কে তার গভীর অন্বেষণ, অধ্যয়ন । বাঙালির ভাষা ও সাহিত্যের শুরুই কাব্যের বাঁধনে । বাঙ্গালি কোনদিনই রাজ দরবারের গানকে আপন করে নেয়নি, সঙ্গীত শাস্ত্রের অনুশাসনও সে মানেনি, জনপদের গানকেই সে চেয়েছে । বাংলার প্রথম নবজাগরণ কালের কীর্তন গান থেকে মধ্যযুগ পেরিয়ে তাঁর সমকালের পাঁচালি গান পর্যন্ত আমরা বাংলা গানের এই একই ধারা দেখি এবং সে গান কাব্য নির্ভর । কীর্তন থেকে রামপ্রসাদী, টপ্পা, পাঁচালি গানের সে স্রোত সবেতেই কাব্যের সঙ্গে সুরের মেলবন্ধন, রবীন্দ্রনাথ বাংলা গানে আধুনিকতার নির্মাণ করলেন এই ধারাতেই । ‘আত্ম প্রকাশের জন্যই বাঙালি গানকে অত্যন্ত করে চেয়েছে’ এই সত্য বুঝেছিলেন বলেই তিনি নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিলেন বাংলাগানের জন্য ।

দ্রষ্টা রবীন্দ্রনাথ তাঁর সমকালের চেয়ে সহস্র যোজন অগ্রগামী ছিলেন বলেই নিজের সৃষ্টির প্রতি এমন স্থির বিশ্বাস ব্যক্ত করতে পেরেছিলেন জীবনের উপান্তে এসে “...যুগ বদলায়, তার সবকিছু বদলায় । তবে সবচেয়ে স্থায়ী হবে আমার গান এটা জোর করে বলতে পারি .....যুগে যুগে এ গান তাকে গাইতেই হবে । তাই প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাঁর সুরের ধারায় অবগাহন করে চলেছি, চলবো আরো বহুদিন , যতদিন বাঙালি জাতীসত্তার অস্তিত্ব থাকবে ।

রবীন্দ্রশ্রদ্ধার্ঘ - শ্রী শুভ্র

1 কমেন্টস্
রবীন্দ্র চেতনায় শিক্ষা
শ্রী শুভ্র

"The strength of the Government lies in the people's ignorance; and the Government knows this; and will therefore always oppose true enlightenment."

- কথা কটি বলেছিলেন টলস্টয় তৎকালীন রাশিয়ান শিক্ষানীতি প্রসঙ্গে!

পরাধীন বাংলায় জন্মে রবীন্দ্রনাথ দেখলেন টলস্টয়ের কথাটি সর্বাংশে সত্য! এবং যে হেতু পরাধীন দেশের শাসন ক্ষমতা বৃটিশের কুক্ষিগত, তাই এদেশের শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল রাজভক্ত চাকুরীজীবি হুকুমদাস তৈরীর উদ্দেশ্যেই! সেই শিক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক আপোষহীন সৈনিক রবীন্দ্রনাথ! কিন্তু দুঃখের বিষয় স্বাধীনতার পরও দুই বাংলায় আজও মূলত সেই একই শিক্ষানীতি প্রচলিত আছে! বৃটিশের স্থানে বসেছে ক্ষমতাধর গোষ্ঠী!বৃটিশের প্রবর্তিত শিক্ষাব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্যের

সাথে দেশ বা জাতির উন্নয়নের কোনো সংযোগ ছিল না! ফলে অসৎ উদ্দেশ্যমূলক, বৃটিশের স্বার্থরক্ষাকারী এই শিক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ প্রথমাবধি সোচ্চার ছিলেন! তিনিই প্রথম উপলব্ধি করলেন শিক্ষা প্রণালীর সাথে সমাজ জীবনের নাড়ীর সংযোগ না থাকলে সে শিক্ষা মানুষ গড়তে পারে না! তাঁবেদার গড়ে তোলে! উমেদারিতে যাদের জীবন বয়ে যায়! তাঁর মতে, শিক্ষার উদ্দেশ্য বৃটিশের দরবারে চাকরি করা নয়! তিনি বলছেন, "..তুমি যাহা শিক্ষা করিতেছ তাহা হাউইয়ের মতো কোনোক্রমে ইস্কুলমাষ্টারী পর্যন্ত উড়িয়া তাহার পর পেনসনভোগী জরাজীর্ণতার মধ্যে ছাই হইয়া মাটিতে আসিয়া পড়িবার জন্য নহে!" রবীন্দ্রচেতনায় শিক্ষার সাথে মূলত তিনটি গুরুতর বিষয় জড়িত! প্রথমত মাতৃভাষায় শিক্ষা!

দ্বিতীয়ত প্রকৃতির সাথে জীবনের সংযোগ সাধনের মাধ্যমে শিক্ষা! এবং তৃতীয়ত স্বদেশ ও সমাজের ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারে সমাজদেহের অন্তরের প্রাণকেন্দ্র থেকে গড়ে ওঠা শিক্ষা! ঐতিহাসিক কারণেই তাঁর সময় বৃটিশ শাসনাধীন পরাধীন দেশে শিক্ষার সাথে এই তিনটি বিষয়েরই কোনো যোগ ছিল না! ফলে তাঁর কথায় বৃটিশের ইস্কুল ছিল শিক্ষা দেবার কল! কবি আক্ষেপ করছেন, "শিক্ষাকে দেয়াল দিয়া ঘিরিয়া, গেটদিয়া রুদ্ধ করিয়া, দারোয়ান দিয়া পাহারা বসাইয়া, শাস্তি দ্বারা কণ্টকিত করিয়া, ঘণ্টা দ্বারা তাড়া দিয়া, মানবজীবনের আরম্ভে এ কী নিরানন্দের সৃষ্টি করা হইয়াছে!"

খুব সহজভাবে পরিস্কার চোখে তাকালেই দেখতে পাওয়া যায় বিশ্বে প্রত্যেকটি উন্নত জাতি যারা জ্ঞান

বিজ্ঞান চর্চায় প্রভূত উন্নতি করেছে, ব্যবসা বাণিজ্যে সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে, শিল্প সাহিত্যে বাকি বিশ্বকে নিত্যনতুন পথ দেখাচ্ছে; তারা প্রত্যেকে তাদের শিক্ষা প্রণালীর ভরকেন্দ্র করেছে মাতৃভাষাকেই! একেবারে প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চশিক্ষার সমস্ত শাখাতে মাতৃভাষাকেই করেছে শিক্ষা অর্জনের প্রধানতম মাধ্যম! উল্টোদিকে যেখানেই শিক্ষার্জনের মাধ্যম হয়েছে বিদেশের দ্বারা চাপিয়ে দেওয়া ভাষা; সেখানে কোনো জাতিই আজ পর্যন্ত বিশ্বের দরবারে উন্নত জাতিগুলির সমকক্ষ হয়ে উঠতে পারেনি! পারবেও না! এ প্রকৃতির নিয়ম বিরুদ্ধ!

কবিই একথা প্রথম বোঝেন!

শিক্ষার-সংস্কার প্রবন্ধে কবি প্রশ্ন করছেন, "আমাদের মন তেরো চোদ্দো বছর বয়স হইতেই জ্ঞানের

আলোক এবং ভাবের রস গ্রহণ করিবার জন্য ফুটিবার উপক্রম করিতে থাকে; সেই সময়েই অহরহ যদি তাহার উপর বিদেশী ভাষার ব্যকরণ এবং মুখস্থবিদ্যার শিলাবৃষ্টিবর্ষণ হইতে থাকে তবে তাহা পুষ্টিলাভ করিবে কী করিয়া?" শিক্ষার এই পুষ্টি লাভের গুরত্বটি, দুঃখের হলেও সত্য যে; দেশের মানুষ সেদিনও অনুধাবন করেনি! আজও করে না! ফলে কবির ভাষায়, "...যাহা শিখি তাহাতে আমাদের অধিকার দৃঢ় হইতেই পারে না! এই ভাবেই দেশে প্রচলিত এই ত্রুটি পূর্ণ শিক্ষা প্রণালীর কলে মুখস্থবিদ নকলনবিশ ডিগ্রীধারী উমেদার আর তাঁবেদার প্রজাতির উদ্ভব হয়! দেশের উন্নতি ব্যহত হয়!

দ্বিতীয়ত, শিক্ষার্থীদের সাথে প্রকৃতির নিরন্তর সম্পৃক্ততার প্রয়োজনীয়তা বিশেষ ভাবে অনুভব করেছিলেন কবি! এবং বৃটিশের প্রবর্তিত শিক্ষা ব্যবস্থায় তার নিদারুণ অভাব তাকে প্রবল ভাবেই বিচলিত করেছিল!

বিশ্বভারতীর প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে তিনি তাঁর মতো করে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করে গিয়েছেন!

শিক্ষাসমস্যা প্রবন্ধে কবি বললেন, "শিশুদের জ্ঞানশিক্ষাকে বিশ্বপ্রকৃতির উদার রমণীয় অবকাশের মধ্যে

দিয়া উন্মেষিত করিয়া তোলাই বিধাতার অভিপ্রায় ছিল; সেই অভিপ্রায় আমরা যে পরিমাণে ব্যর্থ করিতেছি সেই পরিমাণেই ব্যর্থ হইতেছি! অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের কাছে শিক্ষা জীবন ধারণের মতোই একটি জৈবিক প্রক্রিয়া যা ইট কাঠ পাথরের মধ্যে পুঁথি পড়ে হয় না!এবং সর্বপরি শিক্ষার ভিত্তি গড়ে উঠবে সমাজদেহের অন্তর থেকে! তাকে বাইরে থেকে চাপিয়ে দিলেশিক্ষার উদ্দেশ্য সফল হতে পারে না! ইউরোপের প্রসঙ্গ তুলে কবি দেখালেন সেখানে মানুষের শিক্ষাপ্রণালী গড়ে উঠেছে একেবারে সমাজের প্রাণ প্রবাহের ভিতর থেকে! সেখানে ছাত্ররা যে শিক্ষা অর্জন করে সেই বিদ্যাটা সেখাকার লোকসাধারণ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়! অর্থাৎ দেশীয় লোকসংস্কৃতির ভিতর থেকেই শিক্ষার ভিতটা সেখানে পাকা হয়ে উঠছে! স্কুল বিল্ডিং এর পুঁথির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়! এই দেশীয় ঐতিহ্য ও কৃষ্টির অর্জিত উত্তরাধিকারে প্রবাহমান জীবন চর্চার মাধ্যমেই গড়ে উঠেছে শিক্ষার বাস্তবতা! ফলে শিক্ষার মাধ্যমে আত্মবিকাশের বড়ো রাজপথটি সেখানে উন্মুক্ত!

"এইজন্য সেখানকার বিদ্যালয় সমাজের সঙ্গে মিশিয়া আছে, তাহা সমাজের মাটি হইতেই রস টানিতেছে এবং সমাজকেই ফলদান করিতেছে!" (শিক্ষাসমস্যা) অথচ আমাদের দেশের চিত্রটি সম্পূর্ণ উল্টো! বিদ্যালয় এখানে সমাজের উপর বৃটিশের চাপিয়ে দেওয়া একটা ভীষণ বোঝা ছিল সেসময়! তারই রেশ চলেছে একালেও! তাই এদেশে শিক্ষা প্রণালী এত শুষ্ক এত নির্জীব! পড়া মুখস্থ আর পরীক্ষায় ভালোনম্বর তুলে চাকুরী পাওয়ার উপযুক্ত ডিগ্রী জোগারের মাধ্যম মাত্র! দেশের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মধ্যে এই শিক্ষা প্রণালীর ভিত না থাকার দরুণ আমরা শিক্ষিত হয়ে প্রথমেই সুযোগসন্ধানী হয়ে উঠি! ব্যক্তিগত স্বার্থবোধের আত্মসুখ বিলাসী হয়ে জীবন কাটাই! সমাজ থাকে বাইরে পড়ে!ফলে নিরানন্দ এই শিক্ষাপ্রণালীতে শিক্ষার মধ্যে আনন্দের অভাবে, স্বাভাবিক আত্মবিকাশ হয় বাধাপ্রাপ্ত! নিতান্ত প্রয়োজনীয় বিষয় কণ্ঠস্থ করে কাজ চালানো যায় কিন্তু মৌলিক সৃষ্টি হয় না! তাই শিক্ষার হেরফের প্রবন্ধে কবি বলছেন, "আমরা যতই বি.এ. এম.এ. পাস করিতেছি, রাশি রাশি বই গিলিতেছি, বুদ্ধিবৃত্তিটা তেমন বেশ বলিষ্ঠ এগং পরিপক্ক হইতেছেনা! তেমন মুঠো করিয়া কিছু ধরিতে পারিতেছিনা, তেমন আদ্যপান্ত কিছু গড়িতে পারিতেছিনা, তেমন জোরের সহিত কিছু দাঁড় করাইতে পারিতেছিনা! আমাদের মতামত কথাবার্তা এবং আচার-অনুষ্ঠান ঠিক সাবালকের মতো নহে!

সেইজন্য আমরা অত্যুক্তি আড়ম্বর এবং আস্ফালনের দ্বারা আমাদের মানসিক দৈন্য ঢাকিবার চেষ্টা করি!ঠিক এই কারণেই রবীন্দ্রনাথ আবার উল্লেখ করছেন, "আমাদের পাণ্ডিত্য অল্প কিছু দূর পর্যন্ত অগ্রসর হয়,আমাদের উদ্ভাবনাশক্তি শেষ পর্যন্ত পৌঁছে না, আমাদের ধারণশক্তির বলিষ্ঠতা নাই

...আমরা নকল করি, নজির খুঁজি, এবং স্বাধীন মত বলিয়া যাহা প্রচার করি তাহা হয় কোনো না কোনো

মুখস্থ বিদ্যার প্রতিধ্বনি, নয় একটা ছেলেমানুষি ব্যাপার! হয় মানসিক ভীরুতাবশত আমরা পদচিহ্ন

মিলাইয়া চলি, নয় অজ্ঞতার স্পর্ধাবশত বেড়া ডিঙাইয়া চলিতে থাকি!" (শিক্ষা-সংস্কার) ফলে আমাদের

শিক্ষাপ্রণালী আমাদের স্বকীয়তা, মৌলিকতা, মেধার পূর্ণ বিকাশসাধন, এবং পরিপূর্ণ মনুষ্যত্বের পূর্ণ

উদ্বোধনে কোনোরূপ সাহায্য করে না বলেই আমাদের আত্মবিকাশ ঘটে না!

রবীন্দ্রচেতনায় শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যই ছিল মনুষ্যত্বের পূর্ণ উদ্বোধন! আর সেই উদ্দেশ্যে তিনি মূল যে তিনটি বিষয়ের উপর জোর দিলেন সেই তিনটি আবশ্যিক শর্তকে দুঃখের বিষয় হলেও সত্য যে, স্বাধীনতার ছয় দশক অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও আজও আমরা পূরণ করতে পারিনি! বা চাইনি! কারণটা পরিস্কার! মহামতি টলস্টয়ের যে কথাটি দিয়ে এ প্রবন্ধের শুরু, সেই কারণটাই আজও পূর্ণরূপে সক্রিয়! শাসন ক্ষমতায় বৃটিশের স্থানে স্বদেশের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ক্ষমতাধর শ্রেণী এসে বসেছে শুধু! দেশ শাসনের উদ্দেশ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি তাই বলে! আর দেশের শিক্ষিত সমাজ সেই আবহাওয়ায় ব্যক্তিগত স্বার্থসন্ধানে ব্যস্ত থাকায় কবির সকল প্রয়াস অরণ্যে রোদনেরই সামিল!

রবীন্দ্রশ্রদ্ধার্ঘ - হরপ্রসাদ রায়

0 কমেন্টস্
প্রসঙ্গঃ রবীন্দ্রনাথ ও সমকাল
হরপ্রসাদ রায়



সময় টা ছিল ১৮৭৪ । উনিশ শতকের বাংলা সাহিত্যে তখন আধুনিক বলে পরিচিত হয়েছে। আর এই সময় রবীন্দ্রনাথের নাটকীয় প্রবেশ ‘তত্ত্ববোধিনী’ তে তাঁর অস্বাক্ষরিত কবিতা “অভিলাষ” দিয়েই । তার পর প্রায় চার দশকের সময় পরিব্যাপ্তিতে কবি যখন বাংলাসাহিত্যে পরিনত ব্যাক্তিত্ব তখনই পশ্চিম তার দ্বার খুলে স্বীকৃতি জানাল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম ঘোষিত পুরস্কারটি কবির হাতে তুলে দিয়ে । কবির কবি মনীষার বিশ্বায়নে অধিবাস হল নোবেল পুরস্কারের মাধ্যমে ১৯১৩ তে। বলা যেতে পারে, বিশ-শতকের শুরু বাংলা সাহিত্যের বিশ্ব সাহিত্যে নিজের জায়গাকে সর্বসম্মত অনুমোদনে চিহ্নিত করার এক বিশেষ পর্ব সেটা। তারপর থেকে সময়টা প্রায় অলক্ষ্যে জুড়ে গেল একটা নামের সাথে, সময়ের একটা মানদণ্ড তৈরী হল কবিকে ঘিরে । যুগের রূপরেখা আঁকা হল ‘রবীন্দ্রযুগ’ শিরোনামে, আর সাহিত্যে পেল এক নতুন সমসাময়িকতার পরিচয় পত্র ।

১৯১৫ র ‘ঘরে বাইরে’ কবির সমসাময়িক বিশ্বচেতনার সামজিক কথাচিত্র এবং বিশ্লেষণ। তিনি এতে যেমন ভারতীয় সামাজিক মূল্যবোধের পুঙ্খানুপুঙ্খ রূপরেখা এঁকেছেন তেমনি সমকালীন প্রেক্ষাপটে বৃহত্তর মানব সমাজে তার গ্রহণযোগ্যতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন। এতে যে শুধু পরম্পরাগত সামাজিক মুল্যবোধের দৃষ্টিকোণ গুলি নির্দেশিত হয়েছে তা নয় উন্মোচিত হয়েছে বিভিন্ন নতুন ক্ষেত্র আর অঙ্কিত হয়েছে তার ভবিষ্যৎ রূপরেখা। তার অনেকটাই ঘটেছে সমসামিক সময়ের প্রভাবে হয়ত কবির বৃহত্তর মননের গভীর থেকে। নব জাতকের ‘সুচনা’ তে রবীন্দ্রনাথ তাই বলেন যে ‘আমার লেখা অনেক পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে গেছে যেমন প্রকৃতিতে ঋতু পরিবর্তন হয়। তার অধিকাংশই ঘটেছে আমার অজান্তেই। এই পরিবর্তন প্রাকৃতিক পরিবর্তন কে অনুসরন করেছে, এ পুরোপুরি প্রাকৃতিক কোন সচেতন মনের কাজ নয়। আর এ হয় লেখকের অজ্ঞাতেই’ (সংকলিত)।

এ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে রবীন্দ্রবিশারদ অধ্যাপক সব্যসাচী ভট্টাচার্য বলেনঃ
“When one considers the versatile creativity of Tagore and the staggering range of his thoughts and writings over a period of over sixty years, those words seem to hold the key to any attempt to comprehend his work as a totality.”

১৯১২ ‘গীতাঞ্জলী’ আর ১৯১০ গোরা সমসাময়িক কালের এক বিস্তৃত পটভূমি তৈরী করে দেয় আর রবীন্দ্রনাথ কে প্রতিষ্ঠা করে কালদ্রষ্টা হিসেবে।

তারপর থেকে ১৯২৫ পর্যন্ত সময়ে ছিল রাবীন্দ্রিক সমপ্রেক্ষিতা ছিল এক রকম অবিসংবাদিত। অচিন্ত্য কুমার সেনগুপ্তের কল্লোল পত্রিকার ছত্রছায়ায় কল্লোলযুগের কবিরা প্রথম সোচ্চার হলেন সাহিত্যে রাবীন্দ্রিক আবেশের মুখমুখি দাঁড়িয়ে। পরিবর্তনের স্রোত প্রবল ভাবে দুকুল ছাপিয়ে জন্ম দিল এক সমান্তরাল ধারার । যে মনীষা বাংলা সাহিত্যে তাঁদের বিশেষ স্বতন্ত্রতার ছাপ রাখেন তাঁদের মধ্যে কাজী নজরুল ইসলাম, মহিতলাল মজুমদার, অচিন্তকুমার সেনগুপ্ত, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, প্রেমেন্দ্র মিত্র প্রমুখ ছিলেন প্রথম সারিতে। লক্ষনীয় ভাবে পুরো প্রতিবাদী আন্দোলনটি বাস্তবে ছিল রবীন্দ্রনাথের একছত্র প্রভাবকে অস্বীকার করে বাংলা সাহিত্যে এক নতুন যুগের সুচনা করা । মনে হয়েছিল যে কল্লোল পরবর্তী যুগ সত্যিই এক আলাদা ধারা তৈরিতে সক্ষম হবে। আপতঃ দৃষ্টিতে তাই মনে হলেও ১৯৫০ এর পর থেকে আবার শিথিল হতে থাকে পরিবর্তনের ওই স্রোত। অথচ সাবলীল গতিতে লক্ষ্যে অলক্ষ্যে প্রবাহমান থেকেছে রাবীন্দ্রিক সাহিত্য ও দর্শনের ধারাপ্রবাহ একরকম সময়ের যতি চিহ্ন অগ্রাহ্য করেই ।

রবীন্দ্র সাহিত্য ও দর্শনের প্রভাব আজও বাংলা সাহিত্যে একটি বিশেষ পরিলক্ষিত ধারা বলা যেতে পারে সমকালীন ধ্রুবক।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর উৎসর্গ (১২) তে বলেনঃ
“আমি বিপুল কিরণে ভুবন করি যে আলো
তবু শিশির টুকুরে ধরা দিতে পারি
বাসিতে পারি যে ভালো...”

মনে হয় কবিতায় নিজের অজান্তেই নিজেকে বিবৃত করেছেন এভাবে আর হয়ে উঠেছেন চিরকালীন সমকালীন ।

****